Blog

  • মার্ক সীম।। অ্যান্টি ইডিপাস : ফ্যাসিবাদ ও সিজো-বিশ্লেষণ

    মার্ক সীম।। অ্যান্টি ইডিপাস : ফ্যাসিবাদ ও সিজো-বিশ্লেষণ

    অনুবাদ: আরিফ রেজা মাহমুদ

    [ ভূমিকা: জিল দেল্যুজ ও ফেলিক্স গুয়াত্তারির  অ্যান্টি-ইডিপাস বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের অন্যতম আলোচিত দার্শনিক গ্রন্থ। পুঁজিবাদ, মনঃসমীক্ষণ, আকাঙ্ক্ষা, পরিবার, রাষ্ট্র, বিপ্লব এবং ব্যক্তিসত্তা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে এই গ্রন্থ এমন এক চিন্তার পরিসর তৈরি করে, যেখানে আকাঙ্ক্ষাকে আর ব্যক্তির অভাব, দমন কিংবা পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ কোনো মানসিক প্রবণতা হিসেবে দেখা যায় না। আকাঙ্ক্ষা এখানে উৎপাদনশীল, সামাজিক এবং রাজনৈতিক শক্তি। এই কারণেই অ্যান্টি-ইডিপাস কেবল মনঃসমীক্ষণের সমালোচনা নয়; এটি একই সঙ্গে সমাজ, রাজনীতি ও মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে বোঝার একটি নতুন পদ্ধতির প্রস্তাব।

    কিন্তু অ্যান্টি-ইডিপাস এমন একটি বই, যার ধারণা ও ভাষার জটিলতায় পাঠক খুব সহজেই এর ভেতরে পথ হারিয়ে ফেলতে পারেন। ‘ইডিপাস’, ‘সিজোফ্রেনিয়া’, ‘আকাঙ্ক্ষা’, ‘উৎপাদন’, ‘দেহ’, ‘যন্ত্র’, ‘ক্ষেত্রসীমা’ ‘বিধি’ প্রভৃতির মতো ধারণা দেল্যুজ ও গুয়াত্তারির চিন্তায় প্রচলিত অর্থ থেকে সরে গিয়ে নতুন অর্থ ও সম্পর্ক তৈরি করে। ফলে বইটিতে প্রবেশে এমন একটি পাঠ প্রয়োজন, যা একই সঙ্গে এর দার্শনিক প্রকল্প, রাজনৈতিক তাৎপর্য এবং এর ভাষার অন্তর্নিহিত গতি সম্পর্কে পাঠককে সতর্ক করে।

    মার্ক সীম অ্যান্টি ইডিপাসের অন্যতম ইংরেজি অনুবাদক এবং ভূমিকার রচয়িতা।  সীমের ভূমিকা শুধু গ্রন্থটির বিষয়বস্তুর পরিচয় দেয় না; বরং দেল্যুজ ও গুয়াত্তারির চিন্তার কেন্দ্রে থাকা আকাঙ্ক্ষা, অহম, সিজোফ্রেনিয়া, বিপ্লব এবং সামাজিক-রাজনৈতিক দমনের পারস্পরিক সম্পর্ককে একটি বিশেষ পাঠ-অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে উন্মোচন করে। সীমের পাঠে অ্যান্টি-ইডিপাস নিছক একটি তাত্ত্বিক গ্রন্থ হিসেবে উপস্থিত হয় না। এটি হয়ে ওঠে প্রচলিত ব্যক্তিসত্তা, পরিবার, নৈতিকতা ও সামাজিক শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে চিন্তা করার একটি আহ্বান।

    বিশেষত সীমের লেখায় যে বিষয়টি গুরুত্ব পায়, তা হলো ‘অহম’কে কেন্দ্র করে নির্মিত আধুনিক ব্যক্তিসত্তার সমালোচনা। মানুষকে একটি বিচ্ছিন্ন, স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং নিজের ভেতরে আবদ্ধ সত্তা হিসেবে বোঝার পরিবর্তে দেল্যুজ ও গুয়াত্তারি তাকে অসংখ্য সম্পর্ক, আকাঙ্ক্ষা, সামাজিক শক্তি ও উৎপাদন-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গঠিত একটি সত্তা হিসেবে দেখতে চান। সীম এই পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গির দিকে পাঠককে নিয়ে যান। ফলে তাঁর ভূমিকা অ্যান্টি-ইডিপাস বোঝার জন্য কেবল একটি সহায়ক লেখা নয়, বরং গ্রন্থটির রাজনৈতিক ও দার্শনিক অভিঘাত উপলব্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার।

    মার্ক  সীমের ভূমিকাটি প্রবাহমান শিরোনাম অনুবাদকের প্রস্তাবনা। এর অনুবাদ সম্পাদনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নেয়া হয়েছে। বিশেষত সরল বাক্য গঠন এবং পরিভাষা তৈরির ক্ষেত্রে। তবু জটিলতা ও দুর্বোধ্যতা এড়ানো যায়নি। পরবর্তী সংস্করণে তার প্রয়াস থাকবে ] 

    দেল্যুজ ও গুয়াত্তারি

    “আমাদের অবশ্যই অহমরূপে মৃত্যুবরণ করতে হবে। আবার জন্ম নিতে হবে সমষ্টির মধ্যে। বিচ্ছিন্ন ও আত্মমোহে আবদ্ধ সত্তা হিসেবে নয়, বরং স্বতন্ত্র অথচ সংযুক্ত সত্তা হয়ে”

    — হেনরি মিলার,, সেক্সাস (more…)

  • অনেকান্তবাদ : ধারণা, সমকালীনতা ও প্রত্নতত্ত্বীয় প্রাসঙ্গিকতা

    অনেকান্তবাদ : ধারণা, সমকালীনতা ও প্রত্নতত্ত্বীয় প্রাসঙ্গিকতা

    স্বাধীন সেন

    পাঠ ও তথ্যসূত্র ব্যবহারের পদ্ধতি

    এই পর্যালোচনায় তিন ধরনের বক্তব্য পৃথক রাখা হয়েছে।

    প্রথমত, প্রাচীন জৈন সূত্র, গাথা, শ্লোক বা ভাষ্যে প্রত্যক্ষভাবে পাওয়া বক্তব্যকে প্রাথমিক পাঠভিত্তিক বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, আধুনিক বা সমকালীন গবেষকের নিজস্ব ব্যাখ্যাকে সংশ্লিষ্ট গবেষকের ভাষ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তৃতীয়ত, প্রাচীন পাঠ ও আধুনিক গবেষণার ভিত্তিতে বর্তমান পর্যালোচনায় নির্মিত কোনো শ্রেণিবিন্যাস, তুলনা, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রয়োগ বা সমকালীন বিশ্লেষণকে “এই পর্যালোচনার বিশ্লেষণী সংশ্লেষ” অথবা “প্রয়োগভিত্তিক বিশ্লেষণ” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিটি বিশ্লেষণী প্রস্তাবের সঙ্গে তার ভিত্তিস্বরূপ রেফারেন্স যুক্ত করা হয়েছে। লেখাটি গুঢ় তত্ত্বালোচনা নির্ভর নয়। বরং প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাস চিন্তা, ও নৈমিত্তিক জীবনে অনেকান্তবাদের যাপন কেমন হতে পারে সেসম্পর্কে কিছু প্রস্তাবনা পেশ করা হয়েছে এই লেখায়। (more…)

  • উত্থান ও উধাও : ছাত্রলীগের ‘উধাও’ নারীকুল, পৌরুষ-সংহতি এবং ২০২৪ উত্থানের ভ্রান্তপাঠ

    উত্থান ও উধাও : ছাত্রলীগের ‘উধাও’ নারীকুল, পৌরুষ-সংহতি এবং ২০২৪ উত্থানের ভ্রান্তপাঠ

    মানস চৌধুরী

    পরিপ্রেক্ষিত

    এই রচনাটির পরিপ্রেক্ষিত তৈরি হয়েছে সাধারণভাবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রতি আমার বিরক্তি থেকে। এমন নয় যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকবৃন্দ সমরূপ বা অখণ্ড বৈশিষ্ট্যের ধারক। এমনও নয় যে আমার বিরক্তিটাও সমরূপ বা অটুট। কিন্তু মোটের উপর, টিভি-পত্রিকাতে যেসব বিশ্লেষণ অন্তত আমার চোখে পড়েছে; আর আমি পর্যাপ্ত পরিমাণে বিরক্ত হতে থেকেছি। বিশ্লেষকদের সিংহভাগের উপর আমার এই বিরক্তি অবশ্য আগস্ট-২৪ পরবর্তীকালেরই নয়। এটা কমবেশি বহুকাল আগে থেকেই বিকশিত রয়েছে। যাহোক, এখানে রচনা লিখবার ক্ষেত্রে যে বিষয়টা না বললেই নয় তা হচ্ছে, বিদ্যাজগতে আর যাই হোক বিরক্তি থেকে রচনা লিখতে উৎসাহ দেয়া হয় না। তেমন কোনো পণ্ডিতই পাওয়া যাবে না যাঁরা অনুমোদন করবেন পেটভর্তি বিরক্তির কারণে কোনো রচনায় ব্রতী হতে। সাধারণত, জ্ঞানতৃষ্ণা ও জ্ঞানসাধনার জগতেই বিদ্যারচনার জন্মলাভ করাতে সুপারিশ করা হয়ে থাকে। হিসেবটা বেশ জটিল। কার যে জ্ঞানতৃষ্ণা আর কার জ্ঞানসাধনা তা আমার প্রায়শই গুলিয়ে যায়। অনেক হিসেব কষে দেখলে আন্দাজ করা যায় যে, লেখকের থাকবে জ্ঞানসাধনা আর পাঠকের থাকবার কথা জ্ঞানতৃষ্ণা। তবে পণ্ডিতেরা প্রায়শই বলেন যে লেখকের জ্ঞানতৃষ্ণাও অত্যন্ত জরুরি। যেসব লেখক কম পড়ালেখা করেন তাঁদেরকে ব্যাপক নিন্দা করা হয়। সেসব চিন্তা করলে লেখায় হাত দিতে ভয় হবার কথা আমার। খুব হয়ও বটে। সব মিলে খুবই পিচ্ছিল-বিপজ্জনক এক জগত এই বিদ্যাজগতের লেখালেখি। কিছুতেই বিতৃষ্ণা থেকে অন্তত লিখবার সুপারিশ নেই। অথচ আমার ক্ষেত্রে, অন্তত এই রচনাটি, বিশুদ্ধ বিতৃষ্ণাতেই জন্মলাভ করতে যাচ্ছে। 

    মানস চৌধুরী

    আমার জিজ্ঞাসাও খুব সাধারণ ও স্পষ্ট। ছাত্রলীগে যোগ-দেওয়া বিপুল পরিমাণ নারীরা রাজনৈতিক বিশ্লেষণে, রাজনৈতিক ভাষামালাতে হারিয়ে গেলেন কেন? ২৪-এর উত্থানের অন্যতম কারিগর যে আমি তাঁদের দেখতে পাই সেই অতি-সাধারণ দেখাদেখিটা গড়ে ওঠেনি কেন বিশ্লেষকদের মাঝে? যদি গড়ে উঠে থাকে, তাহলে তাঁরা সেই প্রসঙ্গসূত্র যুক্তি-আকারে হাজির করতে থাকেননি কেন? আর যদি দেখাটা গড়ে না-উঠেই থাকে, তাহলে এই কাঠামোগত আহাম্মকির কারণ বা হেতু কী? ইত্যাদি।

    ঘটনাসূত্র

    বলা বাহুল্য হতে পারে, তবে সূত্রের অভাব নেই। কিন্তু একটা ঘটনাপঞ্জি হিসেবে সাজিয়ে ইতিহাস-রচনার দায় আমি নিচ্ছি না। আমার যুক্তিকে গেঁথে-সাজানোর স্বার্থে আমি তিনটি ঘটনাকে সূত্রবদ্ধ করছি এখানে। ঘটনা তিনটা ঘটেছে কমবেশি দেড় বছরের মধ্যেই। ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত। এগুলোকে প্রামাণ্য বা দালিলিক হিসেবে উপস্থাপন করছি না আমি। আমার আগ্রহ উপসর্গের চিহ্ন হিসেবে দেখানো। দালিলিক বা প্রামাণিক হিসেবে হাজির করবার জন্য আরও কিছু বিন্দুকে জোড়া দিতে হবে। তার জন্য বাড়তি আরও কিছু কাজ করা লাগবে। তাছাড়া, আমার তরফে এটা কোনো ইতিহাস রচনা-প্রচেষ্টা নয়। বড়জোর ইতিহাসের দিকে তাকানোতে নানান পক্ষের অপ্রস্তুতিতে বিরক্তির বোধ। বড়জোর একটা তাকানোর পদ্ধতি প্রস্তাব। উপরন্তু, পত্রিকাকে আমি আদালত ভ্রম করতে রাজি নই কিংবা পাঠককে বিচারকের জায়গা দিতেও নই। ঘটনা তিনটিকে অতীতকাল থেকে বর্তমানের দিকে না সাজিয়ে উল্টোটা করছি। 

    ২৮ জুলাই ২০২৪: প্রধানমন্ত্রীর দরবারে ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দের হাজিরা ও পতনোন্মুখ পরিস্থিতি নিয়ে বিলাপ।[১] যে তিনটা ঘটনার কথা উল্লেখ করছি তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে বেশি ‘মিডিয়া-কভার্ড’ ইস্যু। মানে অন্তত ওই সময়ে সাইবার পোর্টালের কথা বিবেচনা করলে তা বলা চলে। কারণ নিশ্চয়ই আন্দোলনের বেগ। জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে যেহেতু আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছিল, ১৮ জুলাই থেকেই যেহেতু সড়কে শিক্ষার্থীদের উপর গুলি চালানো হয়েছে তাই পত্রপত্রিকা কিছুটা অধিক মূল্য দিয়ে থাকতে পারে। সরকারের নিন্দামন্দ হয় এমন পরিস্থিতিতে মিডিয়া-হাউজগুলো দীর্ঘদিন বাংলাদেশে ঘাপটি মেরে থাকে তা আপনারা জানেন। বহুকাল ধরেই এই প্রবণতা। এর মধ্যে টিভিমাধ্যম সংবাদ-উৎস হিসেবে কাগজ-মাধ্যমের তুলনায় স্পষ্টত শ্লথগতিসম্পন্ন। মুদ্রণমাধ্যমে পর্যাপ্ত হৈচৈ শুরু হলেও টিভিমাধ্যমগুলো নিরোর-বাঁশিবাজানো মুডেই থাকে। একটা বিকল্প হিসেবেই সম্ভবত টিভিমাধ্যম কিছু লোককে টকশোতে বসিয়ে থাকে। আমি যে অঞ্চলটাকে বিশ্লেষক-অধ্যুষিত হিসেবে দেখছিলাম। প্রধানমন্ত্রীর কাছে গেছিলেন নারীপুরুষ উভয় ধরনের নেতাই। কিন্তু পত্রিকার (ওয়েবমাধ্যমে) খবর, বিশ্লেষণ করলে আপনাদের মনে হতে পারে যে কেবল বোধহয় নারীরাই গেছিলেন। তা নয়। বরং, উত্থিত আন্দোলনের মুখে পড়ে নিগৃহীত হবার অভিজ্ঞতা বর্ণনাতে ছাত্রলীগের নারীবৃন্দ অগ্রগামী ছিলেন। 

    এক্ষেত্রে বিশেষভাবে আগের সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে এবং ইডেন কলেজে ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দের উপর ‘সাধারণ’ শিক্ষার্থীদের ধাওয়া ও ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণ থেকে হঠিয়ে দেবার অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে পেশ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী নারী নেতৃবৃন্দ তা করেছেন, সঙ্গে থাকা ছাত্রলীগের পুরুষ নেতৃবৃন্দও বিষয়টাকে সেভাবে সাজানোতে কোনো ওজর-আপত্তি করেননি; এবং সর্বোপরি, পত্রিকাগুলোও সেই ফর্মুলাতেই আগিয়েছে। এই বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ। পাঠককে নিম্নরেখা দিয়ে পাঠ করতে সুপারিশ করি। যে ছাত্রলীগ এমনকি একটা ছাত্রী হলের কমিটি গঠনের সভার ‘প্রেস-আইটেম’ বানানোর বেলাতেও কেন্দ্রীয় সিংহপুরুষদের পর্যাপ্ত অংশগ্রহণ ছাড়া অনুমোদন করেনি, তাঁরা ‘নিগৃহীত’ হবার পরিস্থিতিতে ছাত্রীদেরকেই সম্মুখে রাখবার কারণ খুঁজে পেয়েছেন। এমনকি সফরকারী দলে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুরুষ ছাত্রলীগ নেতা থাকবার পরও, বিভিন্ন জায়গা থেকে সমরূপ ধাওয়ার অভিজ্ঞতা আগের সপ্তাহে তাঁদেরও ঘটবার পরও। প্রধানমন্ত্রীকে নিজেদের দুর্গতি বলবার পাশাপাশি তাঁরা অনুরোধ করছিলেন যেন বাহিনিগুলোকে ছাত্রলীগের নিরাপত্তার জন্য হুকুম দেওয়া হয়। (এই অশনিসংকেত থেকে প্রধানমন্ত্রী কী পাঠ করেছিলেন আর তার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি কী পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন তা সম্পূর্ণ আরেকটা জিজ্ঞাসা। এই রচনা সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বা দূরদর্শিতা বিষয়ে নয়।)               

    ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত গণধর্ষণের ঘটনায় র‌্যাবের প্রেস কনফারেন্স।[২] আমার হিসেবে এই ঘটনাটি তিনটির মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ‘মিডিয়া-কভার্ড’ প্রসঙ্গ। কিন্তু সেটা হচ্ছে ধর্ষণের ঘটনাটি। প্রেস কনফারেন্সটি নয়। এর আগে মানানসই মাপের একটা প্রেস কনফারেন্স আশুলিয়া থানার পুলিশও করেছিলেন, ফেব্রুয়ারির ৪ তারিখেই, সম্ভাব্য/উল্লিখিত আসামীদের একাংশকে ধরবার পরপরই। বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনা পর্যাপ্তহারে ঘটতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ঘটে না এরকমও কেউ মনে করেন না। তবে জাহাঙ্গীরনগরের এই ঘটনাটি তাৎপর্যপূর্ণ এই কারণে যে এখানে ভুক্তভোগী থানা পর্যন্ত গেছিলেন, এবং থানাতে এক বা একাধিক সংবেদনশীল পুলিশ তিনি পেয়েছিলেন। তাতেও থানার পুলিশদের সংবাদ-সম্মেলনের ৪দিন র‌্যাবের পর পক্ষ থেকে প্রায় ৩০ মিনিটের একটা সম্মেলনকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠ করা প্রয়োজন। তবে যেমনটা বলছিলাম, পত্রিকা তরফে, কিংবা বিশ্লেষক তরফে, এই সংবাদ-সম্মেলনটির গুরুত্বটা যথেষ্ট বিবেচনা করা হয়নি। সমরূপ ক্ষেত্রে প্রায়শই যেমনটা ঘটে থাকে, i¨ve যে পুলিশের থেকে অধিক কার্যকর ও দক্ষ সেই ভঙ্গিগ্রহণ, এই সম্মেলনে সেটাও ঘটেনি। বরং, i¨ve পরিমিতভাবেই পুলিশের তারিফ করছিলেন।

    এই সংবাদ-সম্মেলনটি চোখে পড়বার সাথে সাথেই আমি ডাউনলোড করে নিয়েছিলাম। যদিও পরে সার্ফিংয়ে খুঁজবার অনিশ্চয়তার কারণেই আমি ডাউনলোড করেছিলাম, তবে পরে ভিডিওটা ডিলিটেড হয়ে যেতে পারে এই আশঙ্কা আমার যে ছিল তা স্বীকার করি। এমনও নয় যে এর আগে বাংলাদেশের কোনো বাহিনির কোনো সংবাদ-সম্মেলনের ভিডিও আমি ডাউনলোড করে রেখেছি। কোনো না কোনোভাবে ৩০ মিনিটের দৈর্ঘ্যই আমাকে প্রাথমিক কৌতূহলী করেছিল। সেই সময়ে আমি ভিডিওটা দুবার দেখি। এখন এই রচনাকালেও একাধিকবার দেখি। (এই অংশটিকে গবেষণামনস্ক, গবেষণা-কাতর, গবেষণা-উদ্বিগ্ন, গবেষণা-উল্লসিত এবং গবেষণা-গৌরবান্বিত লোকজন মেথডোলজি হিসেবে যেন পাঠ করেন। বলা বাহুল্য, কী নামে সেইভ করেছিলাম তা ভুলে যাওয়াতে কম্প্যুটারে খুঁজতে আমার সার্ফিংয়ের চেয়ে কম কষ্ট হয়নি। আমি অনুচ্চারিত কথা, যদি থেকে থাকে, বুঝবার জন্য বারবার দেখেছি।) এটা ঠিকই যে, র‌্যাবের কর্মকর্তাবৃন্দ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিংবা সরকার কাউকেই দায়ী করেননি। এমনকি ছাত্রলীগকে দায় দিতেও কোনো উদ্যোগ নেননি। বরং, একাধিকবার বলেছিলেন যে প্রধান আসামীর কোনো ‘রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা’র কথা জানা যায় না, যাকে পড়তে হবে তিনি ছাত্রলীগ করেন না এই দায়মুক্তি হিসেবে। কিন্তু সম্মেলনটিতে একটা প্রচেষ্টা ছিল যাতে মাদক ব্যবসার সুবিস্তৃত নেটওয়ার্কের অন্তত একটা খণ্ডচিত্র প্রকাশ পায়। সেই নেটওয়ার্কের কারক কারা হতে পারেন তা সম্মেলকরা উচ্চারণ করেননি, কিন্তু শ্রোতার অনুমানের কোনো সমস্যা হবার কথা নয়। এমনকি ‘অনৈতিক’ বা ‘এই ধরনের’ কাজ ‘হয়ে থাকে’ উল্লেখ করে সম্মেলকেরা ইশারা করছিলেন যৌননিগ্রহ একটা নৈমিত্তিক বিষয় ক্যাম্পাসগুলোতে। এগুলো বলবার সময় ‘আমার কথা নয়, আসামীর কথা’ হিসেবেও একাধিকবার ডিসক্লেইমার দেবার সতর্কতা প্রধান সম্মেলকের ছিল। কোন বর্গ নিগৃহীত হয়ে থাকেন সে বিষয়ে কোনোরকম দিকনির্দেশনা তাঁরা এড়িয়ে গেছেন। আর আশা করেছেন ‘নিশ্চয়ই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন’ নিজের মতো সব বের করবে। বোঝাই যাচ্ছে, এই সম্মেলনটি প্রধান আসামীকে একদফা জিজ্ঞাসাবাদের পরের। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই ধরনের কিছু ‘বের’ করেনি। ভীষণ রকমের নার্ভাস আমসত্ত্ব মুখে কদিন কাটিয়েছিলেন তাঁরা। একেবারেই ‘পার্টিসিপ্যান্ট ওবসার্ভেশন’ থেকে বলছি। এর দিন ১২ পরে, বের করেছিলেন আন্দোলনকারী দুই শিক্ষার্থীনেতাকে, বঙ্গবন্ধুর ছবি মোছার অভিযোগে।[৩] এই দুজন বামপন্থী ছাত্রনেতা আন্দোলনের মুখ্য চালিকাশক্তির অংশ ছিলেন। যা বলেনি, এমনকি বলবার ইশারাও করেনি, সেগুলোকে ‘রিডিং-বিটুইন-দ্য-লাইনস’ করবার সামর্থ্য পাঠকের/শ্রোতার থাকলে ভাল হয়। তবে আমার মতো নিশ্চয়ই কেউ কেউ আছেন যাঁদের এসব প্রেস-কনফারেন্সের আবশ্যকতা নেই। ক্যাম্পাসগুলোতে কী চলে আসছিল, জাহাঙ্গীরনগরে কী চলছিল, তার একটা আন্দাজ করবার মতো ধীশক্তি, পর্যবেক্ষণগুণ এবং সরকার ও ছাত্রলীগের প্রতি আনুগত্যহীনতা সবই মজুত আছে (এবং ছিল)। 

    ০৬ ডিসেম্বর ২০২২: বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৩০তম জাতীয় সম্মেলনে ওবায়দুল কাদেরের ‘বড়ভাই মেইনটেইন’ করবার বিষয়ে উষ্মাপ্রকাশ।[৪] এই তারিখটার একটা নির্দিষ্ট পূর্বসূত্রও আছে। ১৮ নভেম্বর ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় কাউন্সিলের একটা দপ্তর উপ-কমিটির সভায় তিনি এই কথাটা আরেকবার বলেছিলেন। সেবার বরং আরেকটু খোলাসা করেই তিনি লিঙ্গ-মাত্রাটি হাজির করেছিলেন। সেখানে ছাত্রলীগের নেতৃস্থানীয় নারীরা যে বড় গলায় বলেন ‘আমি অমুক ভাইকে মেইনটেইন করি’ সেটাই তাঁর উষ্মার ফ্রেমওয়ার্ক হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বিশেষভাবে ইডেন কলেজের ছাত্রলীগের মেয়েদের ইঙ্গিত করছিলেন। হয়তো পার্টি অফিসের মধ্যে বলে অধিক খোলতাই করেছেন। ফলে ৬ ডিসেম্বরে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সট্যুটের সম্মেলনে তাঁর বক্তব্যটিকে দেখতে হবে আগের দিনের বলা বিষয়বস্তুর পুনরুচ্চারণ হিসেবে। কিন্তু তারও আগে, সেপ্টেম্বর মাসে, ইডেন কলেজের খোদ ছাত্রলীগেরই কিছু নেতা কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে অন্তত তিনটা অভিযোগ আনেন–সিটবাণিজ্য, চাঁদাবাজি, এবং সাধারণ ছাত্রীদের চাপ দিয়ে ‘অনৈতিক’ কাজে’ বাধ্য করা।[৫] পাঠকমাত্রই জানেন এখানে ‘অনৈতিক’ শব্দটাকে পাঠ করতে হবে যৌনকাজ হিসেবে। ইডেন কলেজের প্রশাসন, ক্রমাগত আন্দোলনের চাপের মুখে, একটা তদন্ত কমিটি করতেও বাধ্য হন। তাঁরা ‘তদন্ত’ করে জানান যে অনৈতিক কাজে বাধ্য করার ‘সত্যতা’ পাওয়া যায়নি।[৬] ২০২২ সালের ইডেন কলেজ প্রশাসন যে এই সিদ্ধান্তে আসবেন তা তদন্তের আগেই সকলের আন্দাজ করতে পারার কথা। ইডেন কলেজে এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেও ইডেন কলেজকে একমাত্র উৎপত্তিস্থল হিসেবে না দেখে দেখা দরকার অন্যতম উপসর্গস্থল হিসেবে। ফলত, ওবায়দুল কাদেরের নভেম্বর ও ডিসেম্বরের মন্তব্য কমবেশি আগের মাসগুলোতে বেনাকাব কিছু ঘটনার উপর ‘দায়িত্বপালনসুলভ আলোকপাত’ হিসেবে।

    ‘মিডিয়া-কভার’ হিসেবে দেখলে, আমার মূল্যায়নটি হয়তো বিশেষ দুর্বল ঠেকবে যে এটা তিনটার মধ্যে সবচেয়ে কম চর্চিত হয়েছে। কারণ, পাঠক এখন গুগল করেও অনেকগুলো সংবাদ বের করে ফেলতে পারবেন। বেশি পারবেন ০৬ ডিসেম্বরের কাদের মন্তব্য নিয়ে। অনেকগুলো পত্রিকাই তাঁর বক্তব্যের ‘মেইনটেইন’ অংশটাকেই শিরোনাম বানিয়েছিল। অপেক্ষাকৃত কম পাবেন ১৮ নভেম্বরের পার্টি অফিসে করা মন্তব্যের সংবাদ। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে কম চর্চিত হয়েছে বলতে আমি বোঝাচ্ছি জনাব কাদেরের এই বাক্যমালা বলবার অন্তর্নিহিত অর্থকে যেভাবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় খোলাসা করবার দরকার ছিল তা সংবাদমাধ্যম তরফে করা হয়নি। যে চাপেই হোক, ওবায়দুল কাদের যতটুকু বলেছেন ততটুকুকে ‘প্যানডোরার বাক্স’ হিসেবে না-দেখার সুযোগ ছিল না। তার আগের মাসগুলোতে ইডেন কলেজের প্রকাশ্য অভিযোগ, এবং সেইসূত্রে জন-আলাপে গুজগুজ ধরনের চাপা-অভিযোগ বাতাসে ঘুরছিল। ফলে সংবাদমাধ্যমের খোলাসা করবার পর্যাপ্ত কারণ ও পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। সংবাদমাধ্যমগুলোর উপর বেশুমার চাপ ছিল তা অবশ্যই মনে রাখছি। কিন্তু এই আলোচনাটার উদ্দেশ্য সংবাদমাধ্যমকে অভিযোগ করা বা দায়মোচন দেয়া কোনোটাই নয়। একটা পরিস্থিতির পর্যালোচনা হিসেবে অবশ্যই দাবি করছি আমি যে, কাদেরের সম্মেলনে উল্লেখের পর একটা সেল্ফ-সেন্সরশিপ সংবাদমাধ্যম পালন করেছে। বরং, যে হৈচৈ দানা বেঁধে উঠছিল আগের মাসগুলোতে, সেটার সমাধি দিয়ে দেওয়া হয় খোদ কাদেরের বক্তব্যটির একটা লঘু পরিবেশনার মাধ্যমে। সেখানে এমনকি ‘মেইনটেইন’ কথাটার লিঙ্গমাত্রাকে বিচার করবার দায়িত্বও নেওয়া হয়নি। এটা উভপক্ষেই একটা উইন-উইন ব্যবস্থাপনা। আওয়ামী সরকার আগের বছরগুলোতে ক্রমবর্ধমান লৈঙ্গিক নিগ্রহের চাপা-গুঞ্জন এবং , বিশেষত আগের মাসগুলোতে প্রকাশ্য লিঙ্গনিগ্রহের অভিযোগকে পার্টির সেক্রেটারির মুখে-বলিয়ে একটা মৃদু কবুলিয়তনামা বানাল। আর সংবাদমাধ্যম সেটাকে নিছক শিরোনামেই যথাসম্ভব ধ্যাবসা আকারে হাজির করে গভীর অনুসন্ধানের রাস্তা পরিত্যাগ করবার আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপ্রদান করল। রাজনীতি-বিশ্লেষকরাও কমবেশি নিজ-নিজ কাজে ফেরৎ গেছেন। তাঁদের মুখস্থ বিশ্লেষকের চাকরিতে।

    ভুক্তভোগী নারী, উত্থানপর্বের নারী

    ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনেও ব্যাপকহারে ছাত্রলীগের কর্মীদের অংশগ্রহণ ছিল। আরও বিশেষে, ব্যাপকহারে নারী ছাত্রলীগ কর্মীদের অংশগ্রহণ ছিল। উপরন্তু, কোটা আন্দোলনে নিছক কোটাসংক্রান্ত সংক্ষোভই পুঞ্জীভূত হয়নি। সেখানে নানান ধরনের নিগ্রহ থেকে জন্মানো সংক্ষোভ জড়ো হয়েছিল। সেটা আর কেউ না জানলেও আওয়ামী হেডকোয়ার্টার স্পষ্টভাবে জানত। কিন্তু এগুলো এমন প্রসঙ্গ যে প্রমাণ করা যাবে না। ফলে ধরে নেওয়া যায়, আমার বলতে ইচ্ছা করল বলে বললাম। হাউশ মেটানো আরকি! এই প্রসঙ্গে বিশদে যাবার আগে আমি আরও একটা বিষয়ে, একাধিক জায়গায় বলা সত্ত্বেও, আপনাদের চোখে বা মনে না-পড়তে পারে এই আশঙ্কায়, আবারও বলতে ইচ্ছুক। আওয়ামী লীগের হেড কোয়ার্টার চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটাতে আন্দোলনকারীদের আপত্তি যেভাবেই হাজির/পরিবেশন করে থাকুক না কেন, আন্দোলনকারীরা যতটা স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করতে পারতেন যা করেননি তা সত্ত্বেও, আন্দোলনকারীদের যতটা আপত্তি ছিল ৩০ ভাগ মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে, তার থেকে অনেক বেশি সমস্যা হচ্ছিল এই ৩০ শতাংশের স্থানীয় অনুবাদ নিয়ে। আপনাদের কোনো প্রত্নতত্ত্ববিদ বা ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেটর হতে হবে না এটা জানতে যে এই ৩০ শতাংশ সোজাসাপ্টা বেচাবাট্টা হচ্ছিল।[৭] এই বেচাবাট্টা ননক্যাডার সরকারী চাকরিতে চরম আকার ধারণ করেছিল। আর বলা বাহুল্য যে, বেচাবাট্টার এই নেক্সাসটা স্থানীয় আওয়ামী ক্যাডারদের (এটা একটা যন্ত্রণা যে ক্যাডার মানে সম্পূর্ণ দুইটা জিনিস) সম্পূর্ণ সংরক্ষিত ছিল।

    ছাত্রলীগের নারী কর্মীদের বড় অংশের রাজনৈতিক জীবনযাপন নিয়ে আমি আকস্মিকভাবে ভাবতে বসিনি। এটার একটা ধারাবাহিকতা আছে। গবেষণা-কাতর সহকর্মী বন্ধুদের জন্য জানাতে চাই যে, গবেষণা পদ্ধতিতে আমি ফেইল করতে পারি। তবে তাঁরা যদি আমাকে পরীক্ষায় বসতে বাধ্য করেন তাহলে আমিও কুঁতেমুতে বলব যে আমার পদ্ধতি গুণগত দীর্ঘমেয়াদী বা কোয়ালিটেটিভ লংগিচুডিনাল; কিংবা আমার পদ্ধতিকে আমি ঠেলেঠুলে উপাত্ত ত্রিভূজীকরণ বা ডেটা ট্রায়াংগুলেশন নামে চালাব। এমনকি সবচেয়ে আরামে বলব সোশ্যাল বা রিচুয়্যাল ড্রামা পদ্ধতি হিসেবে। ২০১৬ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আমার প্রচুর সংলাপ হয় ছাত্রলীগের নারীদের অনেকের সাথে। প্রধান মাধ্যম হিসেবে সাইবার যোগাযোগই ছিল অবলম্বন। কিন্তু আজকের রচনায় তাঁদেরকে ‘উত্তরদাতা’ বা রেস্পন্ডেন্ট মর্যাদায় পর্যবসন করব না; এমনকি ছদ্মনামেও। সেটা নিছক এই কারণে নয় যে, আমি অনুমতি নিইনি। মুখ্য কারণ, আমার পদ্ধতিতে এটা একটা টাইমবাউন্ড গবেষণাই নয় যেখানে প্রচলিত বিধিমালা বা মানদণ্ড কাজ করতে পারে। ফলে ওটা আমার রাস্তা হবে না। তবে এই বিষয়বস্তুতে আমার কৌতূহলের আকস্মিকতা নেই দাবি করেছি যেহেতু, আমি অত্যন্ত কাছাকাছি সময়ের দুইটা তৎপরতার বিষয়ে পাঠককে জানান দেব। প্রথমটা হলো, ২০১৪ নির্বাচনের পরপরই ছাত্রলীগে নারী কর্মী বাড়ানোর জন্য জোর-তৎপরতা। বিপণনের দুনিয়ায় এর নাম ‘এগ্রেসিভ মার্কেটিং’ বা ‘এগ্রেসিভ ক্যাম্পেইন’। বিপুল হারে নারী দলে সংযোজন একটা কেন্দ্রীয় উদ্যোগ হিসেবে পাঠ করবার কারণ পাই আমি। দ্বিতীয়টা হচ্ছে, ২০১৩ সাল থেকেই জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (NSI: National Security Intelligence) বাহিনিতে বিপুল পরিমাণে নিয়োগদান। আগ্রহীরা জানেন যে এই দপ্তরটি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে পরিচালিত হয়। ২০১৩ সালে নিয়োগ প্রক্রিয়ার নবায়ন করা হয় যাতে আরও শিথিলশর্তে বা শিথিলবিধিতে এই নিয়োগগুলো দেয়া যায়।[৮] অন্যান্য পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় নারীদের নিযুক্তি লক্ষ্য করবার মতো বেশি ছিল। অবশ্যই নির্ভর করে যে কে কে লক্ষ্য করছেন। আমার উত্থাপিত দুইটা তৎপরতা যা আমাকে কৌতূহলী করেছে তার প্রথমটা কালের বিচারে ঘটেছে পরে, আর দ্বিতীয়টা ঘটেছে আগে। তবে আমি কাল উল্টে লিখবার কিছু সুবিধা পেয়েছি। এর মধ্যে একটা সংসদ নির্বাচন ঘটে গেছে বলে। অধিকন্তু, ম্যানিপ্যুলেটিভ নির্বাচন ঘটেছে সেই সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে; এবং অতি-অবশ্যই ২০১৩ সালে শাহবাগ উত্থানের বিষয়টাকে আওয়ামী হেডকোয়ার্টার নারীকর্মী রিক্রুটের সময়ে বিবেচনায় রেখেছে চিন্তা করে। আজকে সাংস্কৃতিক-রাজনীতিতে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর কিছু পক্ষ যতই ‘শাহবাগী’ পদটিকে জেনেরিক এবং অটুট-আওয়ামীমনস্ক পক্ষ হিসেবে দেখান না কেন, আওয়ামী হেডকোয়ার্টার এবং রাষ্ট্রপরিচালনার অক্ষশক্তি/নেক্সাস[৯] শাহবাগের জমায়েতকে যথেষ্ট অনুগত ভেবে কর্মপরিকল্পনা শুরু করেনি। এই দুটো তৎপরতা ঘটেছে যথেষ্ট আগে; দুটো ঘটনাকেই দেখা চলে পর্যাপ্ত লিঙ্গসচেতনতা হিসেবে; দুটোই তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রীর তখনকার নারীকেন্দ্রিক ঢাকঢোলের সাথে মানানসই ছিল–এসব সত্ত্বেও আমি দেখতে শুরু করি রাজনীতিতে লিঙ্গ-ম্যানেজমেন্ট কৌশল হিসেবে। সেটা আমার জন্য একটা অনায়াস কৌতূহল সৃষ্টি করতে পেরেছিল। ফলে উত্তরকালে আমি ম্যানেজমেন্টের পরিধি বুঝতে গিয়েই সেসব নিগ্রহ আন্দাজ (ও পাঠ) করতে শুরু যা নিয়ে এই অংশটি ব্যাপৃত। বলা বাহুল্য যে, ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আসবার ঢের আগেই আমার এই উপলব্ধি তৈরি হয়।

    ২০২২ সালে ইডেন কলেজে ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দের একাংশের পক্ষ থেকে অভিযোগ উত্থাপন সকল অর্থেই গুরুত্বপূর্ণ। এটা অবশ্যই চমকে যাবার মতো ছিল। তবে এটাকে আকস্মিক বিস্ফোরণ হিসেবে দেখার ভুল করা যাবে না। এই অভিযোগ বহুদিনের প্রস্তুতির একটা বহিঃপ্রকাশ। আমার প্রস্তাব হবে, এটাকে নিছক ইডেন কলেজের বিষয় হিসেবে দেখাও ত্রুটিপূর্ণ। ইডেন কলেজ তামাম বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন ছাত্রলীগের কমিটির মধ্যকার কিংবা সমর্থক পর্যায়ের ‘একদা-এম্বিশাস’ নারীদের বড় একটা অংশের স্মারক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। ইডেনের সেই ছাত্রলীগের নেত্রীবৃন্দ নিজেদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে, নিজেদের নিরাপত্তাকে বাজি রেখেছিলেন। আর তার প্রস্তুতি তাঁরাও নিচ্ছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। যাঁরা আরও গভীরে এসব অনুসন্ধান চালাবেন, তাঁরা অন্তত ২০১৮ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলনের কাল পর্যন্ত এই মানসিক প্রস্তুতির সূচনাবিন্দু খুঁজে পেতে পারবেন। ভোঁতামাথার পাঠক যাতে এরকম একটা অংক কষতে না বসেন যে ২০১৮র ইডেন ছাত্রীরা তো ২০২২-এ আর কলেজে নেই, সেই সতর্কতাতে বলি যে, ক্যাম্পাসগুলোর সামাজিক অভিব্যক্তি বা প্রক্রিয়া এরকম সরল সেশন-মেপে হয় না। এটা একটা নিরন্তর প্রবহমান এলাকা। অন্য যে অভিযোগগুলো তোলা হয়েছিল, সেগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে কোনো সংশয় ছিল না। সংশ্লিষ্ট বলতে আপাতত পত্রিকামাধ্যমের পাঠক এবং বহুমুখী কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী বোঝাচ্ছি। পণ্ডিত ও পাণ্ডিত্যসেবনকারীদের কথা আলাপে আনছি না আপাতত। সিটবাণিজ্য, নির্যাতন, চাঁদাবাজি ইত্যাদি বিষয়ে কমবেশি সকলেরই প্রস্তুতি ছিল। কিছুক্ষণ আগে চমকে-যাবার-মতো বলছিলাম এই অভিযোগ-উত্থাপনকে। ‘অনৈতিক কাজে বাধ্য করা’ তথা যৌননিগ্রহের অভিযোগটাকেও ঠিক ‘কেউ জানত না’ হিসেবে দেখা চলবে না। বরং, একটা কানাঘুষা, সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এবং আরও বিশেষে ছাত্রলীগের ছাত্রীকর্মীদের মধ্যে চলছিল অনেকদিন ধরেই। তারপরও, এই ধরনের প্রায় প্রশ্নাতীত ক্ষমতাকাঠামোর সামনে মারাত্মক রাজনৈতিক ও জীবন ঝুঁকি নিয়ে হাজির করবার একটা নাটকীয় নিস্তব্ধতা তৈরি হয়েছিল। আমার বিবেচনায়, উত্থাপনকারীদের দিক থেকে এটা ছিল এস্পার-ওস্পার একটা রাজনৈতিক পদক্ষেপ। ‘চাল’ পদটা ব্যবহার করলাম না এর সাথে অবধারিত নেতিবাচক দ্যোতনা সম্পর্কিত থাকবার কারণে। তবে দীর্ঘমেয়াদী, অন্তত কয়েক বছরের–যেমনটা বলছিলাম অন্তত ২০১৮ পর্যন্ত ছাত্রলীগের ছাত্রীদের এই প্রস্তুতিকে শনাক্ত করা যাবে–রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রদবদলের একটা আকাঙ্ক্ষাকে পাঠ করতে চাইলে একে ‘চাল’ বলা সম্ভব। খুবই উচ্চমূল্য চাল। টি২০ ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট পরিভাষাতে যেটাকে বলা হয় ‘হাই রিস্ক হাই রিওয়ার্ডিং’। 

    সম্ভবত, উত্থাপনকারীদের সামনে আর কোনো রাস্তা খোলা ছিল না। তাঁরা আর কোনো উপায়ে তাঁদের আপত্তি প্রকাশ করতে পারছিলেন না। সম্ভবত, তাঁরা ভাবছিলেন যদি এই হাইভোল্টেজ অভিযোগ চারপাশ নাড়া দিয়ে ফেলে তাহলে এভাবেই কেবল একটা বিহিত হতে পারে। মাত্র মাস দেড়েক পরেই, কাউন্সিলে ওবায়দুল কাদেরের একটা মাত্র ধমকভঙ্গির উচ্চারণের মধ্যেই সমস্ত যৌননিগ্রহ প্রসঙ্গের নিষ্পত্তি ও যবনিকাপাত হবার মাধ্যমে উত্থাপনকারী ছাত্রলীগের ছাত্রীদের সেই সম্ভাব্য আশঙ্কা অমূলক ছিল না যে সেটাই প্রমাণ হলো। ফলে, আমাদের অনুমান করে নিতে পারলে ভাল, যাঁরা বুঝবার চেষ্টা করেছেন বা করবেন তাঁরা তো অনুমানের বেশিই পারবেন যে, কোটাবিরোধী আন্দোলন আবার দানা বাঁধবার পরেই বিপুল সংখ্যক ছাত্রলীগের ছাত্রীরা হলে হলে, ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে, কলেজে কলেজে দ্রুততার সাথে প্রতিরোধী স্রোতে শামিল হয়েছিলেন। দায়িত্ব নিয়ে বলছি, ঘটেছে সেরকমই। এই পর্যালোচনায় লিঙ্গপ্রশ্নে ওবায়দুল কাদেরকে কীভাবে বিবেচনা করা দরকার তা নিয়ে আমি একেবারেই ভাবনা দিইনি। মনে হয়নি যে আমার ভাবতে বসার কিছু আছে। পাঠকদের কেউ অতি-উৎসুক হয়ে পড়লে, নিজ পছন্দের নিষ্ঠাবান কোনো আওয়ামী কর্মীর সাথেই বরং আলোচনা করে নেবেন।                  

    পৌরুষ-সংহতি বা নারীবিদ্বেষী মহাঐক্য

    ২০২৪ আগস্টের পর সাইবার আওয়ামী লীগ কর্মী/নেতাদের বিলাপ আর হুংকার আজকের আলোচনায় অপ্রাসঙ্গিক। আবার পুরোটা নয়, দুইটা দিক থেকে সম্পর্কিত। প্রথমটা হলো, ‘বিদেশী শক্তির ইঞ্জিনিয়ারিং’ তত্ত্বটা প্রধানত এঁদের সাফল্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো উত্থানকেই তাদের কৃতকর্ম ও প্রজেক্ট হিসেবে দেখানোর বাহাদুরি এই থিসিসটাতে মদদ দিয়েছে মাত্র। এখন আওয়ামী অনুসারী নয় এমন বহু মানুষেই এই থিসিসের অনুসারী। কোনো একটা উত্থানে নানান পক্ষ নানান স্বার্থ নিয়ে থাকেন, এবং মওকামতো বিকশিত হন এই সাধারণ জ্ঞানের থেকে এই ইঞ্জিনিয়ারিং তত্ত্বটা ভিন্ন। এই তত্ত্বে উত্থানটাকে একটা গাণিতিক ফর্মুলার মতো কল্পনা করা হয়। পাঠকের মনে পড়বে, ০৫ আগস্টের পর জয় প্রথম সাইবার-আত্মপ্রকাশেই জনগণের কাছে দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন। তাঁদের ভুল শুধরে তাঁরা রাজনীতি করবেন এরকম অবস্থান ব্যক্ত করেছিলেন। প্রথম সপ্তাহে ওটাকেই আওয়ামী লীগের স্বর ধরে নিতে হবে। তবে খুব দ্রুত, মোটামুটি ১৫ আগস্টের মধ্যেই, এই স্বর পরিহার করে ‘১০০-ভাগ ইঞ্জিনিয়ারিং’ তত্ত্বে আওয়ামী লীগ বা এর হেডকোয়ার্টার বা এর সাইবার-পরিচালক অংশ প্রবেশ করে।[১০] এবং, এরপর আর কখনো স্বরবদল করে না। দ্বিতীয় যেভাবে এই নেতৃ-কর্মীবৃন্দের হুংকার সম্পর্কিত তা পৌরুষ বা ম্যাস্কুলিনিটির, নারীবিদ্বেষ বা মিসোজিনির পাটাতনের অটুট-অখণ্ড সৈনিক হিসেবে। এখানে অটুট-অখণ্ড বলবার মাধ্যমে কেবল তাঁদের নিজেদের পৌরুষসংহতিই বোঝাইনি, বরং ২০২৪ উত্থানপর্বের বিজয়ী কয়েকটা পক্ষের সাথেও এই প্রশ্নে তাঁদের সংহত-অটুটভাব বোঝাচ্ছি। সিপিগ্যাংয়ের উদ্ভব ও বিকাশে মনোযোগ দিলে এই সংহতির জমিন বিষয়ে আমার বক্তব্য অনুধাবন সহজ হবে। বুঝবার জন্য ঐতিহাসিকভাবে জামায়াত আর নারীদের মধ্যে সিপিগ্যাংয়ের টার্গেটকরণ কৌশলের তুলনা যদি করেন তাহলে সহজেই সম্ভব। নারী বলতে এমনকি নন-আওয়ামী সেক্যুলার নারীও।

    জন-আলাপে অনেককেই বিস্মিত হতে দেখেছি, এখনও দেখি। তাঁরা বুঝে পান না যে শেখ হাসিনার মন্ত্রীসভাতে বিশেষ কিছু মন্ত্রীর সংযোজন হয়েছিল কেন। আমি আবার বুঝে পাই না, বিজ্ঞ মানুষজনও অবুঝ হন কীভাবে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনকালে নানাবিধ কম্বিনেশনের মন্ত্রীসভা হয়েছিল তা তো সকলেই জানেন। যদি সেগুলোতে মনোযোগ দেয়া যায়, তাহলে দেখা যায় যে একটা পর্যায়ে, বিশেষত ২০১৮ নির্বাচনের পর থেকে, সেখানে দুইটা কেন্দ্রীয় পলিসি কাজ করেছে। বণিক-সমরতন্ত্রের অলিগ্যার্কি থেকে নিয়োগদান এবং সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয়ের ‘বন্ধু’ তালিকা থেকে নিয়োগদান। এখানে প্রথমটা এতটাই সাধারণ বোধবুদ্ধির বিষয় যে তা নিয়ে বিশদে আলোচনা না করলেও চলে। কেবল, যদি কেউ আপত্তি করে আমলাতন্ত্রের অবসরপ্রাপ্ত অংশটাকে বিবেচনা করিনি ধরে নেন, তাঁকে বলবার আছে যে অলিগ্যার্কি শব্দটা ব্যবহার করেছি সকলের অংশগ্রহণে কোর নিউক্লিয়াসটাই বোঝাতে। বণিক-সমরতন্ত্র খোদ একটা যথাসম্ভব জাঁদরেল বর্গ বটে। দ্বিতীয় প্রবণতাটিও লক্ষ্য করবার মত। করেছেনও লোকজন। হয়তো বলবার সময় ঠিক ওভাবেই যুক্তিসজ্জা করেন না। অনেক লক্ষণ আছে যার থেকে মনে করা যেতে পারে যে শেখ হাসিনা নিজক্ষমতাবলয় প্রায় আমৃত্যু সুরক্ষিত মনে করবার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জয়ের জন্য অপেক্ষাকৃত আরামদায়ক একটা মন্ত্রীসভার দিকে ধীরে ধীরে রওনা হচ্ছিলেন। এই নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অবধারিতভাবে উপেক্ষিত হতে থাকেন বর্ষীয়ান নিবেদিতপ্রাণ পাকাপোক্ত সাংসদ/পার্লামেন্টারিয়ান ও ঘাঘু নেতৃবৃন্দ। একদমই ধারাবাহিকভাবে। এর অন্যদিকটা আরও সূক্ষ্ম। ধারাবাহিকভাবেই পৌরুষভারাক্রান্ত গাদাগাদা মন্ত্রী হতে থাকেন। তবে তাঁদের অফিসিয়াল ক্যাটেগরি দাঁড়ায় ‘তরুণ নেতৃবৃন্দ’। এঁদের সামগ্রিক লিঙ্গদর্শন বা যৌনজীবনের খোঁজ নেবার জন্য আমরা অতি সাধারণ মানুষ। তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের কীর্তি জনদরবারে হাজির হবার কারণে তাঁর নামটা সকলের মনে থাকতে পারে, কিন্তু শান্ত মাথার কোনো বিশ্লেষক নিশ্চয়ই সংখ্যাটা একেই সীমিত রেখে ভাবেন না। 

    ছাত্রলীগের, আওয়ামী লীগের নারীদের বড় বড় অংশ বিভিন্ন কলেজে-ক্যাম্পাসে ২০২৪-এর জুলাইয়েই পার্টি-আনুগত্য প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। এখানে পার্টি-আনুগত্যকে দেখতে হবে স্ট্যাটাস-কো’র মধ্যকার পুরুষ নেতাদের চক্রের প্রতি নিরুপায় আনুগত্য হিসেবে। এই প্রত্যাহার বুঝবার জন্য সার্ভে করে আগাতে পারবেন না। এটা উপলব্ধির জন্য খুবই শান্তভাবে দীর্ঘমেয়াদী নানাবিধ লক্ষণকে পুনর্তদন্ত করতে হবে আপনাদের। এমনকি অনেক বছর ধরে মনোযোগ অতীতে না দিয়ে থাকলে আজকে আমার কথায় প্রলুব্ধ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেও বুঝে উঠতে না পারেন। সাধারণ ছাত্রীরা, মফস্বলের সাধারণ নারীরা, কিংবা কলেজে-ক্যাম্পাসে বাধ্য হয়ে ছাত্রলীগ করতে-থাকা নারীদের ভূমিকা তৈরির ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের ‘বিদ্রোহী’ সাধারণ ছাত্রী ও নেতৃবৃন্দের অবস্থানবদল বিশাল অনুঘটকের কাজ করেছে। কোনোরকম সন্দেহ ছাড়াই মীমাংসায় আসতে পারেন যে, নারীদের এই ঐক্য আপৎকালীন যেমন, শক্তিশালী লিঙ্গবন্ধনও বটে। 

    সমাপনী অনুচ্ছেদে আমি যা বলব তা বিদ্যাজগতে স্পেকুলেটিভ (বা আন্দাজে বলা) হিসেবে মহানিন্দিত। বিদ্যাজগত থেকে ডিডাক্টিভ-হারমিউনেটিক ধারাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় দিতে বিশাল কারখানা প্রস্তুত। আমার সহকর্মীরাও মানানসইভাবে প্রস্তুত। তা থাকুন। আমার আগের অনুচ্ছেদগুলোকেও এই গম্ভীরমুখো গবেষকবৃন্দ বিশেষ পাশ করতে দিতে না চাইতে পারেন। তাই আলাদা করে দুশ্চিন্তা করছি না। আমার বক্তব্য এই নয় যে, ০৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর পৌরুষসংহতির পুনর্জাগরণের জন্য এসব নারীরা প্রস্তুত ছিলেন না। তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন অন্তত এই কারণেও যে আগের ১০-১২ বছর ধরে দফায় দফায় নাগরিক পরিমণ্ডলে তাঁরা পাল্টা-প্রতিরোধ করেছিলেন, এবং বানানো-জমিন হারিয়েছেন। বড় মাপে এই অভিজ্ঞতা তাঁদের হয়েছে ২০১৩’র শাহবাগ উত্থানোত্তর কালে, ২০১৮’র নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং কোটাবিরোধী আন্দোলনের পরের কালে। কিন্তু তারপরও উত্থানপর্বের অধিনায়কদের কাছ থেকে এত দ্রুত লিঙ্গপ্রশ্নের প্রতি অবজ্ঞার জন্য নারীরা প্রস্তুত ছিলেন বলে আমি মনে করি না। কীভাবে ২০২৪ পরবর্তী রাজনৈতিক শক্তি লিঙ্গপ্রশ্নে আকাট-সাবেক মডেল অনুসরণ করেছে, এমনকি ক্ষেত্রে বিশেষে থিওক্রেটিক শাসনশক্তির সাথে আপোষের মাধ্যমে আরও কঠোর মডেল অনুসরণ করেছে তা সম্পূর্ণ আরেকটা স্বতন্ত্র আলোচনার বিষয় হতে হবে। যাঁরা ভাবছেন, এনসিপির অগ্রগামী নারীরা জিনিসটা আগেভাগে বোঝেননি, তাঁদের সাথেও সহমত হবার সম্ভাবনা আমার কম। তাঁরা ন্যূনতম আলামতেই বুঝেছিলেন; তবে একটা সদ্যবদলকৃত পরিস্থিতিতে নিজেদের লিঙ্গরাজনীতির লেভারেজ খুঁজতে তাঁদের মনোযোগী হতে হয়েছিল। চতুষ্পার্শ্বে কাণ্ডজ্ঞানহীনতার বিস্তর নজিরের মধ্যে সতর্কতামূলক কৈফিয়ৎ দেয়াই ভাল যে, যৌননিগ্রহ আর লিঙ্গবৈষম্যকে গুলিয়ে ফেলে একাকার করে দেখা চলবে না। একথা ঠিকই যে, আজকের আলোচনায় ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের মধ্যকার উত্থাপিত যৌননিগ্রহের অভিযোগটিকে কেন্দ্রে রেখেছিলাম। সেটা বৃহত্তর লিঙ্গবৈষম্যের একটা উৎকট অংশ মাত্র। পক্ষান্তরে, শেষের অনুচ্ছেদে বলেছি, নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে লিঙ্গবৈষম্যের কোনো অবসান তো হয়ই নাই, বরং ক্ষেত্রেবিশেষে থিওক্রেটিক ইনডক্ট্রিনেশন কঠোর হয়েছে। আমার সাধারণ প্রতিপাদ্যটি হচ্ছে, ছাত্রলীগের অগণিত নারীকর্মীর প্রারম্ভিক বিদ্রোহকে উধাও করে দেবার মাধ্যমেই এই পৌরুষসংহতির সূচনা ঘটেছিল।   

    টীকা:

    ১। এই ঘটনার সাইবার পদচিহ্ন খুব কম। সম্ভবত, কিছু পত্রিকা আন্দোলনের ওই পর্যায়ে কার্যত একটা ‘মিডিয়া-কভারেজ’মূলক সংবাদ এড়িয়ে গেছে। কিছু ‘মুখ্য’ পত্রিকা হয়তো ২০২৪-আগস্টের পরে নানাবিধ চাপে অনলাইন থেকে এরকম ছাত্রলীগের প্রমোশনাল খবর সরিয়ে থাকতে পারে। মানে সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছি না। ছাত্রলীগের পুরুষ নেতৃবৃন্দ যে উপস্থিত ছিলেন, অন্তত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সেই তথ্য দিচ্ছে আরও কম সংবাদমাধ্যম। সব মিলে দুটো অন্তত খবরের লিংক দিচ্ছি:

    https://khaborerkagoj.com/politics/822913

    https://www.dhakatimes24.com/2024/07/29/360532 

    ২। এটার ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট অনেক সুলভ, এখনও। তাও অন্তত দুই দফার খবর। ০৪ ফেব্রুয়ারি প্রথমবার আসামী ধরবার পর। দ্বিতীবার র‍্যাবকর্তৃক অপর দুজন আসামী ধরা পড়বার পর, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪। এই দিনেরই কার্যক্রম অসরাচর দৈর্ঘ্যের ও রিডিং-বিটুইন-দ্য-লাইনের র‍্যাব সংবাদ সম্মেলন। একটা দৈবচয়নকৃত খবর:

    https://www.prothomalo.com/bangladesh/crime/iraei0ts5l

    ৩। এই বিষয়ে বিবিসির খবর: 

    https://www.bbc.com/bengali/articles/c72gp6gem50o

    ৪। এই খবরের ফুটপ্রিন্টই বরং এখন সুলভ। একটা প্রতিনিধিত্বশীল সংযোজন মাত্র:

    https://www.banglatribune.com/politics/awami-league/775959/

    ৫। মনে হয় না যা ও যতটুকু খবর আছে সাইবারে তা কেউ ডিলিট করবেন আর। প্রথম আলোর খবর:
    https://www.prothomalo.com/bangladesh/crime/bgeqzrghzm 

    ৬। বাংলা ডেইলি স্টারের খবর: 

    https://bangla.thedailystar.net/youth/education/campus/news-401471 

    ৭। আকালের মধ্যেও একটা দুটো খবর পাওয়া যায়:

    https://samakal.com/international/article/2309196014 

    ৮। যা বুঝলাম ২০১৩-তে প্রথমবারের মতো “জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদপ্তর (কর্মকর্তা ও কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা ২০১৩” নামে একটা সুনির্দিষ্ট নিয়োগ বিধিমালা প্রণীত হয়, এনএসআইয়ের জন্য। এর আগে ১৯৭৯ সালের “বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন (পরামর্শকরণ) প্রবিধিমালা, ১৯৭৯,” “প্রেষণ প্রবিধান ও সার্ভিস রুলস,” এবং ১৯৭৫ সালের রাষ্ট্রপতির বিশেষ নির্বাহী আদেশের আওতাভুক্ত “বিশেষ প্রশাসনিক আদেশ ও অ্যাডহক নিয়োগ বিধি” দিয়ে নিয়োগগুলো পরিচালিত হতো। ২০১৩র বিধানে সুস্পষ্টভাবে এটাকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের আওতাভুক্ত করা হয়; মোটামুটি ৪৫টা বর্গে নিয়োগের বিধান রাখা হয়, একদম ক্লিনার সুইপারের মতো নিম্নস্তরের চাকরিগুলো সমেত। এর মধ্যে আমার আলোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক হচ্ছে ৬ষ্ঠ ক্রমে থাকা সহকারী পরিচালক পদটি। এখানে শতকরা ২৫ ভাগ পদোন্নতির মাধ্যমে, এবং বাকি ৭৫ ভাগ সরাসরি নিয়োগের বন্দোবস্ত রাখা হয়। এই বদলটা গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৩তে প্রণীত হবার সাথে সাথেই প্রায় ২০১৪তে একটা সংশোধনী আসে। আপাত অগুরুত্বপূর্ণ হলেও সেই সংশোধনীতেই আওয়ামী শাসনযন্ত্রের তদানীন্তন কোটানীতির সাথে মানানসই করে গড়ে তোলা হয়। নারীদের সম্পৃক্তি বাড়ানোর জন্যও কী কী উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইত্যাদি। ২০২২-এ আরেকটা সংশোধনী আসে যাতে সম্ভবত প্রযুক্তিতে কিছু গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে আমার আন্দাজ হলো, এটুআই ইত্যাদির সাথে পেঁচায়ে-পুঁচায়ে কিছু করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এগুলোতে সময় দিলেই আরও বোঝা সম্ভব। আপাতত কারো কৌতূহল থাকলে, জ্যান্ত আছে বিধায়, ২০১৩র গেজেটখানা দেখে নিতে পারেন। 

    https://objectstorage.ap-dcc-gazipur-1.oraclecloud15.com/n/axvjbnqprylg/b/V2Ministry/o/office-legislativediv/2024/12/ad73a141ae5344deb0a78f41a44a235b.pdf 

    ৯। অধুনা, মুখ্যত সাইবারালোচনা থেকে উদ্ভূত ও বিকশিত, ‘ডিপস্টেট’ পদটা দিয়ে যা বোঝানো হয় তাও বলতে পারতাম, তবে অধুনা এই শব্দটা প্রায় মিলিটারির সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাতে আমার অশান্তিই কেবল যে হয় তা নয়, চরম আপত্তি আছে, আমার জন্য ‘ডিপস্টেট’ বরং অক্ষশক্তি/নেক্সাসের দ্যোতনা বেশি বহন করে। মিলিটারির দায়মোচন ঘটিয়ে একটা ৯০-দশকের সিভিলসমাজের ভার সিন্দাবাদের ভূতের মতো বহন করলাম বৃদ্ধ বয়সাবধি। এখন আবার ‘মিলিটারি মিলিটারি’ জিকির তুলে অবধারিত ‘সিভিল’ মার্কা মানুষদের সাথে এদের অলিগ্যার্কের অর্থহ্রাস করবার বৌদ্ধিক অপরাধ করতে আমি রাজি নই। 

    ১০। আওয়ামী লীগে হেডকোয়ার্টার বা এর সাইবার-পরিচালক অংশ ইত্যাদি এখন কমবেশি একাকার, অটুট, অভিন্ন। তৃণমূল আওয়ামী লীগকর্মী কিংবা নিষ্ঠাবান আওয়ামী কর্মীদের কণ্ঠস্বর শ্রুত নয় একটুও। তাঁদের বিদঘুটে রকমের জীবনলড়াইও আলোচিত নয়, এমনকি খোদ আওয়ামী লীগের হেডকোয়ার্টারের কাছেও উপেক্ষিত বটে। অন্তত আমি তাই উপলব্ধি করি। একটা প্রাসঙ্গিক বিষয় বলি বরং। যদিও সজীব জয়ের নিজের দিক থেকে প্রয়োজন ছিল না হয়তো, বা তিনি প্রয়োজন অনুভব করেননি, তবুও তিনি প্রথম ‘হুংকার’ মুড গ্রহণ করলে, তাঁর ইউট্যুব লিংকে আমি তাঁদেরকে রাজনৈতিক পরামর্শ দেবার প্রস্তাব করেছিলাম। সেটা আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে, ২০২৪ সালে। আমার তরফে এটা বিনামজুরির প্রস্তাবই ছিল, কিন্তু তিনি হয়তো দেখেননি।    

    আদাবর, ঢাকা। ২২ মে – ০৩ জুন, ২০২৬

  • ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় || ভারতবর্ষের ধারণার বহুবিধ ইতিহাসতাত্ত্বিক দ্যোতনা

    ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় || ভারতবর্ষের ধারণার বহুবিধ ইতিহাসতাত্ত্বিক দ্যোতনা

    অনুবাদ : স্বাধীন সেন

    [অনুবাদকের টিকা : অধ্যাপক ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রভাববিস্তারী চিন্তক হিসেবে বিবেচিত হন। যদিও বাংলাদেশের বিদ্যায়তনের ইতিহাস চর্চায় ও চিন্তায় অন্যান্য অনেক প্রভাবশালী চিন্তকের মতন উনার চিন্তাভাবনা আর বইপত্রের সঙ্গেও আমাদের পরিচিতি খুবই অল্প। ভারতের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও পরে দীর্ঘদিন জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন তিনি। আদিমধ্যযুগ আর আদি পর্বের ইতিহাসের বিভিন্ন চিন্তা ও বিতর্কের ক্ষেত্রে উনার অবদান বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত। ইতিহাস চিন্তায় ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণা ও লেখালেখির গুরুত্ব এবং প্রভাব ধারণাগত ক্ষেত্রে যেমন তাৎপর্যপূর্ণ তেমনই উপাত্ত ও সূত্র ব্যবহার ও বিশ্লেষণ পদ্ধতি অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছে। এই প্রবন্ধটি উনার চিন্তা ও পর্যালোচনার পদ্ধতি বোঝার ক্ষেত্রেই কেবল গুরুত্বপূর্ণ না। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় ইতিহাস চর্চা ও ইতিহাস জ্ঞানকে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও পরিচয়বাদী বয়ান উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করার হালের বহুবিধ তৎপরতাকে পর্যালোচনা করার গভীর ও নিবিড় পদ্ধতি আমলে আনার জন্য উনার লেখালেখি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এই প্রবন্ধটি ‘দ্য কনসেপ্ট অফ ভারতবর্ষ অ্যান্ড ইটস ইমপ্লিকেশনস’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রবন্ধের বাংলা তর্জমা। প্রবন্ধটি ‘দ্য কনসেপ্ট অফ ভারতবর্ষ অ্যান্ড আদার এসেস’ (২০১৮, স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্ক প্রেস) বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

    সম্প্রতি হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদী প্রবল ইতিহাসের বয়ানে আর বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপচারিতায় ‘অখণ্ড ভারত’ এবং অনন্ত কাল ধরে অস্তিত্ত্বশীল একটি স্থির, অনড় আর বাস্তব ভূখণ্ডগত পরিচিতি হিসেবে ভারতের পরিচয়কে নির্মাণ করার আধিপত্যশীল তৎপরতাকে ইতিহাসতাত্ত্বিক লেন্স দিয়ে পর্যালোচনা করার জন্য ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের এই প্রবন্ধটি একটি অসাধারণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে আমার মনে হয়েছে। আধিপত্যশীল ও সংখ্যাগড়িষ্ঠতাবাদী হিন্দু জাতীয়তাবাদী বয়ানে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র ও আলামতের উদ্দেশ্যমূলক, বাছাইকৃত ও পর্যালোচনাবিহিন ব্যবহার প্রবল হয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রণালিবদ্ধ প্রচারণা এই প্রাবাল্যকে বাড়িয়েছে। আবার এই অতীতের উপরে দখলদারিত্ব করে ইতিহাস বা প্রত্নতত্ত্বের বয়ান উৎপাদনের মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে একইরকম বিপজ্জনক তৎপরতাও লক্ষ্যণীয় ভাবে বেড়ে গেছে। নিবিড়, পদ্ধতিগত আর ধারণাগত পর্যালোচনার মাধ্যমে এসব হিন্দু জাতীয়তাবাদী ইতিহাস বয়ানের বিরুদ্ধে যারা পাল্টা বয়ান তৈরির চেষ্টা করছেন তারাও আবার পাল্টা পরিচয়বাদের খপ্পরে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই বিবাদমান ইতিহাসের বয়ানগুলো পরস্পর পরস্পরের বুনিয়াদী রূপরেখা পুনরুৎপাদন করছে। কেবল জাতি, সম্প্রদায়, জাতিবর্ণ বা আঞ্চলিক পরিচয়গত পদটি প্রতিস্থাপিত হচ্ছে মাত্র। হিন্দুত্ববাদী বয়ানের ‘নিজ’ ও ‘অপর’ পাল্টা বয়ানে কেবল উল্টে যাচ্ছে। অথচ হিন্দুত্ববাদী বা কট্টর বিভিন্ন পরিচয়বাদী ইতিহাসের আখ্যানগত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ইতিহাস বোঝার ও ব্যাখ্যা করার ধারণা ও পদ্ধতিগত প্রসঙ্গগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে পরিচয়বাদী অতীত দখলের যুদ্ধে মত্ত পক্ষগুলোর আপাত পরস্পর বিরোধী বয়ানগুলোকে পর্যালোচনা করা দরকার। ইতিহাস শাস্ত্রটির মধ্যকার বিভিন্ন তর্ক-বিতর্ক সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া যেমন ইতিহাসবিদগণ ও প্রত্নতত্ত্ববিদগণের দায় তেমনই দক্ষিণ এশিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ইতিহাস লিখনের ধারণা, পদ্ধতি আর উৎসের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে শেখাটাও দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। বিভিন্ন উৎস ও আলামতকে পরিপ্রেক্ষিতে রেখে বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে ভূখণ্ডগত কালবিভ্রান্তিকে ধারণা ও পদ্ধতিগতভাবে ক্রটিপূর্ণ প্রমাণ করা সম্ভব। আধিপত্যশীল ও জনতুষ্টিবাদী ইতিহাসের পরিচয়বাদী বয়ানগুলোকে পর্যালোচনা করার জন্য বিশদ, নিষ্ঠ ও নিবিড় বিশ্লেষণ পদ্ধতি প্রয়োজন। এই প্রবন্ধটি তেমন বিশ্লেষণ পদ্ধতির একটি অনুসরণীয় উদাহরণ হতে পারে। ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের অনন্যসাধারণ চিন্তা পদ্ধতি এবং গভীর উপলব্ধিগত বিশ্লেষণ পদ্ধতি অনুসরণ করা একঅর্থে পরিশ্রমসাধ্য আর অন্তদৃষ্টি অর্জনের সাধনার কাজ। সেই সাধনা ও অনুধ্যানের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্যও এই প্রবন্ধটি কার্যকর হতে পারে। এই অনুবাদটি এবছরের সিল্করুট ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। আমি সিল্করুট এবং সিল্করুট ঈদসংখ্যার সম্পাদক শানজিদ অর্ণবের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।]

    এই প্রবন্ধের মূল বিষয়বস্তু হিসেবে ‘ভারতবর্ষের’ ধারণাকে বেছে নেওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। আমরা যে দেশে বাস করি তা হলো ভারতবর্ষ, আর এই ভারতবর্ষই হলো ‘ইন্ডিয়া’, শৈশব থেকেই আমরা এই ধারণাটি নিয়ে বেড়ে উঠেছি। আমাদের ধারণা ছিল ভারতবর্ষ এমন একটি মানচিত্র যার সুনির্দিষ্ট সীমানা রয়েছে এবং অনুরূপ মানচিত্র দ্বারা চিহ্নিত অন্যান্য দেশ থেকে এটা আলাদা। ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগ মানচিত্রটিকে বদলে দিয়েছিল। কিন্তু ‘ভারতবর্ষর’ ধারণা এবং নামটি রয়ে গেছে। আমাদের পূর্বসূরিদের কাছে মনে হতো, ভারতবর্ষ এমন একটি দেশের ছবি বহন করে চলেছে যে দেশ চিরকাল ছিল এবং মানচিত্রের পরিবর্তন সত্ত্বেও যে দেশ চিরকাল থাকবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হওয়া আর আজকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কিত ভারত বা ভারতবর্ষের ধারণার ইতিহাসের ঐতিহাসিক পরিবর্তনের নিরিখে পর্যালোচনামূলকভাবে পরীক্ষা করা বাকি রয়ে গেছে। অন্য কথায় স্থানিক পরিসরের ধারণা বা অর্থ, সেই ধারণার দ্বারা নির্দেশিত প্রকৃত ভৌগোলিক স্থানিক পরিসর, এবং আমাদের ইতিহাসের আধার (locus) হিসেবে সেই স্থানিক পরিসরের  মধ্যকার সম্পর্কের প্রসঙ্গটি নতুন করে উন্মোচন করা প্রয়োজন। কারণ এখন আমরা যে বিষয়গুলোকে স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে মেনে নিচ্ছি, সেগুলো আসলে বেশ কিছু পূর্বানুমানের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের ইতিহাস উৎসগুলোতে নিহিত বহুবিধ অর্থকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়ায়, এই পূর্বানুমানগুলো বিশেষ করে আদি পর্বের ভারতীয় ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের সাধারণীকরণগুলোকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করেছে।

    উদাহরণস্বরূপ, একটি বুনিয়াদী পূর্বানুমান হলো যে ‘ইন্ডিয়ার’ এবং ‘ভারতবর্ষর’  ধারণা অভিন্ন বা একই। ঠিক কোন উপায়ে এই ধারণা দুটির বিভিন্ন অর্থ একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়েছিল সেকথা এই প্রবন্ধে ঐতিহাসিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তবে একথা স্পষ্ট যে ঊনিশ শতকের মধ্যে ইতিহাস লিখনে এবং সাধারণের চিন্তাভাবনায়ও উভয় ধারণার অভিন্নতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। যারা ইন্ডিয়া অথবা তার ধারণা নিয়ে লেখেন, তারা ধরেই নেন যে তারা যেকথা বোঝাতে চাইছেন সেকথা ‘ভারতবর্ষ’ শব্দটি দিয়েও ব্যক্ত করা যায়। এই দুটি শব্দ একইভাবে আমাদের অতীত বা ইতিহাসের বোধ বহন করে। এমনকি ঔপনিবেশিক ইতিহাস-লিখনের প্রাথমিক পর্যায়গুলোতেও ‘হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া’ বা ভারতের ইতিহাস কল্পনা করা সহজ ছিল। সেই একই ধাঁচে কোনো দেশীয় উদ্যোগ যদি নেওয়া হতো, তবে বাংলা ভাষায় তার শিরোনাম হতো ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’।[১] ভারতবর্ষকে ইন্ডিয়ার সঙ্গে এক করে দেখার একটি একাডেমিক উদাহরণ হলো পৌরাণিক বিশ্বতত্ত্বীয়-রূপরেখার (cosmography) সূত্রে একজন নামকরা গবেষকের এই বিবৃতিটি:[২]

    ‘হিমবৎ এবং সমুদ্রের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত সর্বদক্ষিণের বর্ষ, অর্থাৎ ভারতই ইন্ডিয়া। (নজরটান সংযোজিত)’

    ইন্ডিয়া এবং ভারতবর্ষের অভিন্নতার এই বোঝাপড়া এবং বিনা দ্বিধায় গ্রহণযোগ্যতা আমাদের সংবিধানের এই গাম্ভীর্যপূর্ণ ঘোষণায় আরও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে: ‘ইন্ডিয়া যা ভারত হবে রাজ্যসমূহের একটি সমষ্টি (Union of States)।’[৩] এই ঘোষণাটি আমাদের দেশ এবং জাতীয়তার পরিচয়ের ওপর একটি ঐতিহাসিক সিলমোহরের ছাপ দিয়ে দেয়। কিন্তু অপরিহার্যভাবে আমাদের ইতিহাসের ওপর সেই সিলমোহর কাজ করে না। মনে রাখা প্রয়োজন, শব্দ দুটির উৎপত্তি ভিন্ন। একটি শব্দ (ইন্ডিয়া) দেশটিকে দেখছে ভৌগোলিকভাবে বাইরের দৃষ্টিকোণ থেকে এবং এই শব্দটি বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন অর্থ বহন করেছে। অন্য শব্দটি, ‘ভারতবর্ষ’, ধারাবাহিকভাবে (যদিও অনন্তকাল ধরে নয়) ভিন্ন ভিন্ন অর্থে বিভিন্ন ধরণের প্রাচীন টেক্সটে ব্যবহৃত হয়েছে। এই ধারণাগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিশ্বতাত্ত্বিক-রূপরেখার মধ্যে স্থিত রয়েছে। সুতরাং ‘ভারতবর্ষ’ শব্দটির ব্যঞ্জনাগুলো একেবারেই আলাদা। ‘ভারতবর্ষের‘ বিভিন্ন খণ্ডাংশকে কীভাবে কল্পনা করা হয়েছে সেই প্রসঙ্গে লিখিত উৎস/টেক্সটগুলোতে ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। সুতরাং সম্ভাব্য আধুনিক সংহতিগত পরিচয়গুলো থেকে দুরে থেকে স্বাধীনভাবে এ-শব্দটির আদি ইতিহাসের অনুসন্ধান করা এবং ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে যেসব অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে সেই প্রসঙ্গ স্পষ্ট করা ফলপ্রসূ হতে পারে।

    এই আলাপচারিতার সঙ্গে ইতিহাসতত্ত্বের প্রকৃতিও জড়িত। ভারতের ধারণার ইতিহাস অন্বেষণ করার কিছু সাম্প্রতিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, আমরা দীর্ঘকাল যাবত ধরেই নিয়েছি যে, আমরা যে দেশে বাস করি তার অর্থের ব্যঞ্জনা বরাবরই একই রকম ছিল। আরো মনে করি, বর্তমানে আমরা দেশ সম্পর্কে যা ভাবি, অতীতেও ঠিক তাই ভাবা হতো। তবে নিতান্ত কান্ডজ্ঞানের কথা বিবেচনায় নিলেও অনুভব করার কথা যে, ভৌগোলিক স্থানিক পরিসর এবং ‘ভারতবর্ষের’ ধারণাগুলো সংজ্ঞায়িত এবং পুনঃসংজ্ঞায়িত হয়েছে। কোনো একটি স্থানিক পরিসর আর সেখানকার মানুষজনের ইতিহাস বুঝতে হলে সংজ্ঞা নির্ধারণ ও পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।

    দ্বিতীয়ত, সাধারণত জাতীয়তাবাদ হিসেবে আখ্যায়িত কোনো একটি নির্দিষ্ট যৌথ সংবেদনের সঙ্গে কোনো স্থানিক পরিসরকে একাকার করে দেখাটা সেই স্থানিক পরিসর অথবা সেখানে বসবাসকারী যৌথ মানবসত্তার কোনো ‘পূর্ব-প্রদত্ত গুণ’ নয়। জাতীয়তাবাদের মতন সামষ্টিক সংবেদনশীলতা ঐতিহাসিকভাবে অর্জিত হয়। এই সংবেদনশীলতার রূপান্তর/মিউটেশন ঘটতে পারে। একটি দেশ বা সেই দেশ সম্পর্কে ধারণাগুলো ওই যৌথ সংবেদনশীলতা থেকে স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল থাকতে পারে ততক্ষণই যতক্ষণ না পর্যন্ত এই ঐতিহাসিকভাবে অর্জিত চেতনা অভিব্যক্তির বিভিন্ন রূপায়নের মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

    আজ যখন আমরা মেনে নিয়েছি যে একটি ভৌগোলিক গণ্ডীবদ্ধ (তা যেভাবেই হোক-না-কেন) এবং সাংবিধানিকভাবে সংজ্ঞায়িত দেশই হলো আমাদের আপন, তখন অতীতে সেই দেশটির অর্থ কী ছিল তা খতিয়ে দেখা আমার কাছে বিভিন্ন কারণেই জরুরি মনে হয়। ইতিহাসতাত্ত্বিকভাবে, সেই অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে আমরা একটি বিশেষ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। বিশেষভাবে কারণ হলো ‘ইন্ডিয়া’ বা ‘ভারতবষের’ ধারণা সম্পর্কে বর্তমানে পুরোপুরি ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়েও সাম্প্রতিক লেখাগুলোতে এই প্রসঙ্গে তিনটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গিগত অবস্থানকে চিহ্নিত করা সম্ভব।

    একটি অবস্থানের যাত্রা মূলত ঔপনিবেশিকরা ইন্ডিয়াকে যেভাবে একটি প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক একক হিসেবে তৈরি করেছিল সেখান থেকেই শুরু হয়েছে বলে মনে হয়। এই অবস্থানগত চিন্তাভাবনা সুদূর অতীতেও ‘ইন্ডিয়া’ বা ‘ভারতবর্ষ’ ধারণাটি আধুনিক জাতীয় ঐক্যের বহিঃপ্রকাশ ছিল এমন বিবেচনাকে গুরুত্ব দেয়। গত শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শুরুর দিকে প্রকাশিত ‘দ্য ফান্ডামেন্টাল ইউনিটি অফ ইন্ডিয়ার’ (The Fundamental Unity of India) [৪] মতো মনোগ্রাফ বা গবেষণাপত্রগুলো এই ঐক্যের ধারণাকে জোরালোভাবে প্রক্ষেপ করেছিল; এই ধারণায় ‘ঐক্য’ হলো দেশটির একটি মৌলিক গুণ। ভারতীয় ভূগোলের বিভিন্ন ধারণা, তীর্থস্থানগুলোর নেটওয়ার্ক এবং যুদ্ধজয় বা উপনিবেশ স্থাপনের মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্যের বাসনাকে চিহ্নিত করার মাধ্যমে এই মৌলিক গুণের প্রমাণ খুঁজে বের করা হতো । আমাদের অখণ্ড দেশের অস্তিত্বের এই ধারণাটি ভারতের ইতিহাসের উপর লেখালেখিগুলোতে ভূখণ্ডগতভাবে একটি প্রশ্নাতীত একক সত্তা হিসেবে ঢুকে গেছে। অথচ এই ভূখণ্ডের বিভিন্ন অঞ্চলগুলোর আলাদা আলাদা প্রাণশক্তি ছিল । ভারতবর্ষের ভূগোলের সঙ্গে সম্পর্কিত করে ‘ভারতীয় জাতিকে’ অতীতে এমনভাবে প্রক্ষেপণ একটি ধ্রুব দশা হিসেবে আজও অব্যাহত রয়েছে। ‘দ্য ফান্ডামেন্টাল ইউনিটি অফ ইন্ডিয়া’-তে ভারতবর্ষ বা ইন্ডিয়াকে একটি প্রাচীন জাতির পরিসরগত আধার হিসেবে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছিল। এমন অর্থের চিহ্নিতকরণ ‘দ্য কনসেপ্ট অফ ইন্ডিয়া’ (The Concept of India)[৫] শীর্ষক একটি সাম্প্রতিক গ্রন্থেও উপস্থিত। এই বইয়ে বলা হয়েছে:

    স্পষ্টতই উপমহাদেশের [উত্তরে হিমালয় এবং দক্ষিণে সমুদ্রের মধ্যবর্তী দেশটির] অধিবাসীদের পৌরাণিক লেখকরা একটি জাতি (nation) হিসেবে বিবেচনা করতেন, অন্তত ভৌগোলিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে। অন্তত জনসাধারণের একটি অংশের মধ্যে এমন অনুভূতি ছিল যে পুরো উপমহাদেশটি (বা এর সিংহভাগ) এমন এক বা একাধিক জনগোষ্ঠী দ্বারা অধ্যুষিত যারা একটি সংযোগকারী সংস্কৃতি বা একটি ‘ছাতার মতন’ সংস্কৃতির (umbrella culture) কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য এমন গভীরভাবে ভাগ করে নিত যে তাদের ‘ভারতী’ হিসেবে একটি সাধারণ নামে ডাকা যেত। সুতরাং রাজনৈতিক বা জাতিগতভাবে না হলেও, ভৌগোলিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে, ভারতীয়রা ছিল একটি জাতি।

    ঠিক বিপরীত একটি অবস্থান নেওয়া হয়েছে বলে মনে হয় ‘সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ’ সিরিজের একটি খণ্ডে প্রকাশিত ‘দ্য ইমাজিনারি ইনস্টিটিউশন অফ ইন্ডিয়া’ (The Imaginary Institution of India) শীর্ষক প্রবন্ধে। প্রবন্ধটি বেশ বলিষ্ঠভাবে শুরুতেই নিচের বিবৃতিটি দেয়  : [৬]

    যা আজকের ইতিহাসের এক নৈর্ব্যক্তিক বাস্তবতা, যার বস্তুনিষ্ঠতা মানুষ সংরক্ষণ করতে পারে, ধ্বংস করতে পারে, তুলে ধরতে পারে, নির্মাণ বা ব্যবচ্ছেদ করতে পারে; এবং যার পক্ষে বা বিপক্ষের সমস্ত প্রচেষ্টায় এই বাস্তবতাকে স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, সেই ইন্ডিয়া কোনো আবিষ্কারের (discovery) বস্তু নয়, বরং একটি উদ্ভাবন (invention)। এমন বস্তুনিষ্ঠতা ঐতিহাসিকভাবে ঊনিশ শতকের জাতীয়তাবাদী কল্পনার দ্বারা প্রাতিষ্ঠানিকীকৃত হয়েছিল। (নজরটান সংযোজিত)

    এই বিবৃতির পটভূমির বিশ্লেষণগত চর্চা কোনো প্রমাণযোগ্য সারবত্তাসম্পন্ন ঐতিহাসিক নথিপত্রের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে নাই। সেকথা বাদেও প্রবন্ধটির দৃষ্টিভঙ্গিতেই কিছু প্রচ্ছন্ন পূর্বানুমান রয়েছে যেগুলো প্রশ্নের উদ্রেক করে: (১) ‘ঐতিহাসিক বাস্তবতা’ হিসেবে জাতীয়তাবাদ এবং ‘ইন্ডিয়ার ধারণা’ – এমন দুটো বিষয়ের মধ্যে মধ্যে প্রবন্ধটি যে অপরিহার্য সমীকরণ টানে; (২) শূন্য থেকে ‘উদ্ভাবনের’ আলাপ যা কোনো পূর্ব-বিদ্যমান ধারণা ছাড়াই ইন্ডিয়ার ধারণা বিকশিত হওয়ার কথা বলে অথচ এই ধারণা হয়তো ভিন্ন ধরনের ‘নৈর্ব্যক্তিক বাস্তবতা’ হতে পারত (অনিবার্যভাবে ‘জাতীয়তা’ না বুঝিয়েও); এবং (৩) একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্র ও তার ইতিহাসের নির্মাণের সঙ্গে আধুনিক ‘ইন্ডিয়ার’ ধারণার একটি ঔপনিবেশিক পরিসর উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করে এবং পুরো ‘উদ্ভাবনটিকেই’ জাতীয়তাবাদী কল্পনার ওপর আরোপ করে। আসলে ‘প্রতিষ্ঠান’বলতে কী বোঝায় তা সংজ্ঞায়িত না করেই স্থানিক পরিসর হিসেবে ইন্ডিয়ার প্রাক-জাতীয় অস্তিত্বকে অস্বীকার করার মাধ্যমে প্রবন্ধটি মনে হয় ‘ইন্ডিয়ার’ ধারণাকেই অস্বীকার করছে। কারণ প্রবন্ধটি ‘ইন্ডিয়ার নৈর্ব্যক্তিক বাস্তবতা’কে আধুনিক ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বাস্তবতার সঙ্গে একাকার করে ফেলেছে।

    এ-ধরনের অস্বীকৃতি সি.এ. বেইলির ‘এম্পায়ার অ্যান্ড ইনফরমেশন’ [৭] বইতেও উপস্থিত বলে মনে হয়, যেখানে ইন্ডিয়ার ধারণাকে ‘উদীয়মান জাতীয় চেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে ভূগোলকে একটি সমাজবিজ্ঞান হিসেবে ‘ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক তথ্য সংগ্রহের হৃদপিণ্ডের কাছাকাছি’ বলে বিবেচনা করা হয়েছে। বেইলি ইউরোপীয় এবং তাঁর ভাষায় ‘ভূগোলের হিন্দু ধারণায়নের’ মধ্যে পার্থক্যকে চিহ্নিত করেন। এই বৈপরীত্যের আলোকে ভারতবর্ষকে হিন্দু ‘পবিত্র’ স্থানিক-পরিসরের সমতূল্য হিসেবে চিত্রিত করেন। ম্যাথু এডনির মতে, ইন্ডিয়ার মানচিত্রায়ন ছিল প্রথমবারের মতো ‘একটি অবোধ্য দৃশ্যপটের [৮] দেশকে জ্ঞানের সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত করার একটি বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক অভিযান… ভূগোলবিদরা কোম্পানির সাম্রাজ্যের স্থানিক চিত্র এবং সাম্রাজ্যের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও মৌলিক অস্তিত্ব তৈরি এবং সংজ্ঞায়িত করেছিলেন।’ এডনি অবশ্য স্পষ্ট করে দেন, এই স্থান কোনো বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ পরিসর ছিল না; ব্রিটিশরা যেভাবে ‘ইন্ডিয়াকে পরিবেশন’ করেছিল, তাতে করে এই ভূখণ্ডকে তাদের ‘ইন্ডিয়াতে’ পরিণত করেছিল। এই ভূখণ্ড কেবল তাদের প্রত্যক্ষ এবং শাসিত অংশটিকেই অন্তর্ভুক্ত করা ‘ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’ ছিল। [৯]

    তাহলে, প্রাক-ঔপনিবেশিক সময়ের কী হবে? দৃশ্যত এই অবস্থানগুলোর মাঝামাঝি কোথাও অন্য অবস্থানও রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইরফান হাবিব জোরালোভাবে যুক্তি দিয়ে আসছেন যে, কেবল ভৌগোলিক একক হিসেবেই নয়, বরং এমন একটি দেশের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে ‘ভারতের’ ধারণাটি খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের দিকেই বিদ্যমান ছিল। সেক্ষেত্রে কিছু বিশেষ সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান উপস্থিত থেকে দেশটিকে অন্যদের থেকে আলাদা করত। হাবিবের যুক্তিতে, ভারতের এই ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাই ছিল আল-বিরুনির কাছে ভারতকে একটি ‘সাংস্কৃতিক ঐক্য’ হিসেবে বোঝার ভিত্তি; এবং দীর্ঘ মিথস্ক্রিয়া ও সমন্বয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জোরদার হয়ে ‘১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ বিজয় শুরু হওয়ার আগেই… জাতিসত্তার কিছু পূর্বশর্ত দৃশ্যত অর্জিত হয়েছিল… ভারত কেবল একটি ভৌগোলিক অভিব্যক্তি ছিল না। এই ভূখণ্ডকে একটি সাংস্কৃতিক সত্তা এবং রাজনৈতিক একক হিসেবেও দেখা হতো।’[১০]

    হাবিবের অবস্থান অনুসরণ করলে প্রশ্ন জাগে, এমন একটি অতি-পরিনত ধারণা-ক্ষেত্রকে কেন পূর্ণাঙ্গ জাতীয়তাবাদের জন্য ঔপনিবেশিক হস্তক্ষেপের অপেক্ষা করতে হলো? এই প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা করার জন্য বিরত না হয়েও যেকথা তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয় সেকথা হলো: ইন্ডিয়া বা ভারতবর্ষের ধারণা নিয়ে সব আলোচনায় না হলেও অধিকাংশ আলোচনাতেই কোনো-না-কোনোভাবে ‘জাতি’ এবং ‘জাতীয়তাবাদের’ প্রসঙ্গটি ঢুকে পড়ে। এই জট পাকানোটা হয়তো বোধগম্য, কিন্তু অনিবার্য নয়। এই প্রবন্ধের বিষয় হিসেবে ‘ভারতবর্ষকে’ বেঁছে নেওয়ার ক্ষেত্রে আমার উদ্দেশ্য হলো ভারতবর্ষকে একটি ঐতিহাসিকভাবে বিবর্তিত ধারণা হিসেবে বোঝা; বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে যারা ‘ভারতবর্ষের’ উল্লেখ করেছেন তারা কোন অর্থে ধারণাটিকে প্রকাশ করেছেন সেই প্রশ্ন ধরে তদন্ত করা; এবং এই তদন্তের ভিত্তিতে আদি ভারতের ইতিহাসতত্ত্বের জন্য ধারণাটির সম্ভাব্য তাৎপর্যময় প্রভাবের গভীরে পর্যালোচনা করা।

       

    ১. ‘জন’ থেকে ‘জনপদ’

    বিচিত্র সব উৎসে ভারতবর্ষের ধারণাটি খুঁজতে গিয়ে মনে রাখতে হবে যে আদি ভারতে এমন একটি লিখিতসূত্রভিত্তিক কালপর্ব ছিল যখন ভৌগোলিক অর্থেও ‘ভারতবর্ষ’ শব্দটি আদৌ উপস্থিত ছিল না। প্রকৃতপক্ষে, আদি টেক্সটগুলোতে উল্লেখ থাকত ‘জন’, অর্থাৎ মানুষ বা সম্প্রদায়ের। প্রাকৃতিক ভূসংস্থানিক বৈশিষ্ট্য, যেমন নদনদীর দ্বারা ‘জনদের’ অবস্থান সংজ্ঞায়িত হতো। এভাবে ঋগবেদে[১১] অন্যান্য জনদের পাশাপাশি ভরতদের উল্লেখ আছে। কিন্তু অন্যদের মতোই তারা কোনো সুনির্দিষ্ট ভূখণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে উপস্থিতি হাজির করেনা। বৈদিক সাহিত্যের ‘ব্রাহ্মণ’ শ্রেণির টেক্সটগুলোতেই প্রথমবারের মতো একটি কেন্দ্রীয় অঞ্চলের সাপেক্ষে বিভিন্ন স্থানিক দিক বা দিশার উল্লেখ পাওয়া যায়। একটি অধ্যুষিত দেশ বা সেই স্থান যেখানে ‘জন’ বাস করে এমন পরিসর হিসেবে ‘জনপদ’ শব্দটিও প্রথমবারের মতো তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ, ঐতরেয় ব্রাহ্মণ, শতপথ ব্রাহ্মণ ইত্যাদির মতো ব্রাহ্মণ টেক্সটগুলোতে আত্মপ্রকাশ করে। ‘দিশ’ বা দিকের তাৎপর্য, যা আমি পরে উল্লেখ করব, তা জনপদগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত; কারণ ‘দিশ’ সংজ্ঞায়িত করত জনপদগুলো কীভাবে অবস্থিত হবে। ঐতরেয় ব্রাহ্মণ এভাবেই বিভিন্ন অঞ্চল এবং যারা ওই অঞ্চলগুলোতে বাস করত ও শাসন করত তাদের নির্দিষ্ট করেছে; ইন্দ্রের ‘মহাভিষেক’-এর প্রেক্ষাপটে এই আবাহনটি এসেছে:

    ‘…এই পূর্ব দিকে (প্রাচ্যানাং দিশি), প্রাচ্যের মানুষদের (প্রাচ্যানাং রাজানঃ) যত রাজা আছেন, তাঁরা আধিপত্যের জন্য অভিষিক্ত হন; …অতএব, এই দক্ষিণ দিকে (দক্ষিণস্যাম দিশি), সাত্বতদের যত রাজা আছেন, তাঁরা সর্বপ্রধান শাসনের জন্য অভিষিক্ত হন; …পশ্চিম দিকে (প্রতীচ্যাম দিশি), দাক্ষিণাত্য ও প্রতীচ্যের মানুষদের যত রাজা আছেন, তাঁরা স্ব-শাসনের জন্য অভিষিক্ত হন… এই উত্তর দিকে (উদীচ্যাম দিশি), হিমবতের ওপারে উত্তর-কুরু ও উত্তর-মদ্রদের যে ভূমি (জনপদাঃ), তাদের রাজারা সার্বভৌমত্বের জন্য অভিষিক্ত হন… এই দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত মধ্য দিকের (ধ্রুবায়াং মধ্যমায়াং প্রতিষ্ঠায়াং দিশি), কুরু-পাঞ্চাল এবং বশ ও উশীনরদের যত রাজা আছেন, তাঁরা রাজত্বের জন্য অভিষিক্ত হন.. ’’[১২]

    স্পষ্টতই, দেবতা ইন্দ্রের মহাভিষেকের পরিপ্রেক্ষিতে পার্থিব রাজাদের দিকগুলোর গণনায় ব্রাহ্মণ রচয়িতা অন্য দিকগুলোর তুলনায় দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত মধ্য অঞ্চলের (মধ্যমা দিশ) জনপদগুলোর সঙ্গে অনেক বেশি পরিচিতির পরিচয় দিয়েছেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন জনপদ অঞ্চলের বিন্যাস নিয়ে যে ব্রাক্ষণ্যবাদী বয়ানগুলোতে এই মধ্য অঞ্চলটিকেই কেন্দ্র (core) হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এখানে থেকে অন্য দিক বা দিশাগুলো (দিশ) ছড়িয়ে পড়েছে বলে ধরে নেওয়া হতো।

    একটি দেশ, অথবা বরং বলা যেতে পারে, পার্থিব স্থানিক পরিসরে বিভিন্ন দিকে অবস্থিত জনপদগুলোকে ধারণ কারী একটি খণ্ডের ধারণা প্রথমবারের মতো উচ্চারিত হয় আদি বৌদ্ধ গ্রন্থগুলোতে উল্লিখিত ‘জম্বুদ্বীপের’ প্রসঙ্গে।[১৩] চারটি মহাদ্বীপের অন্যতম এই দ্বীপটি সুমেরু বা সিনরু পর্বতকে ঘিরে বিস্তৃত ছিল এবং একজন ‘চক্রবর্ত্তী’ বা সার্বভৌম শাসক দ্বারা শাসিত হতো। প্রকৃতপক্ষে, টেক্সটগুলো অনুযায়ী, কেবল জম্বুদ্বীপেই বুদ্ধ এবং চক্কবত্তীদের (চক্রবর্ত্তীদের) জন্ম হতো। মেত্তেয় বুদ্ধ (মৈত্রেয় বুদ্ধ) যখন পৃথিবীতে আবির্ভূত হন, তখন এই দ্বীপটি জনাকীর্ণ ছিল এবং এখানে চুরাশি হাজার নগর ছিল। ‘ডিকশনারি অফ পালি প্রপার নেমস’-এর লেখক মালালাসেকেরার মতে, যখন সিংহলদ্বীপ বা তাম্রপর্ণীদ্বীপ থেকে আলাদা করে দেখা হয়, তখন ‘জম্বুদ্বীপ ভারত মহাদেশকে নির্দেশ করে’। তবে, প্রতিটি চক্রবাল বা দিগন্তে একটি করে জম্বুদ্বীপ রয়েছে বলে অঙ্গুত্তরা-নিকায়ে উল্লেখ রয়েছে। ফলে জম্বুদ্বীপকে ভারতের মতো কোনো সুনির্দিষ্ট দেশের ভূগোলের সঙ্গে মেলানো কঠিন হয়ে পড়ে।

    এমন দ্ব্যর্থকতা সত্ত্বেও জম্বুদ্বীপের ধারণাটি টিকে ছিল এবং মহাবিশ্ব সম্পর্কিত ব্রাহ্মণ্যবাদী ধারণার অংশে পরিণত হয়েছিল। কখনো এই স্থানিক পরিসর ভারতবর্ষের সমার্থক, আবার কখনো ভারতবর্ষ এই স্থানিক পরিসরের একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। প্রকৃত ভৌগোলিক স্থানিক পরিসরের একটি স্থানিক বিবরণগত চিহ্ন হিসেবে হিসেবে যে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছিল, তা দেখা যায় খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে মৌর্য সম্রাট অশোকের সময়ের একটি সূত্রে । এই সূত্রে জম্বুদ্বীপকে এমন একটি স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে ‘মানুষের সঙ্গে একসময় মেলামেশা না করা দেবতারা, এখন মানষের সঙ্গে মেলামেশা করেন’।[১৪] অশোকের শাসিত জম্বুদ্বীপকে যদি বাস্তব ভৌগোলিক স্থানের সঙ্গে মেলানো হয়, তবে সেই স্থান আফগানিস্তান থেকে দাক্ষিণাত্য পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই পরিসরের মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরের এলাকা অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং উপমহাদেশের দক্ষিণাংশ বাদ পড়েছিল। জম্বুদ্বীপ এমন একটি বিশদ বিশ্বতত্ত্বীয় নকশার (cosmography) অংশ যেখানে পৃথিবী বিভিন্ন দ্বীপে বিভক্ত ছিল। আবার এই পরিসরে এক অর্থে একটি বাস্তব দেশের ধারণাও ছিল কারণ পরিচিত জনপদের নাম ও স্থানগুলো এর মধ্যে চিহ্নিত করা যেত।

    ভারতবর্ষও একটি বিশদ বিশ্বতাত্ত্বিক ছকের (schema) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। কিন্তু আমরা যখন এই ছকের একটি রূপরেখা তুলে ধরব তখন স্পষ্ট হবে যে, সেই রূপরেখাকেও একটি ভৌগোলিক স্থানিক কাঠামো হিসেবে ধরা যেতে পারে। এই কাঠামোর মধ্যে সময়ের পরিক্রমার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন গাঠনিক অঞ্চলকে (constituent regions) জায়গা করে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। শব্দটি প্রয়োগের প্রাথমিক পর্যায়ে মনে হয় ‘ভারতবর্ষ’ শব্দটি সেসব অর্থ বহন করত না যেগুলো পরবর্তীতে এই শব্দগত ধারণার সঙ্গে ক্রমশ যুক্ত হয়েছিল। তখন এই শব্দ অস্পষ্টভাবে হলেও ভারতীয় উপমহাদেশের ভৌগোলিক সীমানার সঙ্গে সাদৃশ্য বহন করতে পারত। তবে স্থানিক পরিসরগত অর্থগুলোর ক্রম প্রসারণের ঐতিহাসিক পর্যায়গুলো স্পষ্ট নয়। কলিঙ্গ বা উপকূলীয় ওড়িশার রাজা খারবেল খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে তাঁর শিলালিপিতে দাবি করেছিলেন [১৫] যে, তিনি তাঁর দশম রাজত্ববর্ষে ‘ভরদবস’ (ভারতবর্ষ) জয়ের জন্য বের হয়েছিলেন। তাঁর পরিচালিত অনেকগুলো অভিযানের মধ্যে একটি ছিল এই যুদ্ধযাত্রা। স্পষ্টতই, তিনি যখন শাসন করছিলেন তখন কলিঙ্গকে ভারতবর্ষের অংশ হিসেবে দেখা হতো না। প্রকৃতপক্ষে, পুরাণগুলো যখন সংকলিত হচ্ছিল, তখনই কেবল ভারতবর্ষ একটি বিশদ বিশ্বতাত্ত্বিক নকশার প্রধান উপাদান হিসেবে আবির্ভূত হয়। সেক্ষেত্রে শব্দটি স্থানিক পরিসর ও সংশ্লিষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলোর যে কাঠামোগত রূপরেখাকে বোঝাত সেটা বুঝতে হলে আমাদের এই ধরণের লিখিত/টেক্সচুয়াল প্রমাণের দিকেই ফিরতে হবে। যে বিশ্বতাত্ত্বিক রূপরেখার একটি অংশ ছিল ভারতবর্ষ, সেই রূপরেখা কমবেশি একই চেহারায় বেশ কয়েকটি পুরাণে পাওয়া যায়।[১৬] মহাভারতের [১৭] দিগ্বিজয় আখ্যানের মতনই কিছু ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও এই পৌরাণিক নকশাগুলোতেই আমরা প্রথমবারের মতো ভারতবর্ষ এবং সেটার বিভিন্ন স্থানিক খণ্ডের একটি পূর্ণাঙ্গ বিকশিত ধারণার সাক্ষাৎ পাই। পৌরাণিক টেক্সটগুলোর সংখ্যা বিপুল আর স্বতন্ত্রভাবে প্রতিটি পুরাণ ধরে ধরে সেগুলোর উপাদানের নতুন করে তুলনা করার চেষ্টা করাও হবে অর্থহীন। তাই আমি নিজেকে ইতোমধ্যে বহুল-ব্যবহৃত বিষ্ণু-পুরাণের[১৮] টেক্সট উল্লেখ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখব। প্রকৃত ভৌগোলিক স্থানের সাপেক্ষে ভারতবর্ষ ধারণাটির ধারাবাহিকতা এবং বিস্তৃতকরণ উভয়কেই তুলনামূলকভাবে যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে আমি অন্য দুটি লিখিত উৎসের দিকেও নজর দেব: কালিদাসের রঘুবংশম্, বিশেষ করে রঘুর দিগ্বিজয় অংশটি;[১৯] এবং দশম শতকের টেক্সট রাজশেখরের কাব্যমীমাংসা।[২০] লিখিত উৎসগুলো যথেষ্ট বিস্তৃত কালিক ব্যপ্তির প্রতিনিধিত্ব করে। এই পর্যালোচনা কীভাবে পৌরাণিক স্থানিক রূপরেখা এবং সেগুলোর বিবরণগুলো কমবেশি প্রথাবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল সেই বিবরণীই দেয় না। বরং কীভাবে একই বিবরণের অর্থ হয়তো কিছুটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে সেই প্রসঙ্গেও আলোকপাত করে।

    ২. পুরাণে ভারতবর্ষ

    বিষ্ণু-পুরাণের উপাদানগুলো নিয়ে আলাপের আগে পৌরাণিক প্রমাণের প্রকৃতি সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন। পৌরাণিক বিবরণগুলোকে ‘ভৌগোলিক বিবরণ’[২১] হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, এগুলো ভারতের ভূগোলের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। পুরাণের সংশ্লিষ্ট অংশের একটি সেকশনকে ‘ভারতবর্ষ-বর্ণনম্’ বলা হয় ঠিকই। কিন্তু সেই বর্ণনা মহাবিশ্বের অংশ হিসেবে জগতের একটি বিস্তৃত নকশার ভেতরেই থাকে। এই বর্ণনার মধ্যে মিশে থাকে সৃষ্টির গল্প, বংশলতিকা এবং স্থানিক পরিসরের অনিবার্য পারস্পরিক যুক্ততা উপস্থাপন করার জন্য বিশদ বংশবৃত্তান্ত, জগতের বৃহত্তর স্থানিক বিভাজনগুলোর গণনা এবং সেই স্থানিক বিভাজনে ভারতবর্ষের অবস্থান আর ভারতবর্ষের ভেতরের সমস্ত বিভাগের গণনা ইত্যাদি। সুতরাং ভারতবর্ষকে একটি ভৌগোলিক বর্গ হিসেবে বিবেচনা করার আগে সেই বর্গের নির্দিষ্ট অবস্থানের সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতের মধ্যে রেখে বোঝপড়া করা  প্রয়োজন। সেটা না করে কেবল আগে থেকে ঠিক করা ভৌগোলিক নাম নির্বাচনের জন্য উপাদানটি অন্বেষণ করলে শব্দটির বিভিন্ন সম্ভাব্য অর্থ গুলিয়ে যাবে। বিভিন্ন পুরাণের বিবরণে ভিন্নতা আছে এবং স্বতন্ত্র পুরাণের ভেতরেও অভ্যন্তরীণ স্ববিরোধিতা রয়েছে। সব পৌরাণিক স্থানিক রূপরেখা পরস্পরের সঙ্গে খাপ খায় না। তাসত্ত্বেও মহাকাব্য মহাভারত[২২] ছাড়া পুরাণগুলোই প্রথমবারের মতো আমাদের সামনে ভারতবর্ষের গাঠনিক রূপ সম্পর্কে একটি উপলব্ধি তুলে ধরে। তাই যারা ভারতবর্ষের ধারণা এবং ভারতীয় ইতিহাসের জন্য এই ধারণার তাৎপর্য খুঁজছেন, তাদের জন্য পৌরাণিক উৎসগুলো অনুসরণ করা নিশ্চিতভাবেই সার্থক।

    বিষ্ণু-পুরাণে ভারতবর্ষের উল্লেখ পাওয়া যায় দ্বিতীয় অংশের প্রথম অধ্যায়ে, যার শিরোনাম ‘জগৎ-সৃষ্টি-সম্বদ্ধ-ভারত-বংশ-কথনম’ (মহাবিশ্বের সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত ভরত বংশের বর্ণনা)। এখানে ‘ভরত-বংশ’ এবং ‘স্বয়ম্ভূ-বংশ’ ভিন্ন ভিন্ন নাম হলেও আসলে নামান্তরযোগ্য কারণ বংশলতিকাটি স্বয়ম্ভূ মনু থেকে শুরু হয়েছে। এই বংশলতিকায় মনুর সাত পুত্রকে সাতটি দ্বীপের (জম্বু, প্লক্ষ, শাল্মলী, ক্রৌঞ্চ, কুশ, শাক, পুষ্কর) দায়িত্বে রাখা হয়েছিল। এই সাতটি দ্বীপ মিলে একত্রে পৃথিবী (বসুন্ধরা) গঠিত হয়েছিল। বিষ্ণু-পুরাণের ‘ভারত-বংশ-কথনম’-এর পরে আসে ‘জম্বুদ্বীপ-বর্ণনম’ (জম্বুদ্বীপের বর্ণনা), তারপর ‘ভারত-বর্ষ-বর্ণনম’ (ভারতবর্ষের বর্ণনা), এবং তার পরে আসে ‘ষড়-দ্বীপ-বর্ণনম’ (ছয়টি দ্বীপের বর্ণনা)।

    প্রিয়ব্রতের পুত্র আগ্নীধ্র শাসিত জম্বুদ্বীপ আবার নয়টি ভাগে বিভক্ত ছিল। এগুলোর মধ্যে একটি হলো ‘হিমবর্ষ’ আর পরে এই ভাগ ‘ভারত-বর্ষ’ হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে আর এর শাসনভার ন্যস্ত হয় নাভির ওপর। ঋষভের পুত্র ভরত এই বংশেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এবং ‘দেশটিকে ভারত নামে অভিহিত করা হয় সেই সময় থেকে যখন তাঁর পিতা এই অংশটি ভরতের হাতে অর্পণ করেন…’। ভরতের পরেও বংশলতিকা চলতে থাকে এবং ভারতবর্ষ নয়টি ভাগে (ভেদাঃ) বিভক্ত হয়। ‘যখন তিনি প্রথম মন্বন্তরে সভাপতিত্ব করেছিলেন তখন যে স্থানের মাধ্যমে পৃথিবী জনাকীর্ণ হয়েছিল সেই স্থানটি ছিল স্বয়ম্ভূব মনুর সৃষ্টি।” [২৩]

    বিষ্ণু-পুরাণের দ্বিতীয় অংশের দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধ্যায়ে বিশ্বতাত্ত্বিক রূপরেখার বিবরণী চলতে থাকে। তৃতীয় অধ্যায়টি শুরু হয় নিচের শ্লোকটি দিয়ে:

    উত্তরম্ যৎ সমুদ্রস্য হিমাদ্রেশ্চৈব দক্ষিণম্

    বর্ষম্ তদ্ ভারতম্ নাম ভারতী যত্র সন্ততিঃ

    শ্লোকটির একটি আক্ষরিক অনুবাদ হবে:

    যে [বর্ষ] সমুদ্রের উত্তরে এবং তুষারাবৃত পর্বতের (হিমালয়) দক্ষিণে অবস্থিত, তাকে বলা হয় ভারত, যেখানে সন্ততিরা ভারতী নামে পরিচিত।

    উপরে উদ্ধৃত শ্লোকটিতে নির্দেশিত ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক স্থানের সম্ভাব্য অর্থ বিবেচনা করার সময় একথা মনে রাখা প্রয়োজন যে, এই বর্ণনা এমন একটি পরিপ্রেক্ষিতে রেখে বুঝতে হবে যেখানে এই বর্ণনা কঠোরভাবে এবং সঠিকভাবে ভৌগোলিক নয়, বরং বিশ্বতত্ত্বীয় রূপরেখার। বিভিন্ন পর্বতমালার সঙ্গে যুক্ত পর্বত ও নদীর মতো প্রাকৃতিক স্থানিক বৈশিষ্ট্যবলি ভারতবর্ষকে অন্যান্য বর্ষ ও দ্বীপ থেকে আলাদা করায় এখানে এক ধরনের ভৌগোলিক অর্থ সঞ্চারিত হলেও। পর্বতমালাগুলোর প্রতিটি একেকটি ‘কুল-পর্বত’ (family mountain)। সেগুলো হলো—মহেন্দ্র, মলয়, সহ্য, শুক্তিমৎ, ঋক্ষ, বিন্ধ্য এবং পারিপাত্র; এবং এগুলো থেকে উৎপন্ন নদীগুলো বিভিন্ন দিকে প্রবাহিত হয়।

    আবারও সেই ‘দিক’ নির্দেশনা মধ্যভাগ বা মধ্যদেশের সঙ্গে মিলিত হয়ে ভারতবর্ষের কাঠামো গঠন করে। সুতরাং, যদিও ভারতবর্ষকে নয়টি বিভাগে বিভক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং সেগুলোর সবকটি তাদের স্বতন্ত্র নামে নির্দিষ্ট, তবুও ‘দিক’ বা দিশাই নির্দেশ করে যে কীভাবে বিভিন্ন জনপদের বিভিন্ন সম্প্রদায় ভারতবর্ষের মধ্যে বিন্যস্ত ছিল। বিষ্ণু-পুরাণ থেকে একটি শ্লোক উদ্ধৃত করা যাক:

    ভারতের পূর্বে (পূর্বে) বাস করে কিরাতরা… পশ্চিমে (পশ্চিমে) যবনেরা; কেন্দ্রে (মধ্যে ভাগশঃ) বাস করে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্ররা, যারা যথাক্রমে যজ্ঞ, অস্ত্র, বাণিজ্য এবং সেবার দায়িত্বে নিয়োজিত।

    এখানে ‘দিক’ বা দিশা কেবল ভৌগোলিক অর্থে মধ্য অঞ্চলের কেন্দ্রিকতা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়নি। বরং বিষ্ণু-পুরাণ (এবং অন্যান্য পুরাণও) যে সামাজিক ব্যবস্থাকে একটি আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করত, সেটার সঙ্গে পূর্ব ও পশ্চিমের প্রান্তীয় এলাকায় প্রচলিত ব্যবস্থার বৈপরীত্য বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়েছে। জনপদ সম্প্রদায়গুলোকে ভৌগোলিকভাবে স্থাপন করার প্রেক্ষাপটে মধ্য অঞ্চলের একই ধরনের কেন্দ্রিকতা বজায় রাখা হয়েছে। এভাবেই, কুরু এবং পাঞ্চালদের মধ্য অঞ্চলে (মধ্যদেশ) বরাদ্দ করা হয়েছে; কামরূপদের পূর্বে (পূর্ব-দেশাদিক); সৌরাষ্ট্র এবং আভীরদের অপরান্তে (পশ্চিমে)  আর এভাবেই বাকিদেরও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

    বিষ্ণু-পুরাণের দ্বিতীয় অংশের পরপর চারটি অধ্যায়ে (অথবা অন্যান্য প্রধান পুরাণে কখনো কখনো আরও বিশদভাবে) যেভাবে ভারতবর্ষকে একটি বিশ্বতাত্ত্বিক ছকের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেই ভঙ্গি থেকে এই উপস্থাপনার প্রকৃতি সম্পর্কে বেশ কিছু প্রসঙ্গ চিহ্নিত করা যেতে পারে।

    প্রথমত, যেহেতু ভারতবর্ষ খুব স্পষ্টভাবে একটি অনেক বড় নকশার অংশ, সেহেতু পদ্ধতিগতভাবে এই ভূখণ্ডগত উপাদানকে একটি বাস্তব ভূখণ্ডগত একক হিসেবে চিহ্নিত করা এবং একটি ভৌগোলিক বাস্তবতা হিসেবে ধরে নেওয়া অনুপযুক্ত হতে পারে। একই সঙ্গে, ভারতবর্ষের কাঠামো নির্মাণে পুরাণ সংকলকরা সমসাময়িক ভৌগোলিক জ্ঞানের ভাণ্ডার এবং সেই কাঠামোর সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলোর বোঝাপড়াকে কাজে লাগিয়েছিলেন। সুতরাং ভারতবর্ষের নকশা করার সময় একটি স্থানিক পরিসরকে প্রথমে চারটি প্রধান দিকে ভাগ করে মধ্যখানে একটি কেন্দ্রীয় অঞ্চল রাখা আর তারপরে আরও সাত বা নয়টি ভূখণ্ডগত উপ-বিভাগ তৈরি করার মৌলিক মানচিত্রীয় রীতি অনুসরণ করা সম্ভব হয়েছিল। এই রীতি অনুসরণ করে এই আদর্শায়িত স্থানিক পরিসরের অধিবাসীদের পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণে ছড়িয়ে থাকা নিজ নিজ অঞ্চলে স্থাপন করা সম্ভব হয়েছিল। আদি লিখিত সূত্রগুলোর এই ভৌগোলিক জ্ঞান সবক্ষেত্রে অন্যান্য উৎস এবং বিভিন্ন জাতিগত সম্প্রদায়ের অবস্থান সম্পর্কে সমসাময়িক তথ্যের সঙ্গে মেলে না। যেমন বিষ্ণু-পুরাণেই পুণ্ড্র, কলিঙ্গ এবং মগধের সকলকে দাক্ষিণাত্য বা দক্ষিণের মানুষদের সঙ্গে একাকার করে ফেলা হয়েছে। পশ্চিম অঞ্চলের (অপরান্তাঃ) জন্য যে তালিকা দেওয়া হয়েছে তাতে উত্তরাঞ্চলের কোনো উল্লেখ ছাড়াই শাকলবাসিন, সাল্ব, মদ্র, হূণ, সৈন্ধব এবং আরও অনেক সম্প্রদায়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেভাবে বিবেচনা করলে এদের উত্তর অঞ্চলেই স্থাপন করা শ্রেয় হতো।[২৪] আদি লিখিত উৎসগুলোতে বিবৃত  ভারতবর্ষের বর্ণনাকে ভারতীয় ইতিহাসের ভূগোলের অনুরূপ বলে ধরে নেওয়ার আগে একথা মনে রাখা দরকার যে, এই টেক্সটগুলোর সংকলকদের কাছে হয়তো খুঁটিনাটি নির্ভুলতা নয়, বরং ভারতবর্ষের সামগ্রিক কাঠামো কল্পনা করা এবং সেই কাঠামোকে একটি বিশ্বতত্ত্বীয় রূপরেখায় খাপ খাওয়ানোই অধিকতর প্রাসঙ্গিক ছিল।

    দ্বিতীয়ত, পুরাণে ভারতবর্ষের বর্ণনাটি বংশলতিকার বিবরণের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। এই বংশবিবরণী মহাবিশ্বের নকশার বিভিন্ন স্তরকে আবৃত করে রাখে আর এই বংশানুক্রমের শুরু হয় মনুর পুত্রদের দিয়ে এবং পৈতৃক সম্পত্তি সাত পুত্রের মধ্যে আদি ভাগাভাগির মাধ্যমে। বিষ্ণু-পুরাণে ভারতবর্ষের বর্ণনায় ‘ভারতী সন্ততিঃ’ অভিব্যক্তিটিকে তাই ‘ভরতের সন্তানের’ মতন অতিরঞ্জিত অর্থে গ্রহণ করা উচিত না। বরং সহজভাবে ‘ভরতের বংশে জন্ম নেওয়া সন্তান’ হিসেবে বিবেচনা করা উচিৎ। বায়ু-পুরাণে একটি একই ধরনের অভিব্যক্তিতে এমন অর্থ স্পষ্ট করা হয়েছে:[২৫]

    তৈর=ইদম্ ভারতম্ বর্ষম্ নব-ভাগৈর-অলংকৃতম্

    তেষাং বংশ-প্রসূতৈশ=চ ভুক্তেয়ং ভারতী পুরা

    এই ভারতবর্ষ, যেটা তার নয়টি অংশ দ্বারা অলংকৃত, অতীতে তাদের বংশে জাত এবং ভারতী নামে পরিচিতদের দ্বারা ভোগ করা হতো।

    তৃতীয়ত, এই পৌরাণিক ভারতবর্ষের অর্থ যে ভৌগোলিক অর্থের বাইরেও বিস্তৃত ছিল, সে বিষয়টি জম্বুদ্বীপের অন্যান্য বর্ষ থেকে পরিসরকে আলাদা করার ধরনের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। যেমন, অন্যান্য বর্ষে কোনো বিপর্যয় ছিল না, বার্ধক্য বা মৃত্যুর ভয় ছিল না, ধর্ম বা অধর্মের কোনো বোধ ছিল না, অথবা উঁচু-নিচুর ভেদাভেদ বা যুগের বিভাজন ছিল না; কেবল ভারতবর্ষই বিভিন্ন যুগের অনুক্রমের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করত। এই অঞ্চলেই কেবল ‘কর্ম’ সচল ছিল এবং এই কর্ম চারটি বর্ণের অস্তিত্ব দ্বারা চিহ্নিত হতো। অন্যান্য বর্ষগুলো ছিল ‘ভোগ-ভূমি’। কিন্তু ‘কর্ম-ভূমি’ হওয়ার কারণে ভারতবর্ষকে অন্য সব বর্ষের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম হিসেবে প্রক্ষেপ করা হয়েছে।

    যেহেতু পুরাণের বর্ষ-প্রক্ষেপণ শাসকদের বংশলতিকার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত ছিল সেহেতু স্থানিক-পরিসরের আরেকটি প্রসঙ্গ বিবেচনা করা যেতে পারে। একজন সার্বভৌম শাসকের বা সার্বভৌম হতে ইচ্ছুক শাসকের কর্তৃত্ব বিস্তারের প্রসঙ্গে ‘দিগ্বিজয়’ বা ‘চক্রবাল জয়ের’ ধারণার ভিত্তিতে এমন পর্যালোচনা করা যেতে পারে। আমরা এখন অন্বেষণ করব কীভাবে এই পর্যালোচনা ভারতবর্ষের অর্থ সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়ায় আরও গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিতে পারে। বিশেষ করে কালিদাসের বংশলতিকামূলক কাব্য রঘুবংশমে চিত্রিত ইক্ষ্বাকু শাসক রঘুর ‘দিগ্‌জিগীষা’ বা ‘দিকজয়ের অভিপ্রায়ের’[২৬] উল্লেখ করে এই পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

    ৩. দিগ্‌বিজয় (দিগ্‌জিগীষা) বা চর্তুদিক জয়

    কালিদাস যেভাবে রঘুর বিজয় অভিযানের বর্ণনা দিয়েছেন, সেখানে রঘুর যাত্রা শুরু হয় প্রথমে উল্লেখ করার রীতি অনুসারে পূর্ব (প্রাচী) দিক দিয়ে এবং তারপরে তাকে নিয়ে আসা হয় তাল গাছের কুঞ্জবন দিয়ে ঘেরা অন্ধকার সমুদ্রের তীরে। এই অঞ্চলে তিনি সুহ্মদের,[২৭] এবং নৌবহরসহ বঙ্গ রাজপুত্রদের মুখোমুখি হন;[২৮] এবং তারপর কপিশা নদী পার হয়ে[২৯] তিনি উৎকলের দিকে অগ্রসর হন।[৩০] আরও এগিয়ে, মহেন্দ্র পর্বতের চূড়া ছাড়িয়ে,[৩১] তিনি কলিঙ্গদের বশীভূত করেন।[৩২] এরপর সমুদ্রতট ধরে সেনাবাহিনী ঋষি অগস্ত্যের নেওয়া পথের দিকে (অর্থাৎ দক্ষিণে) যাত্রা করে। পরে তাদের কাবেরী নদী এবং মলয় পর্বতের উপত্যকায় নিয়ে যায়।[৩৩] এই অঞ্চলের অন্য যে ভূসংস্থানিক চিহ্নগুলোর উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো হলো তাম্রপর্ণী নদী ও সমুদ্রের সঙ্গমস্থল,[৩৪] এবং ‘সেই অঞ্চলের স্তনযুগলের মতো’ (দিশস্তস্যাঃ) মলয় ও দরদুর পর্বত। সেখান থেকে আরও এগিয়ে রঘু সহ্য পর্বত অতিক্রম করেন। অপরান্ত[৩৫] এবং কেরালাকে বশীভূত করার পর রঘু ত্রিকূটের[৩৬] দিকে ধাবিত হন, যেখান থেকে স্থলপথে (স্থল-বর্ত্মনা) পারসিকদের দিকে যাত্রা করা হয়। একই প্রসঙ্গে যবনদেরও উল্লেখ করা হয়েছে।[৩৭] অশ্বারোহী হিসেবে পারদর্শী পশ্চিমা মানুষদের (পাশ্চাতৈঃ অশ্ব-সাধনৈঃ) সঙ্গে রঘুর প্রচণ্ড লড়াইয়ের ফলাফল ছিল নিম্নরূপ:[৩৮]

    মৌচাক যেমন মৌমাছি দিয়ে ঢাকা থাকে, তেমনি তিনি তাঁর (ভল্ল) তীরের আঘাতে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা দাড়িওয়ালা মাথা দিয়ে পৃথিবীকে আবৃত করে ফেলেছিলেন। অবশিষ্টরা তাদের শিরস্ত্রাণ খুলে তাঁর কাছে আশ্রয় ভিক্ষা করে।

    যে দিকের অধিষ্ঠাতা কুবের রঘুর সেই উত্তর (উদীচ্য) দিকের যাত্রা তাকে হূণ[৩৯] এবং কম্বোজদের[৪০] বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়। উত্তরে আরও গমন তাকে সুউচ্চ হিমালয় পর্বতমালা এবং গঙ্গা নদীর উজান অংশে নিয়ে যায়, যেখানে তিনি কিরাত এবং অন্যান্য পার্বত্য উপজাতির (পার্বতীয় গণ) মুখোমুখি হন। কৈলাস পর্বতের ওপারে এবং লৌহিত্য নদী পার হয়ে রঘু প্রাগজ্যোতিষ এবং কামরূপ রাজ্যে পৌঁছান; এবং তাদের বশীভূত করার মাধ্যমেই রঘুর দিগ্বিজয় সম্পন্ন হয়। চার দিকের এই বিজয় ছিল ‘বিশ্বজিৎ’ (বিশ্বজয়) যজ্ঞ করার পূর্বপ্রস্তুতি। দিক বা ‘দিশ’ জয় এবং যজ্ঞ সম্পাদনের মাধ্যমে রঘুর সার্বভৌম শাসকের মর্যাদা অর্জন সম্পন্ন হয়। এই মর্যাদা সকল ‘জিগীষু’ শাসকের চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষা।

    রঘুবংশমের উপাদানগুলো সংক্ষেপিত করার আমার এই চেষ্টার প্রধান প্রাসঙ্গিকতা হলো চারটি ‘দিশ’ বা দিক দ্বারা সংজ্ঞায়িত স্থানের ভূগোল এবং সেই স্থানিক পরিসরের সম্মিলন যেটির উপর একজন আদি ভারতীয় সম্রাট একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের বাসনা করতেন। এই ধারণাটি ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্র’ নামের আরেকটি অভিব্যক্তিতেও প্রকাশ করা হয়েছে। তবে, বিশুদ্ধ ‘ভৌগোলিক’ দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের যা আকর্ষণ করে তা হলো বিভিন্ন সম্প্রদায়, প্রাকৃতিক বিভিন্ন চিহ্ন এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের উল্লেখ। এগুলো প্রতিটি ‘দিশ’-এর সঙ্গে সুনির্দিষ্টভাবে যুক্ত। সুবিধার জন্য, এই চিহ্নগুলো ও উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের বিবরণ একটি সারণি আকারে উপস্থাপন করা যেতে পারে।[৪১]

    রঘুবংশমের এই বিবরনীগুলো ভারতবর্ষের ভূখণ্ডের কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যাবলিকে উপস্থাপন করার দাবি করে না। তবে এখানেও একই মূখ্য-ধারণা হিসেবে ‘দিশ’ বা দিক ব্যবহার করা হয়েছে। কালিদাসের উদ্দেশ্য কঠোরভাবে ভৌগোলিক নির্ভুল বর্ণনা প্রদান করা ছিল না। বরং একজন সার্বভৌম-পদপ্রার্থী শাসককে যে স্থানিক পরিসরটি অতিক্রম করতে হতো তার রূপরেখা উপস্থাপন করা ছিল তার লক্ষ্য। কিছু কিছু স্থানের অবস্থানগত স্বেচ্ছাচারিতা সহজেই শনাক্ত করা যায়। যেমন, কলিঙ্গের পরেই কেবল দক্ষিণ অঞ্চলের ইঙ্গিত দেওয়া; মলয়ের সঙ্গে নয় বরং সহ্য বা পশ্চিমঘাটের পরেই কেবল কেরালার উল্লেখ; প্রাগজ্যোতিষ থেকে কামরূপকে আলাদা করা এবং রঘুর ‘উদীচ্য’ বা উত্তরের বিস্তৃত অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের অবস্থান নির্দেশ করা। পুনরায় বলা যেতে পারে যে, কালিদাস ভৌগোলিক নির্ভুলতার চেয়ে রঘুর ভ্রমণসূচিকে চার দিকের মূল ধারণার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ব্যাপারে বেশি আগ্রহী ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, পূর্ব দিক দিয়ে শুরু করে ‘দিশ’-এর ধারণা ব্যবহার করে এবং একই সঙ্গে প্রাগজ্যোতিষ ও কামরূপে (যাদের সঠিকভাবেই প্রাচ্য বা পূর্বে স্থাপন করা উচিত) এই ভ্রমণসূচি শেষ করে কালিদাস কৌতূহলদ্দীপকভাবে চার দিকের ধারণাকে একজন সার্বভৌম শাসকের কর্তৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় স্থানিক পরিসর ঘিরে একটি বৃত্তাকার যাত্রার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। একথাও বলা যেতে পারে যে, চারটি প্রধান দিকের বিদ্যমান ভৌগোলিক জ্ঞান, এই দিকগুলোর সাপেক্ষে প্রধান ভৌত ভূসংস্থানিক বৈশিষ্ট্যাবলি (সমুদ্র, পর্বত, নদী) এবং সেগুলোর সাপেক্ষে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অবস্থানকে রঘুবংশম পর্যাপ্তভাবে ব্যবহার করেছে। রঘুবংশমের বর্ণনার অতিরিক্ত তাৎপর্য রয়েছে। এই বিবরণী বিভিন্ন স্থানিক অবস্থানের স্বতন্ত্র ধরণের উদ্ভিদ, প্রাণী ও অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলোর সঙ্গে এক ধরণের পরিচিতি প্রদর্শন করে। কালিদাসের উপাদানের [কিছু তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য] আবারও বিশেষভাবে তুলে ধরা হবে যখন আমরা ভারতবর্ষের ধারণা সংক্রান্ত আমাদের অনুসন্ধানগুলোর সারসংক্ষেপ করব।

    এখন আমরা পরবর্তী সময়ের একটি লিখিত সূত্রের দিকে নজর দিতে পারি। এই গ্রন্থ নবম-দশম শতাব্দীর দিকে রচিত হয়েছিল। এই গ্রন্থটির উপজীব্য ও উদ্বেগের প্রসঙ্গটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের হলেও, এখানেও ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্রের’ (অর্থাৎ ‘যিনি বাধাহীনভাবে চলাচল করেন তাঁর ক্ষেত্র’) সঙ্গে সম্পর্কের নিরিখে ভারতবর্ষের সেই আদি ধারণাটিকেই অন্তর্ভুক্ত করে এবং একভাবে পুনর্ব্যক্তও করে।

    ৪. একটি সমন্বয়ী প্রচেষ্টার অনুশীলন? রাজশেখরের কাব্যমীমাংসা

    পুরাণগুলিতে বর্ণিত ভারতবর্ষের ধারণাটি ছিল বিভিন্ন সম্প্রদায় এবং ‘জনপদ’ নিয়ে গঠিত। আবার কালিদাসের দিগ্বিজয় সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত অথচ চিত্তাকর্ষক বর্ণনায় ‘ভারতবর্ষ’ শব্দটি ব্যবহার না করেই সেই একই ভূখণ্ডের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এই ধারণাটি ধীরে ধীরে কমবেশি একটি প্রথাবদ্ধ রূপ ধারণ করছিল, যদিও স্বতন্ত্র গ্রন্থগুলিতে এর কিছু পরিবর্তন ও পরিবর্ধন লক্ষ্য করা যায়। রাজশেখরের ‘কাব্যমীমাংসা’ (কাব্যের আলোচনা) গ্রন্থে ‘দেশ-বিভাগের’ প্রসঙ্গটি এসেছে ‘জগৎ’ এবং ‘ভুবন’ শব্দ দুটির অর্থ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পরেই। এর কারণ হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন: (১) সমগ্র জগৎ বা ভুবন, কিংবা তার একটি অংশবিশেষও ‘দেশ’ বোঝাতে পারে; এবং (২) দেশ ও কাল নিয়ে কারবার করার সময় একজন কবির ‘অর্থদরিদ্রতা’ (বোঝাপড়ার দৈন্য) থাকা উচিত নয়।

    ‘দেশ’ নিয়ে এই আলোচনার প্রেক্ষাপটেই রাজশেখর ভারতবর্ষের অবস্থান নির্ণয় করেছেন। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, বহু ভুবনের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা থাকলেও, ‘ভূলোক’ বলতে পৃথিবীকেই (পৃথ্বী) বোঝায়, যা সাতটি দ্বীপে বিভক্ত। রাজশেখর যদিও বহু মতামতের উল্লেখ করার রীতি মেনে চলেছেন, তবু তিনি মূলত ভারতবর্ষের পৌরাণিক কাঠামোটিই অনুসরণ করেছেন। বিশেষত বায়ু-পুরাণের বিশদ বর্ণনাকে। তিনিও ভারতবর্ষকে নয়টি ভাগে বিভক্ত করেছেন। কিন্তু বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত ‘জনপদ’ বা এলাকাগুলিকে বিন্যস্ত করার ক্ষেত্রে তিনি দিক-নির্দেশনাকারী প্রথার ওপরই নির্ভর করেছেন। রাজশেখরের রূপরেখায় একটি বিষয় উল্লেখযোগ্যভাবে অভিনব। এক্ষেত্রে তিনি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বিন্দু নির্দেশ করেছেন যে-বিন্দু থেকে বিভিন্ন দিকের শুরু হয়। তাঁর মতে, কেন্দ্রীয় বা মূল অঞ্চলটি হলো সুসংজ্ঞায়িত ‘আর্যাবর্ত’, যে-জায়গাটি আবার ‘মধ্যদেশের’ সমতুল্য। ভৌগোলিকভাবে তিনি এই স্থানিক পরিসরের সীমানা নির্ধারণ করেছেন পূর্ব ও পশ্চিম সমুদ্রের মধ্যবর্তী এবং হিমালয় ও বিন্ধ্য পর্বতের মধ্যবর্তী স্থান হিসেবে।

    প্রতিটি দিকের (দিশ) সূচনা ঠিক কোথায় সেটা আর্যাবর্তের সাপেক্ষে নির্দিষ্ট করতে গিয়ে রাজশেখর যে চেষ্টা চালিয়েছেন, তাতে স্পষ্টতই কিছু স্থানিক পরিসরের একের অপরের উপরে উঠে পড়াটা অনিবার্য হয়ে ওঠে।   বিশেষত যখন রাজশেখর মত দেন যে, কারো কারো কাছে দিক-বিভাগ পরিবর্তনশীল মনে হলেও, ‘অন্তর্বেদী’ থেকে এবং কান্যকুব্জকে (কনৌজ) অনেকটা মধ্যরেখা (meridian) হিসেবে ধরে এই ভৌগোলিক বিভাজন করা সম্ভব।[৪২] যেহেতু আর্যাবর্ত এবং অন্তর্বেদী (যমুনা ও গঙ্গার মধ্যবর্তী অঞ্চল) উভয়কেই দিক নির্ণয়ের কেন্দ্র হিসেবে ধরা হচ্ছে, তাই স্বাভাবিকভাবেই দেখা যায় যে সকল দিক-নির্দেশনা কেন্দ্রের সঙ্গে লক্ষণীয়ভাবে মিশে যাচ্ছে বা ওভারল্যাপ করছে।

    উদাহরণস্বরূপ, যদিও আর্যাবর্তকে পূর্ব ও পশ্চিম সমুদ্র এবং হিমালয় ও বিন্ধ্য পর্বতের মধ্যবর্তী অঞ্চল হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, রাজশেখরের মতে ‘পূর্বদেশ’ শুরু হচ্ছে বারাণসীর পূর্ব দিক থেকে; ‘পশ্চাদ্দেশ’ (পশ্চিম অঞ্চল) শুরু হচ্ছে দেবসভা থেকে; ‘দক্ষিণাপথ’ (দক্ষিণ অঞ্চল) মাহিষ্মতী থেকে এবং উত্তর অঞ্চল শুরু হচ্ছে ‘পৃথুদক’ থেকে।[৪৩] এই অসংগতি সত্ত্বেও, একটি বাস্তব ভৌগোলিক বিন্দুর (যেমন বারাণসী, মাহিষ্মতী, পৃথুদক ইত্যাদি) সাপেক্ষে একটি দিকের (দিশ বা দিক) কাঠামোর বিশদ বিবরণ দেওয়ার এই প্রচেষ্টা প্রমাণ করে যে, প্রতিটি দিকের সূচনা নির্দিষ্ট করতে এবং সেই দিকের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সেগুলোর সম্পর্ক স্থাপনে এই বিন্দুগুলিকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হতো।

    স্বতন্ত্র দিকগুলোর কাঠামো নিয়ে রাজশেখরের বিস্তারিত আলোচনায় তিনটি প্রধান পৌরাণিক উপাদানের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়: জনপদগুলোর তালিকাভুক্তিকরণ, ওই দিকগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পর্বতমালা এবং সেখান থেকে প্রবাহিত নদীসমূহের উল্লেখ। প্রত্যাশিত কিছু ভিন্নতা থাকলেও, সমস্ত দিকের বর্ণনায় এই ছকটি উপস্থিত। তবে রাজশেখর এগুলোর সঙ্গে বাড়তি যা যোগ করেছেন, তা হলো কালিদাসের ঢঙে ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত প্রাকৃতিক পণ্যের তালিকা। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক : উত্তরাপথ (উত্তর অঞ্চল)-এর বর্ণনায় সেখানে বসবাসকারী সম্প্রদায়ের পাশাপাশি সেখানে উৎপাদিত পণ্যগুলোর (উৎপাদিতঃ) কথাও বলা হয়েছে: যেমন সরল ও দেবদারু গাছ, দ্রাক্ষা (আঙ্গুর), কুঙ্কুম (জাফরান), চামর, মৃগ-চর্ম (হরিণের চামড়া), সৈন্ধব-লবণ (খনিজ লবণ), সৌবীর (?), স্রোতোঞ্জন (?), বৈদুর্য (মনিবিশেষ) এবং তুরঙ্গ (ঘোড়া)। এই তালিকাটি যে সর্বাঙ্গীন বা এমনকি নির্ভুল হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। তবে অন্য অঞ্চলের থেকে ওই অঞ্চলকে আলাদা করার জন্য তা যথেষ্ট।

    রাজশেখর জম্বুদ্বীপ, ভারতবর্ষ এবং ভারতবর্ষের নয়টি ভাগের উল্লেখ প্রসঙ্গে ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্র’[৪৪] (সার্বভৌম শাসকের ক্ষেত্র বা স্থান) ধারণাটির অবতারণা করেছেন। রাজশেখরের মতে, কুমারীপুরা থেকে বিন্দুসরোবর পর্যন্ত হাজার যোজন বিস্তৃত এই ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্র’ হয়তো নিখুঁত ভৌগোলিক মাপে পরিমাপযোগ্য নয়; কিন্তু ভারতবর্ষের ধারণার মধ্যে এই ধারণাটির তাৎপর্য হলো ওই নির্দিষ্ট স্থানিক পরিসরের সঙ্গে ভারতবর্ষের সংযোগ স্থাপন। দিক-বিভাগের বিষয়ে রাজশেখরের ধারণার আরও অনেক মাত্রা আছে, যেগুলো বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনার প্রয়োজন নেই। পৌরাণিক উপাদানের পুনরাবৃত্তি এবং তার সঙ্গে নতুন সংযোজনের মাধ্যমে রাজশেখর মূলত পৌরাণিক কাঠামোর মধ্যেই ভারতবর্ষের একটি নকশাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁর উপস্থাপনায় এই ধারণা বংশলতিকার সঙ্গে যুক্ততা থেকে মুক্ত। ভবিষ্যৎ রচয়িতাদের কাছে হয়তো তাদের নিজস্ব প্রসঙ্গগুলোকে খাপ খাওয়ানোর জন্য এই ধরণের নকশা বেশ উপযোগী বলে মনে হয়েছিল।

     

    ৫. ভারতবর্ষের অর্থের ব্যঞ্জনা

    কালানুক্রমিকভাবে ভিন্ন তিন ধরনের লিখিত সূত্রে ভারতবর্ষ এবং এর ধারণার সঙ্গে যুক্ত বৈশিষ্ট্যের যে বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়, সেগুলো থেকে দুটি বিষয় সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি লাভ করা সম্ভব: প্রথমত, যারা এ বিষয়ে লিখেছিলেন তারা ভারতবর্ষকে কীভাবে দেখতেন; এবং দ্বিতীয়ত, তাদের সেই উপলব্ধির বিবর্তন কীভাবে ঘটেছিল। একথা স্পষ্ট যে, ভারতবর্ষকে নিজে থেকেই একটি সুসংজ্ঞায়িত ভৌগোলিক সত্তা হিসেবে দেখা হতো না। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত আদিতম উল্লেখ থেকে যেকথা বোঝা যায় তা হলো পরবর্তীকালে যে স্থানিক-পরিসর ও ধারণায় রূপান্তরিত হয়েছে ভারতবর্ষ শুরুতে সেই ধারণার অংশমাত্র ছিল। সম্ভবত এই স্থানিক ধারণা ভরতদের ‘জনপদের’ সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল, যেমনটা ছিল কুরু, কোশল, মগধ, বৎস এবং আরও অনেকগুলো জনপদের ক্ষেত্রে।

    প্রকৃতপক্ষে, ‘ভারতবর্ষ‘  নয় বরং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বসতি বা বাসস্থানকে সংজ্ঞায়িত করত ‘জনপদ’ শব্দটি। ভারতবর্ষের অর্থের প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে স্বতন্ত্র জনপদগুলি এসব অর্থেরই বিভিন্ন ‘স্থানিক-সামাজিক’ উপাদানে পরিণত হয়। এই বর্ধিত কাঠামোতে সেই সব জনপদের অবস্থান নির্দিষ্ট করা হতো মধ্যদেশের সাপেক্ষে সেগুলোর ‘দিশ’ বা দিকের ভিত্তিতে।

    ‘দিশের’ এই মূল ধারণার ওপর ভিত্তি করেই ভারতবর্ষের বিকশিত ধারণাটি একটি দেশের (দেশ) রূপ লাভ করে, যা আদতে ‘দিশ’ শব্দ থেকেই উদ্ভূত। তবে, এই দেশটি ছিল উন্মুক্ত-প্রান্তবিশিষ্ট, ভৌগোলিকভাবে আবদ্ধ বা ঘেরা নয়। যদিও পুরাণগুলোতে হিমবৎ এবং সমুদ্রের মধ্যবর্তী ‘বর্ষ’ হিসেবে ভারতবর্ষকে ভৌগোলিকভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করা হয়েছে, তবুও বিভিন্ন দিকের জনপদ এবং জাতিগত সম্প্রদায়গুলো কখনোই এই ভৌগোলিক সীমানার সঙ্গে পুরোপুরি মিলেমিশে যায় নাই।

    উদাহরণস্বরূপ, রাজশেখরের সাক্ষ্য অনুযায়ী, উত্তরাপথ (উত্তর অঞ্চল) শুরু হচ্ছে পৃথুদকের (বর্তমান হরিয়ানা) ওপার থেকে। সেখানে শক, কেকয়, ভোক্কান, হূণ, বাণায়ুজ, কম্বোজ, লিম্পক, তঙ্গণ, তুরুস্ক, তুষার এবং আরও অনেক সম্প্রদায়ের বাস। এতে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ‘দিশ’ বা দিক ছিল একটি স্থিতিস্থাপক ধারণা। কোনো অনমনীয় ভৌগোলিক সীমানা নয়। যদিও জমি লেনদেনের ক্ষেত্রে আবদ্ধ স্থানের (সীমানা বোঝাতে ‘মর্যাদা’ বা ‘সীমা’) ধারণাটি বেশ প্রচলিত ছিল। একইভাবে, রাজশেখর এবং অন্যান্য অনেক সূত্রে সিংহল বা শ্রীলঙ্কাকে দক্ষিণ অঞ্চলে স্থাপন করা হয়েছে। অন্যান্য লিখিত উৎস [৪৫] থেকেও এমন অনেক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে যেগুলো একথা স্পষ্ট করে দেয় যে, এমনকি এর বিবর্তিত অর্থেও অতীতে ভারতবর্ষকে কখনো এমন কোনো সংহত ও জমাটবদ্ধ দেশ হিসেবে দেখা হয়নি, যে দেশের ভিত্তিতে এখানকার অধিবাসীদের চিহ্নিত করা হবে, অথবা তারা নিজেরা সেই পরিচয়ে পরিচিত হবে।

    সুতরাং, একটি উন্মুক্ত পরিসরের দ্যোতক হিসেবে ভারতবর্ষ ছিল একটি বিশ্বতত্ত্বীয় রূপরেখার অংশ। অন্তত পৌরাণিক বিশ্বতত্ত্ব এবং পৌরাণিক বিশ্বচিত্রের (যদি এই শব্দটি ব্যবহার করা যায়) ক্ষেত্রে সৃষ্টির আখ্যান এবং রাজকীয় বংশলতিকা (যার একটি অংশ হলো ভরত বংশ) ছিল এই ভূখণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একইসঙ্গে, ভারতবর্ষের ধারণাটি স্থবির ছিল না। পুরাণগুলি যেখানে কেবল বিস্তৃতি, পর্বত এবং নদনদী দিয়ে ভারতবর্ষের পরিসরের কাঠামো ব্যাখ্যা করেছে, সেখানে কালিদাসের লেখায় স্থানীয় বিচিত্র সম্পদের সঙ্গে পরিচয়ের একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। রাজশেখর তাঁর ‘দেশ-পরিচয়’ অধ্যায়ে ভারতবর্ষের বিভিন্ন দিকের বর্ণনায় যে স্থানীয় পণ্যের উল্লেখ করেছেন, সেটাও এই ধারারই অংশ। বসতি অঞ্চল, পর্বত ও নদীর অবস্থান সংক্রান্ত ভৌগোলিক জ্ঞানের ভাণ্ডার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠেছিল এবং সেই জ্ঞান ভারতবর্ষের ধারণার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, কালানুক্রমিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রমাণগুলো বিচার করলে দেখা যায় ‘জন’ থেকে ‘জনপদ’, সেটা থেকে ‘বর্ষ’ এবং শেষে ‘দেশ’-এর ধারণায় পৌঁছানের একটি ক্রমরূপান্তর লক্ষ্য করা সম্ভব।

    তাই ভারতবর্ষ কোনো ‘পবিত্র স্থান’ ছিল না। আবার এডনি যেমনটা বলেছিলেন, এই পরিসর কোনো ‘অবোধ্য দৃশ্যপটও’  ছিল না। জম্বুদ্বীপের অন্তর্গত একটি ‘বর্ষ’ হিসেবে ভারতবর্ষের আরেকটি অর্থ খোঁজা যেতে পারে। এই ভূখণ্ড এমন একটি স্থান যেটা ‘কর্মের’ নীতি দ্বারা শাসিত। আর এই পরিসর সেই স্থান যেখানে অধিবাসীরা চার বর্ণে বিভক্ত ছিল।[৪৬] এখানেও ‘দিশ’ বা দিকের ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ ‘মধ্যদেশ’ বা ‘আর্যাবর্ত’ ছিল সেই কেন্দ্রীয় অঞ্চল যেটা একটি আদর্শ হিসেবে বিরাজ করত। রাজশেখরের ভাষায়: ‘এখানে চারটি বর্ণ এবং চারটি আশ্রমের বিধান প্রচলিত। এটাই সদাচারের মূল।’ আর্যাবর্ত থেকে নৈকট্য বা দূরত্ব নির্দেশ করত ওই আদর্শের প্রতি আনুগত্যের মাত্রা; যেমন মনু আর্যাবর্তের বাইরের জাতিগোষ্ঠীগুলোকে ‘ম্লেচ্ছ’ পর্যায়ে ফেলেছিলেন।[৪৭]

    ভারতবর্ষকে যেহেতু একটি কেন্দ্রীয় অঞ্চল এবং চারটি প্রধান দিকের (যা আরও প্রসারিত হয়ে সাত বা নয়ে দাঁড়াতে পারে) সমষ্টি হিসেবে এবং সেগুলোতে অবস্থিত বিভিন্ন জনপদের সমাহার হিসেবে কল্পনা করা হয়েছিল, সেহেতু বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর আত্ম-পরিচয় (এবং অন্যদের দ্বারা তাদের পরিচিতি) নির্ধারিত হতো তাদের নিজ নিজ জনপদের ভিত্তিতে। ভারতবর্ষের ভিত্তিতে নয়। একজন ব্যক্তি নিজেকে মগধ, কোশল, দ্রাবিড়, কোঙ্কণ বা অবন্তীর অধিবাসী হিসেবে পরিচয় দিতে পারতেন; অথবা গান্ধার, কুরু বা মদ্র থেকে আগত হিসেবে তাকে সম্বোধন করা হতো। কিন্তু কখনোই ‘ভারতবর্ষ থেকে আগত’ হিসেবে নয়।[৪৮] সুতরাং, জনপদগুলোকে বাদ দিলে ভারতবর্ষের অর্থ খুব একটা দাঁড়াত না। সেকারণেই পূর্ণ বিকশিতই হোক বা অঙ্কুরোদগমশীল হোক, ভারতবর্ষ আমাদের আদি জাতীয় চেতনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল কি না সেই প্রশ্নটি তোলা কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক।[৪৯] ভারতবর্ষের ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে ‘স্বদেশ’ (নিজের দেশ) বা ‘বিদেশ’ (ভিন দেশ) শব্দগুলোর কোনো প্রাসঙ্গিকতা ছিল না।

    ভারতীয় জাতীয়তাবাদের কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই ভারতবর্ষের আদি অর্থ আলোচনা ও বোঝা সম্ভব। ভারতবর্ষের ব্যঞ্জনায় ‘সীমানা’ (border), ‘সীমান্ত’ (frontier) বা ‘বিদেশির’ ধারণা অনুপস্থিত ছিল। তাই মনে হয় প্রাথমিক উৎসগুলোতে ঘন ঘন হানা ও আক্রমণের উল্লেখ এবং সেগুলোর নেতিবাচক সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাবের কথা থাকা সত্ত্বেও ‘আক্রমণের জুজু’ এবং ভারতীয় সমাজে গুরুতর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী অনুঘটক হিসেবে ‘বিদেশিদের’ উপস্থিতির বয়ান আদি ভারতীয়দের ভারতবর্ষ ও সমাজকে দেখার অর্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আক্রমণ ‘নিজ/আত্ম’ এবং ‘অপরের’ মধ্যে বিভাজন তৈরি করেনি। ভারতীয় সমাজের প্রধান বিভাজন রেখাটি দেখা হতো ‘বর্ণের’ দৃষ্টিকোণ থেকে। এই বিভাজন ভেতরে থাকা এবং বাইরে থাকা মানুষদের মধ্যে সর্বপ্রধান পার্থক্যটি তৈরি করে দিত।

    ঔপনিবেশিক প্রশাসন যেভাবে ‘ইন্ডিয়া’ এবং ‘ভারতবর্ষের’ ধারণাগুলোকে ব্যবহার করেছিল সেটা এই স্থানিক ধারনার আদি অর্থ থেকে একটি নিশ্চিত বিচ্যুতি চিহ্নিত করে। একটি মানচিত্রায়নযোগ্য, সংহত, অনড় আঞ্চলিক সত্তা হিসেবে পরিচয়কে জমাট বাঁধিয়ে সেটিকে অতীতের ওপর ছুড়ে দেওয়া হলো। যেটি ছিল উন্মুক্ত, সেটি এখন হয়ে উঠল প্রশাসনিকভাবে সংজ্ঞায়িত একটি আবদ্ধ দেশ।[৫০] এই স্থানিক এককটি একটি স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত দেশের ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল এমনভাবে যেভাবে আগে কখনো ছিল না। এবং এই বদলের পেছনে লুকিয়ে আছে অতীতের বিশাল পরিসর জুড়ে ‘বিদেশি’, ‘বিদেশি আক্রমণ’, ‘অন্ধকার যুগ’ এবং অনুরূপ অশনিসংকেতের ধারণাগুলোর অনুপ্রবেশ। ভারতবর্ষের এই নবনির্মিত গণ্ডীবন্ধ সত্তাটি কেবল একটি সমসত্ত্ব ঐতিহাসিক আখ্যানের কেন্দ্রবিন্দু হয়েই ক্ষান্ত হলো না; কালবিভ্রান্তিদোষের/অ্যানাক্রোনিজম’ বিপদ সম্পর্কে অসচেতন অনেক উৎসাহী হাতের ছোঁয়ায় এই ভূখণ্ড একটি ‘ইন্ডিয়া নেশন স্টেট’ বা ভারতীয় জাতিরাষ্ট্রের আসন হয়ে উঠল। আমাদের ইতিহাসের পাঠ্যবইগুলোতে রাজনৈতিক একীকরণ এবং বিকেন্দ্রীকরণ ও অনৈক্যের ভীতির ওপর যে জোর দেওয়া হয়, তার কারণ এভাবেই বোঝা সম্ভব।

    ভারতবর্ষের প্রাক-ঔপনিবেশিক অতীতকে ‘হিন্দু’ ও ‘মুসলিম’—এই দুই ভাগে তীক্ষ্ণভাবে ভাগ করার যে কালানুক্রমিক বিভাজন আমাদের ইতিহাসচর্চায় গভীরভাবে গেঁথে আছে (যা আজও কার্যকরভাবে নির্মূল করা যায়নি), সেই বিভাজন অতীতের একটি নতুন পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করেছে। এই বিভাজন আগে ভারতীয় চিন্তায় উপস্থিত ছিল না। এমন বিভাজন ‘হিন্দু শাসন’ এবং ‘মুসলিম শাসনের’ প্রক্ষেপণের জন্য দশা তৈরি করে দিয়েছে, যেন রাজনৈতিক আধিপত্য এক জাতি থেকে অন্য জাতির কাছে হস্তান্তরিত হচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এসব বয়ান ‘ইন্ডিয়া’ এবং বিশেষত ‘ভারতবর্ষ’, উভয় ধারণারই একটি অত্যন্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং পৈশাচিক অপব্যাখ্যা (diabolical misconstruction)। অতীতের ভারতবর্ষ এমন একটি ধারণা হিসেবে বিকশিত হয়েছিল যা একটি কাঠামোর মধ্যে বিভিন্ন স্থানিক পরিসর এবং সেগুলোর সামাজিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে ধারণ করতে পারত; যে কাঠামোতে আদর্শ (ideal) এবং সেই আদর্শ থেকে ভিন্নতা (variants), উভয়ই জায়গা করে নিতে পারত। ঔপনিবেশিক যুগে সৃষ্ট ভারতবর্ষের সঙ্গে একীকৃত ‘ইন্ডিয়া’র ধারণাটি একটি বোঝা হিসেবে আমাদের বইতে হচ্ছে। সম্ভবত আমাদের ক্রমবর্ধমান নব্য-জাতীয়তাবাদী যুগে এই বোঝাকে আরও অলংকৃত করতে আমরা বাধ্য হচ্ছি।

     

    ৬. আলাপের সংক্ষিপ্তসার

    ইতিহাসবিদরা দীর্ঘকাল ধরে শিলালিপিকে অতীত সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে বিবেচনা করে আসছেন; তাই এই ধরনের প্রমাণের দিকে সংক্ষেপে দৃষ্টিপাত করে আমি ভারতবর্ষের ধারণা নিয়ে আমার শেষ বক্তব্যটি উপস্থাপন করার চেষ্টা করব। এই শেষ অংশের জন্য নির্বাচিত শিলালিপিগুলো মোটামুটি দশম থেকে চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যেকার। এই কালানুক্রমিক ব্যাপ্তিটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কালপর্বকে ক্রমবর্ধমানভাবে সেই সময়কাল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে যেটাকে ভারতের আঞ্চলিক বিভাজনগুলো দানা বাঁধার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।[৫১] দ্বৈবচয়ন পদ্ধতিতে  নির্বাচিত এই শিলালিপিগুলো ইঙ্গিত দেয় কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন জনবসতি কেন্দ্র ও অন্যান্য ভূসংস্থানিক চিহ্ন নিয়ে গঠিত একটি নির্দিষ্ট স্থানীয় পরিসর বা অঞ্চল ভারতবর্ষের ধারণার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করত।

     

    একটি উদাহরণ দেওয়া যাক: উত্তর কর্ণাটক থেকে প্রাপ্ত রাষ্ট্রকূট আমলের দশম শতাব্দীর (৯২৯-৩০ খ্রিষ্টাব্দ) একটি শিলালিপি,[৫২] যেখানে ‘পুরিকর’ নামক একটি জনপদের উল্লেখ করে সেই পরিসরকে ‘ভারতমহীমণ্ডলের’ ‘আভরণ’ (অলংকার) হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, একটি ছোট লোকালয় বা স্থানের জন্যেও ‘ভারতমহীমণ্ডল’ ছিল একটি স্থানিক উল্লেখযোগ্য চিহ্ন। কোনো স্থানিক পরিসরের এমন কোনো চিহ্ন সাপেক্ষে উল্লেখ বিভিন্ন উৎসে অপরিহার্য নিয়মিততাকেই প্রকাশ করে। কর্ণাটকের বেলারী জেলা থেকে প্রাপ্ত দ্বাদশ শতাব্দীর (১১৮১ খ্রিষ্টাব্দ) কুর্গোদ শিলালিপি[৫৩] ‘কুন্তল’ দেশকে ‘ভারতক্ষেত্রে’ অবস্থিত বলে উল্লেখ করেছে, যে ক্ষেত্র আবার গভীর সমুদ্র দ্বারা বেষ্টিত জম্বুদ্বীপের একটি অংশ।

    ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ এবং চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুর দিকের অন্ধ্র থেকে প্রাপ্ত কিছু শিলালিপিতে এই বিষয়বস্তুটি আরও বিশদভাবে ব্যক্ত হয়েছে। সেখানে কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলকে ভারতবর্ষের অংশ হিসেবে উল্লেখ করার পর, তার স্থানীয় ভূপ্রকৃতি এবং পবিত্র স্থানগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়ার জন্য সেই বর্ণনাকে আরও ভেঙ্গে ভেঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছে। যেমন, অন্ধ্রপ্রদেশের পূর্ব গোদাবরী জেলার পিঠাপুরম এলাকা থেকে প্রাপ্ত চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুর দিকের এক গুচ্ছ তাম্রশাসনে [৫৪] দক্ষিণ সমুদ্র থেকে ‘পর্বতরাজ’ (হিমালয়) পর্যন্ত বিস্তৃত ভূমিকে ‘ভারতবর্ষ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে আরো যোগ করা হয়েছে: ‘তার মধ্যেই অবস্থিত অন্ধ্রদের ভূমি, যা তিনটি বিখ্যাত মন্দিরের (লিঙ্গ) সঙ্গে যুক্ত থাকায় ‘ত্রিলিঙ্গ-ভূমি’ নামেও পরিচিত; যথা—শ্রীশৈল, কালেশ্বর এবং দ্রাক্ষারাম… সেখানেই রয়েছে দক্ষ, অমর, ক্ষীর, কুমার এবং প্রাচ্য নামক পাঁচটি উদ্যান, শিবের ক্রীড়াভূমি এবং গৌতমী, কৃষ্ণবেণী, মালপ্রভা, ভীমরথী ও তুঙ্গভদ্রার মতো পবিত্র নদীসমূহ। রয়েছে কৃষ্ণা নদীর তীরে অবস্থিত শ্রীকাকুল, যে স্থান তিন ভুবন রক্ষার জন্য বিষ্ণুর (শ্রীবল্লভ) আবাসস্থল।’

    মনে হয়, স্থানীয়ভাবে বা অঞ্চলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা জনবসতি বা ধর্মীয় ভূসংস্থানিক চিহ্নগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে ভারতবর্ষের সেই মহাকাব্যিক-পৌরাণিক ধারণার আবাহন ছিল মূলত ‘মূল্য-আরোপণ’ বা গরিমান্বিত করার একটি কৌশল। অর্থাৎ, একটি সর্বজনস্বীকৃত মহাজাগতিক পরিসরগত চিহ্নের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে নিজেদের গুরুত্ব বাড়ানো; ঠিক যেভাবে একটি নতুন রাজবংশ কোনো মহাকাব্যিক-পৌরাণিক বংশলতিকার সঙ্গে নিজেদের জুড়ে দিয়ে নিজেদের মর্যাদার বৈধতা খুঁজত।[৫৫] একই অঞ্চলের চতুর্দশ শতাব্দীর আরেকটি শিলালিপির জম্বুদ্বীপ, নয়টি খণ্ড (বিভাগ) এবং হিমালয়ের দক্ষিণে ও সমুদ্রের উত্তরে অবস্থিত ভারতবর্ষের বর্ণনায় একই কৌশলের পুনরাবৃত্তি দেখা যায় : ‘এই স্থান (ভারতবর্ষ) হলো সেই স্থান যেখানে কর্ম ফলদায়ক হতো, যেখানে বিভিন্ন ভাষা ও প্রথা প্রচলিত ছিল[৫৬] এবং যে পরিসর বহু দেশে বিভক্ত ছিল। সেগুলোর মধ্যে একটির নাম তিলিঙ্গ, যেখান দিয়ে বহু পবিত্র নদী প্রবাহিত, যেখানে ছিল বহু সমৃদ্ধ নগরী, সুন্দর পর্বতমালা, দুর্ভেদ্য অরণ্য, গভীর জলাশয় এবং অজেয় দুর্গসমূহ।’ স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়, এই কালপর্বের মধ্যে মহাকাব্যিক-পৌরাণিক বিশাল ও বিস্তৃত পরিসরের কল্পচিত্রসমেত ভারতবর্ষ যেকোনো ক্ষুদ্র বা বৃহৎ স্থানিক পরিসর অথবা অঞ্চলের জন্য একটি অপরিহার্য উল্লেখযোগ্য চিহ্ন হিসেবে স্বীকৃত হয়ে উঠেছিল। অবশ্যই যদি কোনো লিখিত নথিতে ওই স্থানিক পরিসরটির ঠাঁই পাওয়ার সুযোগ ঘটত তবেই।

    তথ্যসূত্র:

    ১. দেখুন: পার্থ চ্যাটার্জি, ‘ক্লেইমস অন দ্য পাস্ট: দ্য জিনিয়ালজি অফ মডার্ন হিস্টোরিওগ্রাফি ইন বেঙ্গল’, সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ: এসেজ ইন অনার অফ রণজিৎ গুহ (সম্পা. ডেভিড আর্নল্ড ও ডেভিড হার্ডিম্যান), দিল্লি, ১৯৯৫, পৃ. ১-৪৯।

    ২. এইচ. সি. রায়চৌধুরী, ‘স্টাডিজ ইন ইন্ডিয়ান অ্যান্টিকুইটিজ’, দ্বিতীয় সংস্করণ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা, ১৯৫৮। দেখুন অধ্যায় সাত: ‘পুরাণিক কসমোগ্রাফি’, পৃ. ৭৫।

    ৩. ‘দ্য কনস্টিটিউশন অফ ইন্ডিয়া’ (১ এপ্রিল ১৯৮৬ পর্যন্ত সংশোধিত), নয়াদিল্লি, ১৯৮৬, পার্ট ১, আর্টিকেল ১।

    ৪. আর. কে. মুখার্জি, ‘দ্য ফান্ডামেন্টাল ইউনিটি অফ ইন্ডিয়া’, ক্রনিকল ক্লাসিকস সিরিজ, নয়াদিল্লি, ২০০৩ (মূল প্রকাশ ১৯১৩)।

    যদিও সম্প্রতি মন্তব্য করা হয়েছে যে ঔপনিবেশিক ইতিহাসবিদরা প্রাক-ব্রিটিশ ভারতে ঐক্যের অনুপস্থিতির ওপর জোর দিয়েছিলেন (এস. ভট্টাচার্য, ‘ইন্ট্রোডাকশন’, কালচারাল ইউনিটি অফ ইন্ডিয়া, রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচার, কলকাতা, ২০১৩, পৃ. xii), তবুও দেশীয় ভাষায় ইতিহাস লেখার চর্চা মূলত ঔপনিবেশিক ইতিহাস লিখনকেই মডেল বা আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিল।

    ৫. বি. এন. মুখার্জি, ‘দ্য কনসেপ্ট অফ ইন্ডিয়া’, দ্য কনসেপ্ট অফ ইন্ডিয়া, কলকাতা, ১৯৯৮।

    ৬. সুদীপ্ত কবিরাজ, ‘দ্য ইমাজিনারি ইনস্টিটিউশন অফ ইন্ডিয়া’, সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ, ভলিউম ৭ (সম্পা. পার্থ চ্যাটার্জি ও জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে), নয়াদিল্লি, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ৫ম মুদ্রণ, ১৯৯৯, পৃ. ১-৩৯।

    ৭. সি. এ. বেইলি, ‘এম্পায়ার অ্যান্ড ইনফরমেশন: ইন্টেলিজেন্স-গ্যাদারিং অ্যান্ড সোশ্যাল কমিউনিকেশন ইন ইন্ডিয়া, ১৭৮০-১৮৭০’, ফার্স্ট সাউথ এশিয়ান এডিশন, দিল্লি, ১৯৯৯, পৃ. ২৬১ এবং পরবর্তী।

    ৮. ম্যাথু এইচ. এডনি, ‘ম্যাপিং অ্যান এম্পায়ার: দ্য জিওগ্রাফিক্যাল কনস্ট্রাকশন অফ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া, ১৭৬৫-১৮৪৩’, ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগো প্রেস, শিকাগো-লন্ডন, ১৯৯৭, পৃ. ১।

    ৯. এডনি বিশদভাবে বলেন (ওই, পৃ. ৩৩৩): ‘ব্রিটিশ মানচিত্রের যৌক্তিক, অভিন্ন স্থান বা স্পেস (uniform space) কোনো মানসিক মূল্যবোধ-নিরপেক্ষ স্থান ছিল না। বরং এটি ছিল ক্ষমতার সম্পর্কে জারিত একটি স্থান—যেখানে ব্রিটিশরা চিত্রিত জমিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করত (বা করার ক্ষমতা রাখত)… সাম্রাজ্যিক স্থান বা ইম্পেরিয়াল স্পেস ছিল সীমানার স্থান… ইম্পেরিয়াল স্পেস সীমানাকে একটি পদ্ধতি (mechanism) হিসেবে ব্যবহার করত বিমূর্ত স্থানকে (abstract space) ভূখণ্ডের বাস্তবতার (concrete reality) সঙ্গে সমান করে তোলার জন্য।’

    ১০. ইরফান হাবিব, ‘দ্য ফরমেশন অফ ইন্ডিয়া—নোটস অন দ্য হিস্ট্রি অফ অ্যান আইডিয়া’, সোশ্যাল সায়েন্টিস্ট, সংখ্যা ৭-৮ (১৯৯৭), পৃ. ৮। আরও দেখুন তাঁর ‘দ্য এনভিশনিং অফ আ নেশন: আ ডিফেন্স অফ দ্য আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’, সোশ্যাল সায়েন্টিস্ট, ভলিউম ২৭ (সংখ্যা ৯-১৯), ১৯৯৯, পৃ. ১৮-২৮; এবং ওই লেখকের ‘ইন্ট্রোডাকশন’, ইন্ডিয়া—স্টাডিজ ইন দ্য হিস্ট্রি অফ অ্যান আইডিয়া, দিল্লি, ২০০৫, পৃ. ১-১৭। ইরফান হাবিবের বিবৃতি (‘দ্য ফরমেশন অফ ইন্ডিয়া—নোটস অন দ্য হিস্ট্রি অফ অ্যান আইডিয়া’)—যে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে ফারসি ভাষায় দেশ হিসেবে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস লেখা হচ্ছিল—তা এই ক্ষেত্রের অন্য বিশেষজ্ঞদের দ্বারা সমর্থিত হওয়া প্রয়োজন।

    ১১. দেখুন: এ. এ. ম্যাকডোনেল এবং এ. বি. কিথ, ‘ভেদিক ইনডেক্স অফ নেমস অ্যান্ড সাবজেক্টস’, ভলিউম ২, পুনর্মুদ্রণ, দিল্লি, ১৯৬৭, পৃ. ৯৪-৭। কিছু ভরতদের সঙ্গে মধ্যদেশের সম্পৃক্ততা হয়তো এই অঞ্চলের দ্যোতনার (connotation) প্রসারণ বা স্ফীতি ঘটিয়েছিল।

    ১২. এ. বি. কিথ, ‘ঋগ্বেদ ব্রাহ্মণস: দ্য ঐতরেয় অ্যান্ড কৌষীতকি ব্রাহ্মণস অফ ঋগ্বেদ’, মূল সংস্কৃত থেকে অনূদিত, হার্ভার্ড ওরিয়েন্টাল সিরিজ, মতিলাল বানারসিদাস দ্বারা পুনর্মুদ্রিত, দিল্লি-পাটনা-বারাণসী, ১৯৭১, পৃ. ৩৩০-১। বন্ধনীর ভেতরের সংস্কৃত অভিব্যক্তিগুলো ঐতরেয় ব্রাহ্মণ টেক্সট (৮.১৪.৩) থেকে নেওয়া।

    ১৩. জি. পি. মালালাসেকেরা, ‘ডিকশনারি অফ পালি প্রপার নেমস’, লন্ডন, ১৯৩৭, ভলিউম ১, পৃ. ৯৪১-২।

    ১৪. শিলালিপির পাঠ্যের জন্য দেখুন: ডি. সি. সরকার, ‘সিলেক্ট ইনসক্রিপশনস বিয়ারিং অন ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি অ্যান্ড সিভিলাইজেশন’, ভলিউম ১ (সংশোধিত দ্বিতীয় সংস্করণ, ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি, কলকাতা, ১৯৬৫), পৃ. ৪৮-৯ (মাইনর রক এডিক্ট: রূপনাথ ভার্সন)।

    ১৫. ওই, পৃ. ২১৬ (খারবেলের হাতিগুফ্ফা শিলালিপি, লাইন ১০)।

    ১৬. এইচ. সি. রায়চৌধুরী, পূর্বে উদ্ধৃত (op. cit.)। অনেক পুরাণের ‘ভুবন-বিন্যাস’ বা ‘ভুবন-কোষ’ অংশে যে পৌরাণিক উপাদান পাওয়া যায়, তা অনেক গ্রন্থে সংগৃহীত ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটির উল্লেখ করা যেতে পারে: এস. বি. চৌধুরী, ‘এথনিক সেটেলমেন্টস ইন অ্যানসিয়েন্ট ইন্ডিয়া’ (কলকাতা, ১৯৫৫) এবং এম. আর. সিং, ‘আ ক্রিটিক্যাল স্টাডি অফ দ্য জিওগ্রাফিক্যাল ডেটা ইন আর্লি পুরাণস’ (কলকাতা, ১৯৭২)।

    ১৭. মহাভারত, সভাপর্ব, দিগ্বিজয়-পর্বাধ্যায় (২.৬)।

    ১৮. বিষ্ণু-পুরাণের নিম্নলিখিত সংস্করণ ও অনুবাদগুলো ব্যবহার করা হয়েছে: এইচ. এইচ. উইলসন, ‘দ্য বিষ্ণু-পুরাণ: আ সিস্টেম অফ হিন্দু মিথোলজি অ্যান্ড ট্র্যাডিশন’, এন. এস. সিং কর্তৃক পরিবর্ধিত ও বিন্যস্ত, দুই খণ্ডে, দিল্লি, ১৯৮৯; এইচ. এইচ. উইলসন, ‘দ্য বিষ্ণু-পুরাণ: আ সিস্টেম অফ হিন্দু মিথোলজি অ্যান্ড ট্র্যাডিশন’, আর. সি. হাজরা লিখিত ভূমিকাসহ, পুনর্মুদ্রণ, কলকাতা, ১৯৬১; বিষ্ণু-পুরাণ, পঞ্চানন তর্করত্ন কর্তৃক সম্পাদিত ও বাংলায় অনূদিত, পুনর্মুদ্রণ (কলকাতা, ১৯৭৩)।

    ১৯. রঘুবংশম্-এর জন্য আমরা ব্যবহার করেছি: সি. কে. দেবধর, ‘ওয়ার্কস অফ কালিদাস’, ভলিউম ২ (কবিতা), পুনর্মুদ্রণ, দিল্লি, ২০০২।

    ২০. কাব্যমীমাংসার জন্য ব্যবহৃত সংস্করণ: এন. এন. চক্রবর্তী, ‘রাজশেখর ও কাব্যমীমাংসা’ (বাংলায়), শান্তিনিকেতন, ১৯৬০।

    ২১. ভীষ্ম পর্ব, II: ৩৪২।

    ২২. এইচ. এইচ. উইলসন, ‘দ্য বিষ্ণু-পুরাণ’, পৃ. ১৩৩-৪।

    ২৩. বিষ্ণু-পুরাণ, ২.২.১৫-১৮।

    ২৪. বায়ু-পুরাণ, অধ্যায় ৩৩। প্রকৃতপক্ষে মনুর বংশধররাই ঋষি, দেব, পিতৃ, গন্ধর্ব, রাক্ষস, যক্ষ, ভূত, মনুষ্য, মৃগ এবং পক্ষী দিয়ে পৃথিবী পূর্ণ করেছিলেন।

    ২৫. সি. আর. দেবধর (পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ৬৩) যেমনটা প্রস্তাব করেছেন, ‘জিগীষা’র অর্থ ‘বিশ্ব-জয়’ না হয়ে আক্ষরিক অর্থ (জয়ের ইচ্ছা) হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

    ২৬. রঘুর ‘দিগ্‌জিগীষা’ ৪র্থ সর্গের ২৬-৮৫ শ্লোকে আলোচিত হয়েছে।

    ২৭. ‘সুহ্ম’ মোটামুটিভাবে আধুনিক পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, বাংলার উপকূলীয় বালেশ্বর জেলা এবং ওড়িশার সঙ্গে মিলে যায়।

    ২৮. ‘বঙ্গ’-এর নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্র হবে পরবর্তীকালের বিক্রমপুর বা বাংলাদেশের ঢাকার আশেপাশের এলাকা। কালিদাস কেবল ভূখণ্ডের নদীমাতৃক চরিত্রের সঙ্গে তাঁর পরিচিতিই দেখাননি, বরং এই অঞ্চলের অধিবাসীদের নৌকা চালনায় দক্ষতার বিষয়েও সচেতন ছিলেন।

    ২৯. ‘কপিশা’ আধুনিক পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া ও মেদিনীপুর জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কংসাবতী বা কাঁসাই নদীর সঙ্গে মিলে যায়। দেখুন: এন. এল. দে, ‘দ্য জিওগ্রাফিক্যাল ডিকশনারি অফ অ্যানসিয়েন্ট অ্যান্ড মেডিয়েভাল ইন্ডিয়া’, প্রথম প্রকাশ ১৯২৭, পুনর্মুদ্রণ, দিল্লি, ১৯৯০, পৃ. ৯২।

    ৩০. দে (পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ২১৩) ওড়িশার বৈতরণী নদীর উত্তরে এটিকে নির্দেশ করেছেন। আরও দেখুন: বি. সি. ল, ‘হিস্টোরিক্যাল জিওগ্রাফি অফ অ্যানসিয়েন্ট ইন্ডিয়া’, প্যারিস, ১৯৫৪, পৃ. ১৯৭।

    ৩১. দে-র মতে: ‘ওড়িশা থেকে মাদুরা জেলা পর্যন্ত বিস্তৃত পুরো পর্বতমালা মহেন্দ্র-পর্বত নামে পরিচিত ছিল। এর মধ্যে পূর্বঘাট পর্বতমালা এবং দক্ষিণের সারকারস (circars) থেকে গন্ডোয়ানা পর্যন্ত বিস্তৃত রেঞ্জ অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার গঞ্জাম-এর কাছের একটি অংশ এখনো মহেন্দ্র মালেই বা মহেন্দ্রের পাহাড় নামে পরিচিত’, পৃ. ১১৯। আরও দেখুন: ল, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ১৭২।

    ৩২. দে কলিঙ্গদের বৈতরণী নদীর দক্ষিণে স্থাপন করেছেন, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ৮৫। আরও দেখুন: ল, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ১৫৬-৮। আরও দেখুন: বি. সি. ল, ‘জিওগ্রাফিক্যাল অ্যাসপেক্টস অফ কালিদাস’স ওয়ার্কস’, কলকাতা, ১৯৫৪, বিভিন্ন স্থানে (passim)।

    ৩৩. ‘কাবেরী নদীর দক্ষিণে পশ্চিমঘাট পর্বতমালার দক্ষিণাংশ, যাকে ত্রিবাঙ্কুর পাহাড় বলা হয়’; এর মধ্যে কার্ডামম পর্বতমালাও অন্তর্ভুক্ত, যা কোয়েম্বাটুর গ্যাপ থেকে কেপ কমোরিন বা কন্যাকুমারী পর্যন্ত বিস্তৃত; দে, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ.১২২। দে নীলগিরি পাহাড়কে দরদুর-এর সঙ্গে শনাক্ত করেছেন, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ৫৩।

    ৩৪. সি. আর. দেবধর, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ৪৭৯। আরও দেখুন: ল, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ১৯২।

    ৩৫. ‘অপরান্ত’ বা পশ্চিম প্রান্তকে সাধারণত সংকীর্ণ অর্থে উত্তর কোঙ্কন অঞ্চলের সঙ্গে মেলানো হয়। দেখুন: ল, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ১২-১৩।

    ৩৬. অপরান্তে অবস্থিত।

    ৩৭. যদিও আদি ঐতিহাসিক যুগে ভারতের বিভিন্ন অংশ থেকে যবনদের উল্লেখ পাওয়া যায়, কালিদাস পশ্চিমের সঙ্গে এবং সম্ভবত যবনদের একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাদের উল্লেখ করেছেন।

    ৩৮. সি. আর. দেবধর, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ৭১।

    ৩৯. এই টেবিল বা ছকটি কালিদাসের ভৌগোলিক জ্ঞান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে নয়—যদিও প্রদত্ত তথ্যগুলো প্রাসঙ্গিক এবং অপর্যাপ্ত; বরং এর উদ্দেশ্য হলো: (১) চারটি দিক দ্বারা সংজ্ঞায়িত স্থানের ধারণার বিবর্তনের একটি পর্যায় নির্দেশ করা, এবং (২) প্রাকৃতিক ল্যান্ডমার্ক এবং জনপদ ছাড়াও বিভিন্ন ‘দিক’ বা কোয়ার্টার-এর মধ্যে পার্থক্য করার জন্য কালিদাস কীভাবে বিভিন্ন অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্য বেছে নিয়েছিলেন তা দেখানো।

    ৪০. কাব্যমীমাংসা-য় মূল অভিব্যক্তিটি হলো: ‘তত্র = অপি মহোদয়ম্ মূলমবধি-কৃত্য ইতি’, XVII।

    ৪১. বর্তমান হরিয়ানার কার্নালের কাছে পেহোয়া (Pehoa)।

    ৪২. ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্র’ ধারণার বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন: ডি. সি. সরকার, ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্র’, স্টাডিজ ইন দ্য জিওগ্রাফি অফ অ্যানসিয়েন্ট অ্যান্ড মেডিয়েভাল ইন্ডিয়া (দিল্লি, ১৯৭১), অধ্যায় ১। সরকার কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র উদ্ধৃত করে দেখান যে হিমালয় থেকে সমুদ্র পর্যন্ত এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে হাজার যোজন বিস্তৃত ভূমিই হলো ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্র’। রাজশেখরও এই সংজ্ঞাই দিয়েছেন। তবে, সরকারের এই দাবি যে ‘একজন ভারতীয় সাম্রাজ্যিক শাসকের প্রভাব-বলয়’ ভারতের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে বলে আশা করা হতো—তা গ্রহণযোগ্য বা টেকসই (tenable) নয়। রঘুর পারসিক ও যবনদের দেশে অভিযান, একজন আদি মধ্যযুগীয় রাজার বংক্ষু (অক্সাস) নদীর তীরে তুরুস্কদের পরাজিত করার দাবি (সরকার, পৃ. ৭) এবং চোলদের দ্বারা শ্রীলঙ্কা দখল—এমন সব প্রমাণের সেট তৈরি করে যা এই ধরণের দাবির বিপক্ষে যায়।

    ৪৩. কাব্যমীমাংসা, ১৭শ অধ্যায়। তালিকাভুক্ত অনেক সম্প্রদায় ছিল মধ্য এশিয়ার।

    ৪৪. ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্র’-এর জন্য দেখুন: ডি. সি. সরকার, ‘স্টাডিজ ইন দ্য জিওগ্রাফি অফ অ্যানসিয়েন্ট অ্যান্ড মেডিয়েভাল ইন্ডিয়া’, দিল্লি, ১৯৭১, অধ্যায় ১। এন. এন. চক্রবর্তী (‘রাজশেখর ও কাব্যমীমাংসা’, পৃ. ১১১-১২) ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্র’কে ভারতীয় উপমহাদেশের ভৌগোলিক সীমানার সঙ্গে এক করে দেখেছেন বলে মনে হয়, যা একইভাবে অযৌক্তিক (unwarranted)।

    ৪৫. কাব্যমীমাংসা, অধ্যায় ১৭; মনু, II, ২৫-৯।

    ৪৬. দেখুন আমার প্রবন্ধ: ‘অ্যাকোমোডেশন অ্যান্ড নেগোসিয়েশন ইন আ কালচার অফ এক্সক্লুসিভিজম: সাম আর্লি ইন্ডিয়ান পারসপেক্টিভস’, পূর্বে উদ্ধৃত (op. cit.)।

    ৪৭. মনু, II, ২৫-৯।

    ৪৮. বি. এন. মুখার্জি, ‘দ্য কনসেপ্ট অফ ইন্ডিয়া’, পূর্বে উদ্ধৃত।

    ৪৯. ইরফান হাবিব, ‘দ্য এনভিশনিং অফ আ নেশন’, পূর্বে উদ্ধৃত।

    ৫০. ম্যাথু এডনি, পূর্বে উদ্ধৃত।

    ৫১. সংক্ষিপ্ত আলোচনার জন্য দেখুন: বি. ডি. চট্টোপাধ্যায়, ‘দ্য মেকিং অফ আর্লি মেডিয়েভাল ইন্ডিয়া’, ইন্ট্রোডাকশন, ২য় সংস্করণ, নয়াদিল্লি, ২০১২।

    ৫২. এল. ডি. বার্নেট, ‘কালাস ইনসক্রিপশন অফ দ্য রাষ্ট্রকূট গোবিন্দ IV, শক ৮৫১’, এপিগ্রাফিয়া ইন্ডিকা, ১৩ (১৯১৫-১৬), পুনর্মুদ্রিত, দিল্লি, ১৯৮২, পৃ. ৩৩১।

    ৫৩. এল. ডি. বার্নেট, ‘টু ইনসক্রিপশনস ফ্রম কুর্গোদ’, এপিগ্রাফিয়া ইন্ডিকা, ১৪ (১৯১৭-১৮), পুনর্মুদ্রিত, দিল্লি, ১৯৮২, পৃ. ২৮২।

    ৫৪. কে. এইচ. ভি. শর্মা এবং টি. কৃষ্ণমূর্তি, ‘অন্নবরপদু প্লেটস অফ কাটায়া ভেমা রেড্ডি’, এপিগ্রাফিয়া ইন্ডিকা, ৩৬ (দিল্লি, ১৯৬৫), পৃ. ১৬৭-৯০।

    ৫৫. এন. ভেঙ্কটারমনিয়া এবং এম. সোমশেখর শর্মা, ‘বিলাস গ্রান্ট অফ প্রলয় নায়ক’, এপিগ্রাফিয়া ইন্ডিকা, ৩২ (দিল্লি, ১৯৫৯), পৃ. ২৩৯-৬৮, বিশেষ করে পৃ. ২৬০।

    ৫৬. এই নথিতে ভারতবর্ষকে নিম্নলিখিত অভিব্যক্তির মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে:

    ভাষা-সমাচার-ভিদা বিভিন্নৈঃ = দেশৈর-অনেকৈর্-বিভক্তে…

  • টেরি ইগলটন।। ফ্যাসিবাদ কী?

    টেরি ইগলটন।। ফ্যাসিবাদ কী?

    অনুবাদ: জাকির হোসেন

    মাত্র কয়েকবছর আগেও উল্লিখিত শিরোনামধারী কোনো প্রবন্ধকে মনে হতো স্রেফ ঐতিহাসিক আগ্রহ থেকে লেখা কিংবা সম্ভবত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বা রোজা লুক্সেমবার্গের সামাজ্যব্যাদ সংক্রান্ত কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার প্রয়াস। কিন্তু ফ্যাসিবাদ আজ আর কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয় বা তেমনটা কখনো ছিলও না। বৈশ্বিকভাবে একচেটিয়া পুঁজিবাদের সংকট ঘনীভূত হওয়ার সাথে সাথে অগ্রসর পুঁজিবাদী সমাজগুলোতে ফ্যাসিবাদ আরো একবার সত্যিকারের রাজনৈতিক বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে এবং তার মূলোৎপাটনের জন্য যে রাজনৈতিক কর্মসূচী হাতে নিতে হবে তার জন্যে এর মৌলিক কাঠামোগুলোর বিষয়ে একধরনের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বেশ কয়েকটি কারণে কাজটি খুব একটা সহজ হবে না। তার মধ্যে একটি হলো ফ্যাসিবাদ, একটি যথেষ্ট জটিল প্রপঞ্চ। বাদবাকি অন্য সব কারণের মধ্যে উক্ত কারণেই একটি প্রপঞ্চ হিসেবে ফ্যাসিবাদের একটি দূর্বল ব্যাখ্যার তাত্ত্বিক দেউলিয়াত্ব সরাসরি রাজনৈতিক নপুংসকতার দিকে আমাদেরকে চালিত করে। তাছাড়া স্থানীয় নগর মিলনায়তনে যখন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (যুক্তরাজ্যে ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি উগ্র ডানপন্থী, ফ্যাসিবাদী ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনৈতিক দল— অনুবাদক) একত্র হচ্ছে, এমন পরিস্থিতিতে ফ্যাসিবাদের ইতিহাস ও তত্ত্ব সম্পর্কে সুলুক সন্ধানের মতো যথেষ্ট সময় সদাসর্বদা কারো হাতে নাও থাকতে পারে। একইভাবে ফ্যাসিবাদ মূলত কী তাৎপর্য বহন করে সে সম্পর্কে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার যে জরুরি কাজ, তার পরিবর্তে উক্ত রাজনৈতিক দলের পেছনে লেগে থাকার ব্যাপারটি একটি লোভনীয় বিকল্পে পরিণত হতে পারে। আবার, এই মুহূর্তে আমাদের সমাজে ফ্যাসিবাদকে আমরা কতটুকু গুরুত্বের সাথে নেব, সেটি জানা যেমন একটি সমস্যা, তেমনিভাবে যে পরিস্থিতির মধ্যে এটি ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে, তাকে খুব সুন্দরভাবে খারিজ করে দেওয়ার এবং বিপ্লবী সর্বহারা নেতৃত্ব গঠনের মাধ্যমে বুর্জোয়া রাষ্ট্রের ধ্বংসসাধন করার মতো বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে আসার জরুরি কার্যক্রমগুলো থেকে কারো রাজনৈতিক শক্তিকে একটি অধিকতর তাৎক্ষণিক কিন্তু বর্তমানে গঠনগত দিক থেকে তুলনামূলকভাবে কম নিয়ামক একটি বিষয়ের দিকে ধাবিত করার মাঝামাঝি একটি রাস্তা বের করাটাও একটি সমস্যা আকারে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। এই দিক থেকে ফ্যাসিবাদের বিষয়টি বরং যৌনতার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। উভয়ের ক্ষেত্রেই মানসিক বিকার ও স্বাভাবিক আচরণের মধ্যে পার্থক্য করা মুশকিল।

    টেরি ইগলটন

    মোটাদাগে বলা যায়, একচেটিয়া পুঁজিবাদী শাসনকে সবচেয়ে নির্বিঘ্নে ও অনায়াসে নিশ্চিত করার প্রয়াসই হলো ফ্যাসিবাদ। তবে এটা সত্য যে, একচেটিয়া পুঁজিবাদ এই ধরনে কাজ করতে চরমভাবে অনিচ্ছুক। বুর্জোয়া সমাজ তার উদার গণতন্ত্রবাদী মতাদর্শসমূহকে বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে নিতে গিয়ে প্রচুর পরিমাণে ঐতিহাসিক শক্তি খরচ করেছে। একই কারণে তারা স্বেচ্ছায় শ্রেণীসংগ্রামের এইসব বিস্তৃত মতাদর্শিক স্থিতাবস্থাকে ভেঙ্গে এমন একদল ছিন্নবস্ত্র সন্দেহবাতিকগ্রস্ত পাতিবুর্জোয়া ডাকাতদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা তুলে দিতে চাইবে না, যাদেরকে তারা এমনকি নিজেদের বাড়ির বসার ঘরেও সহ্য করতে রাজি নয়। বুর্জোয়া রাষ্ট্র শুধুমাত্র সর্বশেষ ও মরিয়া প্রচেষ্টা হিসেবে তার ‘মুক্তি’ ও শ্রেণী-ক্ষমতার গঠন প্রক্রিয়ায় অশুভ আঁতাতের মতো সমৃদ্ধ মতাদর্শগুলোকে পরিত্যাগ করে ব্রেখটিয়ান ভাবমূর্তি ধারণ করে সকল গোমর ফাঁস করে দেয়। এটি অবশ্যই বিপ্লবীদের জন্য একটি সুখবর হিসেবে হাজির হয়, কারণ এর মাধ্যমে তারা একটু দম নেওয়ার ফুরসত পায়। একজন বিপ্লবীর শেষ পর্যন্ত শুধুমাত্র একটি জিনিস নিয়েই শঙ্কিত হতে হয়। সেটি হলো সেনাবাহিনী। এছাড়া শেষের দিকে আর সবকিছুই গুরুত্বহীন। কিন্তু বুর্জোয়া রাষ্ট্র নিতান্ত বাধ্য না হলে একে ব্যবহার করে না। কারণ উক্ত কৌশল অবলম্বনের ফলে তার মতাদর্শিক গ্রহণযোগ্যতা যে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে, তার লোকসান বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই স্বল্পমেয়াদী রাজনৈতিক অর্জন দিয়ে পোষানো যায় না। (সেনাবাহিনীর ব্যবহার বলতে আমি স্বাভাবিকভাবেই বুঝিয়েছি পুঁজিবাদের নিজ আবাসভূমিগুলোতে তাদের ব্যবহারকে। মতাদর্শিকভাবে গ্রহণযোগ্য কোনো স্থানে তাদের নিয়োগ- যেমন আইরিশদের মতো ভিনগ্রহবাসীদেরকে নির্যাতনের জন্য তাদের ব্যবহারকে বোঝানো হয়নি)। এর বদলে আমাদের জন্য আছে পুলিশ, যারা খুব বেশি সুখকর না হলেও অন্তত অস্ত্রবিহীন। কিন্তু যদি বুর্জোয়া রাষ্ট্র সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করতে বাধ্য হয় তাহলে বিপ্লবীদের জন্য সেই দম নেওয়ার ফুরসতও থাকবে না। একচেটিয়া পুঁজিবাদ তার কর্তৃত্ব বজায় রাখতে এমন কোনো কাজ নেই যা সে করবে না। কেউ যদি এই বক্তব্যকে বামপন্থী সন্দেহবাতিক বলে উড়িয়ে দিতে চায় তবে তাকে বুকেনওয়াল্ডের (জার্মানিক ওয়েমার শহরের নিকটে অবস্থিত অন্যতম বৃহত্তম কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প (১৯৩৭-১৯৪৫)— অনুবাদক) ঘটনা স্মরণে রাখতে হবে।

    কোনো ঐতিহ্যবাহী বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলই ফ্যাসিবাদকে পুরোপুরি গ্রহণ করেনি। এ সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলো শুধুমাত্র ফ্যাসিবাদকে ব্যবহার করে নিজস্ব স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যেই এর সাথে সখ্যতার সম্পর্ক তৈরি করে এবং এক পর্যায়ে আবিষ্কার করে যে পাশার দান উল্টে গেছে। ফ্যাসিবাদ একচেটিয়া পুঁজিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের সামাজিক গণতন্ত্রবাদী সুশীলতার মুখোশ খুলে দিয়ে রাষ্ট্রের সাথে প্রভাবশালী সামাজিক শ্রেণীর মধ্যস্থতার হাতিয়ার হিসেবে আইনসভা ও রাজনৈতিক দলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে তুলনামূলক স্থূলভাবে ব্যবহার করতে থাকে, ফলে সম্পর্কটি প্রচন্ডভাবে দৃশ্যমান হয়ে পড়ে। বুর্জোয়া উদারবাদী শাসনের অধীনে তুলনামূলকভাবে স্বায়ত্তশাসন উপভোগকারী রাষ্ট্রীয় যন্ত্র হিসেবে পুলিশ ও সেনাবাহিনী ফ্যাসিবাদের কবলে পড়ে বিলুপ্ত হয়ে গিয়ে তারা প্রকৃতপক্ষে খোদ রাষ্ট্রের সাথে কিভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে তা প্রকাশ করে দেয়। এতকিছুর পরেও ফ্যাসিবাদ সামগ্রিকভাবে সমাজে পুঁজিবাদী কর্তৃত্ববাদের স্রেফ গায়ের জোরে চাপিয়ে দেওয়া কোনো জিনিস নয়। পুঁজিবাদের উদারনৈতিক ধরনটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শাসিতের সম্মতির সাহায্যে শাসন করে থাকে। ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা কার্যত একটি দাস সমাজ— যা আবার ধ্রুপদী দাস-সমাজ থেকেও পৃথক। অন্তত শুরুর দিকে হলেও ফ্যাসিবাদ ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়  আন্দোলন হিসেবে আবির্ভূত হয়। সমাজ কাঠামোর প্রত্যেকটি স্তরে এর শেকড় গভীরভাবে বিস্তৃত থাকে। এই দিক থেকে এটি মার্কসবাদে ‘বোনাপার্টবাদ’ (ফ্রান্সে প্রথম ও তৃতীয় নেপোলিয়নের সময়কালে চর্চিত রাজনৈতিক মতবাদ— অনুবাদক) বলে পরিচিত রাজনৈতিক মতবাদের চেয়ে ভিন্ন। ফ্যাসিবাদ মূলত ব্যাপক জনতুষ্টিবাদের সাথে পুশচিবাদের (আচানক সহিংতার উপর ভিত্তি করে সরকার পতনের পদ্ধতিমূলক মতবাদ— অনুবাদক) একটি প্রচন্ড সহিংস তাত্ত্বিক সংস্করণের সমন্বয়ে গঠিত মতবাদ। অন্যভাবে বললে, জার্মান রাষ্ট্রকে উৎখাত করার জন্য নাৎসিদের চর্চিত পদ্ধতি যদি কোনো এক বা একাধিক দিক থেকে জার্মান সাম্যবাদী দলের প্রচন্ড দুর্দিনেও তার উগ্র-বামপন্থী নীতিগুলোর সাথে মিলে যায়, তারপরও বিপরীতক্রমে সমগ্র জার্মান সমাজের চরমপন্থী সম্পৃক্ততা ছিল মূলত বিভিন্ন ধরনের ক্লাব, সমিতি ও সংঘজুড়ে পুরো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বলয়ে তৎকালীন জার্মান সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দলের বিস্তৃত ও শক্তভাবে প্রোথিত সামাজিক কর্পোরেটবাদের অনুরূপ।

    সুতরাং, ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তখনই যখন তার প্রয়োজন হয়। ১৯২৯ সালে জার্মান অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ে। ১৯৩০ সালে নাৎসি পার্টির সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি পায় ৮শ শতাংশ। ১৯৩২ সালে ২ কোটি জার্মান খয়রাতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তবে কিনা পুঁজিবাদের একটিমাত্র অর্থনৈতিক সংকটই কেবল ফ্যাসিবাদের জন্ম দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। এই সংকটের সাথে সাথে শ্রমিক শ্রেণীর পরাজয় এবং ভেঙ্গে পড়া মনোবল একত্র হয়ে ফ্যাসিবাদের উর্বর জমিন তৈরি করতে পারে। ১৯১৮-১৯১৯ সালে ক্ষণস্থায়ী জার্মান শ্রমিক প্রজাতন্ত্রকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার মাধ্যমে জার্মান ফ্যাসিবাদের গল্প শুরু হয় এবং এই গল্প এগোতে থাকে এসপিডি (সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল) ও চুলচেরা কট্টর বামপন্থী ভাঁড়দের দল কেপিডি (সাম্যবাদী দল) কর্তৃক জার্মান সর্বহারাদের একের পর এক বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়ার মাধ্যমে। ১৯২০ সালে ইতালিতে সর্বহারা বিদ্রোহের ব্যর্থতা এবং তার ফলস্বরূপ শ্রমিক শ্রেণীর প্রচন্ডভাবে ভেঙ্গে পড়া মনোবল শাসনকাঠামোর শূন্যতাকে ফ্যাসিবাদ দিয়ে পরিপূর্ণ করে দেয়, যেটি কিনা পূর্বে ছোট্ট পরিসরে বিস্তৃত থাকলেও পরবর্তীকালে বিপুল বিক্রমে সামনে এগোতে থাকে। ফ্যাসিবাদ হলো বুর্জোয়াদের সর্বহারা বিদ্রোহকে দমন করার ভীতিজনিত বিপরীত প্রতিক্রিয়া থেকে পাওয়া একটি উপজাত— এটি হলো একটি বিপজ্জনক বামপন্থী কুসংস্কার। বিপরীতে, শ্রমিক শ্রেণী যখন একটি বিকল্প বিপ্লবী শক্তির অভাবে সংস্কারপন্থী কোনো নেতৃত্বের দ্বারা বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে অসংগঠিত ও রক্ষণশীল অবস্থায় থাকে, ঠিক সে সময়ে একটি প্রচন্ড বুর্জোয়া আক্রমণের মধ্যেই ফ্যাসিবাদের প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত আছে। সুতরাং ফ্যাসিবাদের উপাদান একাধিক। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট, সর্বহারাদের পরাজয়, সমাজবাদী গণতন্ত্রের পরাজয়, বিপ্লবী নেতৃত্বের অভাব কিংবা অক্ষমতা।

    প্যান আমেরিক্যান ইউনিটি মুরাল
    শিল্পী: দিয়েগো রিভেরা

    রাজনৈতিকভাবে ফ্যাসিবাদ কোনো আলোচনা কক্ষ কিংবা কোনো কারখানার বারান্দায় উদ্ভাবিত হয় না। এটি উৎপন্ন হয় পাতিবুর্জোয়া কর্মচারীদের সারি থেকে। সর্বহারা শ্রেণীর সমপর্যায়ে কিংবা তারও নীচে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ভয়ে ভীত এবং একইসাথে মাথার উপরে অবস্থিত নির্বিষ শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহরত স্বল্প পুঁজি ও বিনিয়োগের মালিকদের বিভিন্ন দল যারা তাদের সঞ্চয়কে ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে যেতে দেখে, বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে ফ্যাসিবাদ তাদেরই একটি রাজনৈতিক পণ্য। জাতীয়তাবাদ, কৌলিন্যবাদ, কঠোর পরিশ্রম, মেধাতন্ত্র, শ্রমিক বিদ্রোহের ভীতি, দক্ষতার প্রতি শ্রদ্ধা, যুক্তিবাদ এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের অভ্যাস রপ্ত করতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পাতিবুর্জোয়া শ্রেণী ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়। বৃহৎ পুঁজির হুমকিতে অস্তিত্ব সংকটে ভোগা এই শ্রেণীটি বুর্জোয়া ও সর্বহারাদের মাঝখানে নিজেদেরকে ‘নিরপেক্ষ’ হিসেবে হাজির করে। বিক্ষিপ্ত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজেদের কেন্দ্রীভূত স্বভাবের কারণে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজস্ব বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করতে অক্ষম হয়ে নিজেদের শ্রেণী স্বার্থ চরিতার্থ করতে তাদের মধ্যে সমস্ত শ্রেণীবিভাজনের উর্ধে রাখা একটি ‘নিরপেক্ষ’ রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।

    অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা এবং ‘বৃহৎ’ পুঁজির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মধ্যে নিয়তির ফেরে আটকে পড়ে এবং বুর্জোয়া কিংবা সামাজিক গণতন্ত্রবাদী রাজনৈতিক যন্ত্র কোনো কিছুতেই নিজেদের প্রতিনিধিত্ব খুঁজে না পেয়ে নিজেদের চাহিদা বৃদ্ধির জন্যে ফ্যাসিবাদী দলে রূপান্তরিত হওয়া পাতিবুর্জোয়া শ্রেণীর অভ্যন্তরীণ সংকটজাত  হলো ফ্যাসিবাদ। অন্যান্য আরো অনেক বিষয়ের সাথে ফ্যাসিবাদের গল্প মূলত পাতিবুর্জোয়া শ্রেণীকে একটি লম্বা ও ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক ভ্রমণ এবং অস্বস্তিকর ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাওয়ার গল্প। অর্থনৈতিক সংকটে পড়া একচেটিয়া পুঁজিবাদের সমর্থনে পাতিবুর্জোয়া শ্রেণীর অস্পষ্ট ও মিশ্র মতাদর্শকে কাজে লাগিয়ে সর্বহারাদের সংগঠনগুলোকে দমন করার একটি হাতিয়ার হিসেবে ফ্যাসিবাদ এই শ্রেণীকে ব্যবহার করে। পাতিবুর্জোয়াদের সামনে ফ্যাসিবাদ নিজেকে জনপ্রিয় এবং ‘চরমপন্থী’ শক্তি হিসেবে হাজির করে যারা কিনা ‘অলস ধনী’ ও ‘সম্পদগর্বী’দের বিরুদ্ধে উক্ত শ্রেণীর বৈরিভাবাপন্নতার সাথে একাত্মতা পোষণ করে এবং সত্যিকারের ‘উৎপাদনশীল’ শ্রমিকদের (হোক তারা পুঁজিবাদী কিংবা সর্বহারা) গুণগ্রাহী হিসেবে আবির্ভূত হয়। একইসাথে, ফ্যাসিবাদ নিজেকে শৃঙ্খলা, গৌরব, ধার্মিকতা ও জাতিগত স্বর্ণযুগকালীন দেশজ মূল্যবোধের রক্ষাকারী ঐতিহ্যবাদী আন্দোলন হিসেবেও তুলে ধরে।

    অন্তত শুরুর দিকে হলেও ফ্যাসিবাদের ‘চরমপন্থা’ পুরোপুরি ধাপ্পাবাজির বিষয় ছিল না। দলের মধ্যে যারা নেতাদের ধনীদেরকে আঘাত করা বিষয়ক বাগাড়ম্বরকে গুরুত্বের সাথে নিয়ে ফেলেছিল, তাদের আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য তথাকথিত ‘নাইট অব দ্য লং নাইভস্’ জাতীয় বেশ কিছু অভিযান পরিচালনা করা নাৎসীদের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছিল। তবে ধ্রুপদী ফ্যাসিবাদের গতানুগতিক প্রক্রিয়া আরো জটিল। শাসক শ্রেণী শুরুর দিকে ফ্যাসিবাদকে ঘেন্না করে এবং খারিজ করে দেয়, পরবর্তীকালে রাজনৈতিক সংকটের সময় মাঝেমধ্যে একে ব্যবহার করে এবং পরিস্থিতির সাময়িক উন্নতি হলেই ছুঁড়ে ফেলে দেয়। সংকট যখন সমাধান হতে চায় না বরং বিপুলাকারে বৃদ্ধি পেতে থাকে, তখন এটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আর্থিক অনুদানরূপে বৃহৎ পুঁজির গোপন সমর্থন লাভ করতে থাকে। ফ্যাসিবাদের পরবর্তী পদক্ষেপ হলো নিজেকে একচেটিয়া পুঁজি ও পাতিবুর্জোয়াদের মধ্যবর্তী মৈত্রী হিসেবে হাজির করে, কিছুটা হলেও একটা চরমপন্থী চেহারা বানিয়ে, জনগণের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংসসাধন করে সেগুলোর জায়গায় রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান বানানোর কর্মযজ্ঞে তখনো সামান্য কিছু ছাড় দিয়ে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতা দখল করা। পাতিবুর্জোয়ারা শাসক শ্রেণীতে পরিণত হয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের নিজেদের লোকজন দিয়ে ভর্তি করতে থাকলেও একচেটিয়া পুঁজিবাদের প্রভাবশালী স্বার্থের ভিত্তিতেই শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকে। ক্ষমতা পাকাপোক্ত হওয়ার সাথে সাথে একদা পাতিবুর্জোয়া শ্রেণীর একগাদা অভাব অভিযোগে বিক্ষুব্ধ ফ্যাসিবাদ এই শ্রেণীস্বার্থকেই বিকিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। শেষপর্যন্ত পাতিবুর্জোয়া শ্রেণীর মতাদর্শকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে একচেটিয়া পুঁজিবাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে থাকা ফ্যাসিবাদ যে শ্রেণীর কাঁধে ভর দিয়ে ক্ষমতায় আরোহণ করে, সে শ্রেণীস্বার্থকেই পুরোপুরি জলাঞ্জলি দিয়ে দেয়।

    একচেটিয়া পুঁজিবাদের একটি তীব্র সাধারণ সংকট এবং সর্বহারা নেতৃত্বের দ্বৈত সংকটের মতো শাসকচক্রের নিজেদের মধ্যেই একটি বিশেষ ধরণের রাজনৈতিক সংকট হলো ফ্যাসিবাদের উত্থানের পেছনের ধ্রুপদী পূর্বশর্ত। শাসকচক্রের মধ্যে অবস্থানরত কোনো বিশেষ শ্রেণী কিংবা কোনো শ্রেণীর কোনো বিশেষ অংশই যখন একক আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না, তখন এদের কোনো একটি পক্ষের একক আধিপত্য কায়েমের ভিত্তিতে এই পরষ্পরবিরোধী অংশগুলোকে একসূত্রে গাঁথার জন্য একটি মধ্যস্থতাকারী শক্তির প্রয়োজন হয় যার যোগান দিতে পারে ফ্যাসিবাদ। এমন একটি পরিস্থিতিতেই ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটে। সমাজে প্রভাবশালী চক্রের মধ্যে একটি বিশেষ ধরনের পুনর্গঠনকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে এদেরকে একতাবদ্ধ করাই হলো ফ্যাসিবাদের ঐতিহাসিক অভিপ্রায়। উদাহরণস্বরূপ, ১০২০ এর দশকের জার্মানিতে একচেটিয়া পুঁজিবাদের দ্রুততর বিকাশের ফলে শাসক শ্রেণীর এই অংশের সাথে বিপুলাকার কৃষি-পুঁজির বিভিন্নমুখী দ্বন্দ্বের উদ্ভব ঘটে। সেখানে ফ্যাসিবাদের কাজ ছিল একচেটিয়া পুঁজিবাদের স্বার্থ রক্ষার ভিত্তিতে এইসমস্ত দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিরসন করা। ‘বৃহৎ’ ও ‘মাঝারি’ পুঁজির মধ্যে বিদ্যমান দ্বন্দ্ব নিরসনেও ফ্যাসিবাদ পূর্বোক্ত শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করেছিল। বাধ্যতামূলক চক্রায়ণ (কার্টেলাইজেশন), দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা, গণকর্মসংস্থান, যুদ্ধ অর্থনীতি এবং ফ্যাসিবাদের বাদবাকী অন্যসব অর্থনৈতিক কর্মসূচীগুলোর মাধ্যমে শাসক শ্রেণীর মধ্যে বিরাজমান অন্য সকল দল-উপদলের স্বার্থ-সুবিধা জলাঞ্জলি দেওয়ার বিনিময়ে লাভবান হয় বৃহৎ শিল্পপুঁজি। রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন এসমস্ত পুনর্গঠনের একমাত্র মাধ্যম হওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত একচেটিয়া অর্থায়ননির্ভর পুঁজিবাদই মূলত প্রভাবশালী ‘উচ্চতা’য় উপনীত হয়। ইতালিতে ফ্যাসিবাদ কৃষিপুঁজির উপর শিল্পপুঁজির প্রভাব বিস্তার নিশ্চিত করতে কাজ করেছিল। ইতালির ফ্যাসিবাদী দল ছিল মূলত সে দেশের উন্নত উত্তরাঞ্চলের একটি পণ্য যেটি কিনা কৃষিনির্ভর দক্ষিণাঞ্চলের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছিল।

    জার্মানির মর্তাদর্শিক পরিস্থিতিগুলো ফ্যাসিবাদের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক ছিল। বিসমার্কবাদী ‘উপর থেকে উপুড় করে দেওয়া বিপ্লব’ এর মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা জার্মান বুর্জোয়া শ্রেণী কখনোই তাদের নিজস্ব মতাদর্শ উৎপাদন করার মাধ্যমে তাদের শাসনকে পাকাপোক্ত করতে পারেনি।  বুর্জোয়া উদারবাদী মতাদর্শের জায়গায় জার্মানরা ফ্যাসিবাদে রূপান্তরযোগ্য জঙ্গিবাদী উপাদানসমেত ঈষৎ পরিবর্তিত একটি সামন্তবাদী মতাদর্শ উৎপাদন করেছিল। জার্মান পাতিবুর্জোয়া শ্রেণী মতাদর্শিকভাবে পিছিয়ে ছিল। ঐতিহ্যগতভাবে কুলীন বুর্জোয়াদের উপর নির্ভরশীল এই শ্রেণী তাদের ফরাসি সঙ্গীসাথীদের জ্যাকববাদের সাথে শক্তিসামর্থ্যের দিক থেকে তুলনীয় কোনো মতাদর্শের জন্ম দিতে পারেনি। তারপরও এইসব মতাদর্শের উপাদানসমূহ খুবই অদ্ভূতভাবে ফ্যাসিবাদের হাতের মুঠোয় চলে যাওয়ার জন্য পুরোপুরি উপযোগী ছিল। রাষ্ট্রপূজা, ‘গুরু’ভক্তি, আক্রমণাত্মক জাতীয়তাবাদ, কৃর্তত্ববাদ এবং ‘যন্ত্রবাদী’ আদর্শবাদসমেত জার্মান পাতিবুর্জোয়া মতাদর্শ বহু দিক থেকেই ধ্রুপদী বুর্জোয়া উদারবাদের চেয়ে একচেটিয়া সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদের মতাদর্শিক চাহিদা মেটানোর জন্য অধিকতর উপযোগী ছিল। উদাহরণস্বরূপ, শ্রেণীগত পরিভাষার বদলে বরং ‘দেশীয়’ পরিভাষায় পরিচিত হতে চাওয়া ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী ছিন্ন বিচ্ছিন্ন পাতিবুর্জোয়া শ্রেণীর মতাদর্শিক অবস্থাগুলোর সাথে পরিবার বিষয়ক ফ্যাসিবাদী সংস্কার মিলে যায়। কিন্তু এসমস্ত মতাদর্শগুলো কর্পোরেটবাদ, কর্তৃত্ববাদ ও মর্যাদাক্রমের যে প্রতিচ্ছবি নির্মাণ করেছিল, সেটি খুব পরিষ্কারভাবেই একচেটিয়া পুঁজিবাদের রাজনৈতিক চাহিদাগুলো মেটানোর জন্য উপযুক্ত ছিল। সুতরাং, এটা বলা যায় যে, ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ মূলত নিম্ন মধ্যবিত্তের মতাদর্শের সাথে যূথবদ্ধ এবং সেটি দ্বারা প্রভাবিত একটি বিশেষভাবে রূপান্তরিত একচেটিয়া সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদী মতাদর্শ।

    পুঁজিবাদ থেকে উত্তীর্ণ হওয়া ‘আমলাতান্ত্রিক যৌথতা’ই হলো ফ্যাসিবাদ— এই ধরনের রক্ষণশীল ও উদারবাদী কিংবদন্তীকে নাকচ করাটা গুরুত্বপূর্ণ। জার্মানি ও ইতালীয় শিল্প-কারখানায় তৎকালীন ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিষয়টি বর্তমানে পশ্চিমে যা হচ্ছে তার চেয়ে সম্ভবত ভিন্ন কিছু ছিল না। তৎকালীন জার্মানির বেশিরভাগ শিল্পকেই জাতীয়করণ করা থেকে বিরত ছিল নাৎসিরা। বেসরকারি খাতের তুলনায় তাদের রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাবসা-বাণিজ্যের অবস্থারও ব্যাপক অবনতি ঘটেছিল। ফ্যাসিবাদ বিষয়ে ফ্রানজ্ ন্যুমান তার ধ্রুপদী গ্রন্থ বেহেমথ-এ লিখেছেন, ফ্যাসিবাদ হলো ‘একটি সর্বগ্রাসী রাষ্ট্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি বেসরকারি পুঁজিবাদী অর্থনীতি’। জার্মানিতে ওয়েমারের সময়কালে ক্রমবর্ধমান একচেটিয়া পুঁজিবাদ ও চক্রায়ণকে (কার্টেলাইজেশন) যৌক্তিকভাবে অনুসরণকারী এবং সমসাময়িক পুঁজিবাদের পরিকল্পিত কর্পোরেট অর্থনীতির অগ্রদূত হিসেবে একে দেখা যেতে পারে। সমাজকে বিশ্ববাজার থেকে বিছিন্ন করে বৈদেশিক বাণিজ্য এবং পণ্য উৎপাদনের খরচ ও দাম নির্ধারণে রাষ্ট্রের একক আধিপত্য কায়েমের মাধ্যমে একটি বদ্ধ অর্থনীতি নির্মাণের মতলব নিয়ে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার নিয়মিত তত্ত্বাবধায়কে পরিণত হয়। এমন সুরক্ষা নীতি গ্রহণের অনিবার্য ফল হিসেবে একদা বিধ্বস্ত অর্থনীতি সেরে ওঠে এবং এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে সেটি তার কঠোর জাতীয় সীমানায় আবদ্ধ থাকতে পারে না। এর ফলে ঘটে সাম্রাজ্যবাদী বিস্তার। কিন্তু এইধরনের বিস্তার অবশ্যই স্রেফ ফ্যাসিবাদী ‘দুর্ঘটনা’ নয়। ফ্যাসিবাদ স্রেফ সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের প্রস্তুতির উদ্দেশ্যে সব জাতীয় বাহিনী, শ্রেণী ও সম্পদগুলোর জঙ্গিবাদী কেন্দ্রীভূতকরণ ছাড়া আর কিছুই নয়।

    এই প্রস্তুতি গ্রহণের সাথে ইহুদিবিদ্বেষ ও জাতিবাদের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে পরিবর্তনশীল। নাৎসিবাদের ক্ষেত্রে এই সম্পর্কটি সত্য ছিল। সেখানকার অভ্যন্তরীণ শ্রেণীসংগ্রাম থেকে দৃষ্টি সরিয়ে জাতীয় কর্পোরেটবাদ এবং সেখান থেকে আন্তর্জাতিক আগ্রাসনে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যম হিসেবে ইহুদি ও বিদেশীদেরকে নির্বাচন করা হয়েছিল। আদর্শিক পর্যায়ে সকল ফ্যাসিবাদেই শ্রেষ্ঠত্ববাদী কর্পোরেটবাদ হাজির থাকলেও অর্থনৈতিক লক্ষ্যসমূহের দিক থেকে ‘ধ্রুপদী’ ফ্যাসিবাদের কাতারভুক্ত না হওয়া আইবেরীয় ফ্যাসিবাদসমূহের এ জাতীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদ প্রকাশে জাতিবাদী পরিভাষাগুলো ব্যবহার করতে হয়নি (১৯৩২ সালে ইতালিতে প্রধান ইহুদী ধর্মগুরু ফ্যাসিবাদী দলের সদস্য ছিলেন)।

    তবে সকল ফ্যাসিবাদী গঠনই তার আদর্শিক স্তরে ব্যাপকভাবে ‘তুলনামূলক স্বায়ত্ত্বশাসন’ বজায় রাখে। উদাহরণস্বরূপ, নাৎসি জার্মানির যুদ্ধ-অর্থনীতিতে পোলিশ ধাতুশ্রমিকদের সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে উপেক্ষা করে মতাদর্শিক কারণে তাদেরকে নির্মূল করা হয়েছিল। একইভাবে সেখানে অতিরিক্ত শ্রমশক্তি যখন প্রচন্ড প্রয়োজন ছিল, সে সময়েও জার্মান গৃহিণীদের গৃহবন্দী রাখার সংস্কার মেনে তাদেরকে কারখানার বাইরে রাখা হয়েছিল। তার উপর ‘শেষ সমাধান’-এ আসার জন্য প্রয়োজনীয় জটিল ও ব্যয়বহুল কলকব্জার মধ্যে যানবাহন ও বিভিন্ন সম্পদ অন্তর্ভূক্ত ছিল, যেগুলোকে বিকল্প হিসেবে ব্যাপকভাবে যুদ্ধের কাজেও ব্যবহার করা যেত। বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থগুলোকে বৈধতা দেওয়া সংশ্লিষ্ট সকল মতাদর্শিক গঠনের মধ্যে কিছুমাত্রায় তুলনামূলক স্বায়ত্ত্বশাসন বজায় রাখা হয়। কিন্তু ফ্যাসিবাদের ক্ষেত্রে এটি অনেক বেশি সত্য। একই কারণে একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র যে শ্রেণীস্বার্থের মতব্বরি করে তার বিপরীতে এর মতাদর্শিক গঠনের তুলনামূলক স্বায়ত্ত্বশাসন অনেক বেশি থাকে এবং সেটা দরকারও, কারণ এর কাজই হলো শাসকচক্রের মধ্যে হস্তক্ষেপ করে এর অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ‘শ্রেণীসমূহ’-কে পুনর্বিন্যস্ত করা। একচেটিয়া পুঁজিবাদের সরাসরি ‘প্রতিনিধি’ কিংবা স্রেফ একটি ‘হাতিয়ার’ হিসেবে একে ব্যাখ্যা করা যায় না। নাৎসিরা কেবল এসব স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার ছিল না বরং এসকল স্বার্থের জন্য স্বল্পমেয়াদে ক্ষতিকারণ বিভিন্ন নীতিও অনুসরণ করত। কিন্তু শেষপর্যন্ত ফ্যাসিবাদের সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্যগুলোর সাথে একচেটিয়া পুঁজিবাজী মতলবের মধুর মিলন ঘটেছিল।

    নাৎসী পোস্টার

    ধ্রুপদী ফ্যাসিবাদ থেকে আমরা কোন রাজনৈতিক শিক্ষা লাভ করি? আমরা জানি যে, ফ্যাসিবাদের মৌলিক নীতিই হলো অনুকূল পরিবেশে এটি প্রচন্ড দ্রুততার সাথে বিকশিত হতে পারে। কিন্তু কোন পরিস্থিতিগুলো হিটলারকে ক্ষমতায় এনেছিল সেটি আরো সুনির্দিষ্ট ও নির্ভুলভাবে আমাদেরকে নির্ধারণ করতে হবে। কেউ যদি জার্মান ফ্যাসিবাদের উত্থান কেন ঘটেছিল তার উত্তর একশব্দে জানতে চায়, তাহলে তুলনামূলকভাবে কম খারাপ হবে এই উত্তর দেওয়া যে: স্ট্যালিন। ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে সাম্যবাদী আন্তর্জাতিকের উদ্ভট ধরনপ ভুল ব্যাখ্যাই এর সফলতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক ছিল। ‘কুলীন শ্রমিক শ্রেণী’র তুলনামূলক প্রাচুর্যের মধ্যে জন্ম নেওয়া এবং প্রগতিশীল পুঁজিবাদের পতনের সাথে সাথে ভেঙ্গে খন্ড খন্ড হয়ে যাওয়া একগুচ্ছ দিবাস্বপ্ন বলে আখ্যা দেওয়া সামাজিক গণতন্ত্রবাদ শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে কিভাবে কাজ করে, সাম্যবাদী আন্তর্জাতিক সেটি বুঝতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল। সংকীর্ণ ‘অর্থনীতিবাদ’ ও ‘আকস্মিকতাবাদ’ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে সরল মনের এই ‘তত্ত্ব’টি সামাজিক গণতন্ত্রবাদী দলগুলো (বুর্জোয়া রাজনীতিতে অভ্যস্ত ও শ্রমিক শ্রেণীর সমর্থনপুষ্ট) যে রাষ্ট্র নামক দেহের স্রেফ মলমূত্র নয় বরং সর্বহারা শ্রেণীকে রাজনৈতিক ও মতাদর্শিকভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্যে কাঠামোগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ—এই সত্যকে অবহেলা করেছিল। ফ্যাসিবাদ ও সামাজিক গণতন্ত্রবাদকে একচেটিয়া পুঁজিবাদী শাসনের স্রেফ দুটি ভিন্ন হাতিয়ার হিসেবে আখ্যা দিয়ে সাম্যবাদী আন্তর্জাতিক সামাজিক গণতন্ত্রবাদকে ‘সামাজিক ফ্যাসিবাদ’ বলে অভিহিত করেছিল। ফ্যাসিবাদকে একটি মধ্যবর্তী অবস্থা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে তারা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে অন্তর্গত বিরোধসমূহের ফলেই তার পতন ঘটবে এবং ঘটনাক্রমে সেটি পুঁজিবাদের অন্তর্গত বিরোধগুলোকেও শেষ সীমার দিকে ঠেলে দিবে। একইভাবে জার্মান ফ্যাসিবাদ সর্বহারা বিপ্লবকেও ত্বরান্বিত করবে। নাৎসিদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা জার্মান সাম্যবাদীরা সত্যিকারের শত্রু সামাজিক গণতন্ত্রবাদীদেরকে উৎখাতের ঘোষণা দিয়েছিল। নাৎসিদের ক্ষমতা দখলের বিষয়ে ‘সাংবিধানিক’ বিরোধিতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সামাজিক গণতন্ত্রবাদী নেতৃত্বের বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়া এবং জার্মান সাম্যবাদী দলকে ‘ফ্যাসিবাদী’ সামাজিক গণতন্ত্রবাদীদের সাথে কোনো জোটে না যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া সাম্যবাদী আন্তর্জাতিকের কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়া জার্মান সর্বহারা শ্রেণী হিটলারের উত্থানের পূর্বে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েছিল। সামাজিক গণতন্ত্রবাদ বুর্জোয়াদেরকে শ্রমিক শ্রেণীর হাত থেকে রক্ষা করেছিল। পরবর্তীকালে সামাজিক গণতন্ত্রবাদের হাত থেকে বুর্জোয়াদেরকে রক্ষা করেছিল ফ্যাসিবাদ।

    এসব কিছু থেকে রাজনৈতিক শিক্ষাটা ছিল পরিষ্কার। শুধুমাত্র একটি সংগঠিত এবং বিপ্লবী শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনই কেবল ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করতে পারে। তবুও আজকের পশ্চিমা সর্বহারা শ্রেণী অন্য যে-কোনো সময়ের তুলনায় গভীরভাবে বুর্জোয়া মতাদর্শিক দূষণের শিকার। ফ্যাসিবাদী আন্দোলনগুলোর শক্তির ব্যাপারে অবশ্য অতিরঞ্জিত ধারণা পোষণ না করাটাও গুরুত্বপূর্ণ। পাতিবুর্জোয়া, কৃষক, বেকার এবং ছিন্নমূল গোষ্ঠী ও শ্রেণীর মতো যে-সকল শ্রেণী ও বর্গকে ফ্যাসিবাদ কাছে টানে, তাদেরকে সংগঠিত করা একটি প্রচন্ড দুঃসাধ্য কাজ। প্রথম পরাজয়েই সংশ্লিষ্ট আন্দোলনের পতন ঘটার জন্য তারা প্রায়শই দায়ী থাকে। অন্যদিকে, কারখানার সুসংগঠিত শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে ফ্যাসিবাদ খুব কম সময়েই সরাসরি প্রবেশ করতে পারে। নিজেদেরকে শ্রমিকদের দল বলে নাৎসিদের যে দাবি, সেটি কোনো নির্বাচনী পরিসংখ্যান থেকে উঠে আসেনি। ১৯২৬ সালের সাধারণ ধর্মঘটে বিশাল বিপর্যয় এবং পরবর্তী বছরগুলোর অর্থনৈতিক মন্দাবস্থায় ভেঙ্গে পড়া মনোবল নিয়েও ১৯৩০ এর দশকে ইংরেজ শ্রমিক শ্রেণী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দারুণভাবে লড়ে গেছিল। (প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশ পুঁজিবাদকে ফ্যাসিবাদের আশ্রয় নিতে না হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল ইংরেজ সর্বহারাদের এই ভেঙ্গে পড়া মনোবল। সর্বহারাদের রাজনৈতিক দূর্বলতাকে পুঁজি করে ফ্যাসিবাদ দাঁড়িয়ে থাকলেও তাদেরকে অর্থনৈতিক শক্তি যুগিয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভাঙতে হয় ফ্যাসিবাদের। ব্রিটেনের বিপরীতে জার্মানিতে তখনো বিষয়টি বিবেচনাধীন ছিল)। ন্যাশনাল ফ্রন্টের মতো আজকের ব্রিটিশ ফ্যাসিবাদী দলগুলো এখনো প্রান্তিক, একদিকে কট্টর নাৎসিবাদ, অন্যদিকে নির্বাচনী মর্যাদা নিয়ে অর্ন্তদ্বন্দ্বে দ্বিধাবিভক্ত। এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার কাজটি অবশ্যই সুনির্দিষ্ট। ফ্যাসিবাদী সংগঠন, সমাবেশ ও প্রচারণাকে অবশ্যই প্রতিরোধ করতে হবে। আমাদের একটি বিষয়ে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত যে, আমরা এমন একটি সমাজে বসবাস করি যেখানে জনপরিসরে খোলামেলা যাচ্ছেতাই বলার সুযোগ নাই। জনসম্মুখে কেউ জাতিগত ঘৃণা ছড়ালে সে অপরাধে তার শাস্তি হতে পারে- অন্তত এটি নিয়েও শুরু করা যায়। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম একইসাথে এই মতাদর্শ উৎপাদনকারী সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধেও সংগ্রাম। বিপ্লবী নেতৃত্ব গঠনের সমস্যার সাথেও এই সংগ্রাম যুক্ত। ফ্যাসিবাদ যেমন প্রধান শত্রু নয়, একইসাথে এটি উপেক্ষণীয়ও নয়। বামপন্থীদের কিছু অংশের মধ্যে ‘ফ্যাসিবাদী’ শব্দের আবেগমূলক এবং অসতর্ক ব্যবহার যদি বিপজ্জনক রাজনৈতিক ধোঁয়াশাও হয়ে থাকে, তবে এটি আমাদের এটাও মনে করিয়ে দেয় যে, বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে ফ্যাসিবাদ খুব বেশি অষ্পষ্ট নয়।

  • ডেভিড ওয়েনগ্রোর সঙ্গে অ্যারন বাস্তোনির আলাপচারিতা ।। আদি মানব ইতিহাস সম্পর্কে আমরা যা কিছু জানি বলে মনে করি, তার সবই ভুল

    ডেভিড ওয়েনগ্রোর সঙ্গে অ্যারন বাস্তোনির আলাপচারিতা ।। আদি মানব ইতিহাস সম্পর্কে আমরা যা কিছু জানি বলে মনে করি, তার সবই ভুল

    • অনুবাদ: স্বাধীন সেন
    ডেভিড গ্রেয়বার ও ডেভিড ওয়েনগ্রো
                                                                                                             উৎস: দিজ টাইমস

    অ্যারন বাস্তানি (Aaron Bastani): ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ আসলে ইতিহাসের সেই অতি সুদূর অতীতকাল নিয়ে কাজ করছে যার প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ আমাদের হাতে আছে। বইটা ওই সময়টাকে এমনভাবে তুলে ধরতে চাইছে যেন সেখানে জ্যান্ত আর রক্তমাংসের মানুষ বাস করত। শুনতে হয়তো কথাটা খুব অদ্ভুত শোনায়, কিন্তু সত্যি বলতে ইতিহাসচর্চায় এমনটা সচরাচর করা হয় না। জানেন তো, প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষদের আমাদের মতো বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখার বদলে বরং মানবেতর প্রাইমেটদের সঙ্গেই বেশি তুলনা করা হয়। একবার ভেবে দেখুন তো, মানব ইতিহাস নিয়ে আমাদের জানা সবকিছুই যদি ভুল প্রমাণিত হয়? আমাদের যে প্রচলিত জ্ঞান (Received wisdom) মেনে নিতে শেখানো হয়েছে, তা অনুযায়ী পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব প্রায় দুই-তিন লক্ষ বছরের; কিন্তু আমরা কৃষিকাজ শুরু করেছি মাত্র গত ১০ থেকে ১২ হাজার বছর আগে। মনে করা হয় যে, এই কৃষিকাজ শুরুর পরেই শহর, জ্যোতির্বিদ্যা, সংখ্যা আর আমাদের চেনা এই সভ্যতার জন্ম হয়েছে।

    কিন্তু ডেভিড ওয়েনগ্রো আর সম্প্রতি প্রয়াত ডেভিড গ্রেবারের বই বলছে যে, এই তথ্যটা আসলে পুরোপুরি সঠিক নয়। তাঁরা বলছেন, আমরা যাকে শহর বা ‘উন্নত মানব সংস্কৃতি’ বলে বিচার করি, তা আসলে কৃষিকাজ প্রবর্তনেরও আগের ঘটনা। প্রাগৈতিহাসিক এই আখ্যানটি আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি জটিল এবং চমকপ্রদ—আর এর রাজনৈতিক তাৎপর্যও কিন্তু অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। ডেভিড ওয়েনগ্রো, আপনাকে ‘ডাউনস্ট্রিম’-এ স্বাগত জানাই।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো (David Wengrow): আমাকে ডাকার জন্য ধন্যবাদ।

    অ্যারন বাস্তানি: আপনি একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ। বর্তমানে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে (UCL) প্রত্নতত্ত্ব পড়াচ্ছেন। ছোটবেলায় কি আপনি এটাই হতে চেয়েছিলেন?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: না, একদমই না। স্কুল ছাড়ার পর আমি আসলে থিয়েটার করতে চেয়েছিলাম। সত্যি বলতে, তখন আমি বেশ খানিকটা অভিনয়ও করেছি। প্রায় ১৪ বছর বয়স থেকেই আমি মঞ্চ আর অভিনয়ের প্রেমে পড়ে যাই। আমি ‘ন্যাশনাল ইয়ুথ থিয়েটারে’ যোগ দিয়েছিলাম—সেটা ছিল একটা দারুণ সময়। কারণ লন্ডনের বাসিন্দা হিসেবে তখনই আমি প্রথম সারা দেশের, অর্থাৎ পুরো যুক্তরাজ্যের নানা প্রান্তের মানুষের সাথে মেলামেশার সুযোগ পাই। স্কুল শেষ করার পর একজন এজেন্টও জুটিয়ে ফেললাম এবং কিছুদিন ওটা নিয়ে মেতে থাকলাম। এরপর আরও নানা কাজ করেছি। বলতে পারেন, প্রত্নতত্ত্বের জগতে আমার পা রাখাটা ছিল অনেকটা দুর্ঘটনাবশত।

    অ্যারন বাস্তানি: বলেন কী! শিশু অভিনেতা থেকে প্রত্নতত্ত্ববিদ—শুনতে তো দারুণ একটা গল্পের মতো লাগছে।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: আসলে আমি ঠিক শিশু অভিনেতা ছিলাম না, বলা যায় ‘ইয়াং অ্যাডাল্ট অ্যাক্টর’। আমি শিশু অভিনেতাদের দেখেছি, তারা অন্য ধাতুর মানুষ হয়—আমি ঠিক তেমন ছিলাম না। তো যা বলছিলাম, সাংবাদিকতার দিকেও সামান্য ঝোঁক ছিল—বিবিসি অ্যারাবিক সার্ভিসে কাজ করা বা এই জাতীয় কিছু নিয়ে ভাবছিলাম। কিন্তু আসলে ঠিক কোনো দিশা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। স্কুলে রেজাল্ট ভালো ছিল, তাই ভাবলাম অক্সফোর্ডে আবেদন করব। আমার মাথায় তখন কেবল অক্সফোর্ড ঘোরপাক খাচ্ছিল। আমি অক্সফোর্ডের সব কলেজেই ইংরেজি সাহিত্যের জন্য চিঠি লিখলাম, কিন্তু কেউ পাত্তাই দিল না।

    তখন আমার এক বন্ধু বলল, “এই ধরণের জায়গায় ঢোকার সহজ উপায় হলো একটু ‘অপ্রচলিত’ কোনো বিষয় বেছে নেওয়া।” ওরা তখন মাত্র ‘প্রত্নতত্ত্ব ও নৃবিজ্ঞান’ নামে একটা নতুন কোর্স চালু করেছে—মজার ব্যাপার হলো, বর্তমানে ইউসিএলে আমি এই বিভাগটাই সমন্বয় করি। তো, আমি হ্যারিস কলেজে ওই কোর্সের জন্য আবেদন করলাম এবং ইন্টারভিউয়ের সুযোগ পেলাম। ইন্টারভিউ নিতে বসলেন বারবারা কেনেডি নামের এক দুর্ধর্ষ নারী। তিনি আসলে ভূগোলবিদ ছিলেন, কারণ ওই কলেজে তখন কোনো প্রত্নতত্ত্ববিদ ছিলেন না। তিনি আমাকে বেশ জেরা করলেন। আমিও প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে আমার ‘বিশাল প্যাশন’ নিয়ে অনেক বড় বড় বুলি ঝাড়লাম। হুট করে তিনি তাঁর চেয়ারের নিচ থেকে একগাদা চিঠি বের করলেন—সেইসব চিঠি যা আমি অন্য কলেজগুলোতে ইংরেজি পড়ার জন্য লিখেছিলাম। আমি তো ভাবলাম, সব গুবলেট করে ফেলেছি! কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আমাকে ভর্তি করে নিলেন।

    শুরুতে আমি একজন ‘ম্যাচিউর স্টুডেন্ট’ হিসেবে ভর্তি হলাম, যদিও মানসিকভাবে তখনো অতটা পরিণত ছিলাম না। শুরুতে সবকিছু প্রায় জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ফেলেছিলাম এবং ছয় মাস পর আমার বের হয়ে যাওয়ার দশা হয়েছিল। কিন্তু তখনই একজনের সাথে দেখা হলো যিনি আমার পুরো চিন্তাটাই বদলে দিলেন। আসলে জীবনে এমন একজন মানুষের প্রয়োজন হয় যিনি আপনাকে নেশা ধরিয়ে দেবেন এবং এই আত্মবিশ্বাস দেবেন যে—হ্যাঁ, এই বিষয়ে আপনারও কিছু দেওয়ার আছে। তিনি ছিলেন অ্যান্ড্রু শেরাড। খুব অল্প বয়সে—মাত্র ৫৯ বছর বয়সে তিনি মারা যান, অনেকটা ডেভিডের (গ্রেবার) মতোই। অ্যান্ড্রুই আমাকে প্রত্নতত্ত্বের নেশায় বুঁদ করে দিয়েছিলেন, এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

    অ্যারন বাস্তানি: আসলে আমরা তো সবসময়ই শুনি যে, ছোটবেলায় কমবেশি সব শিশুই একসময় প্রত্নতত্ত্ববিদ হওয়ার স্বপ্ন দেখে।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, মনের কোণে হয়তো কিছু একটা ছিলই। ওল্ড সেরামের একটা স্কুল ট্রিপের কথা আমার খুব মনে পড়ে—সেটা ছিল লৌহ যুগের এক বিশাল পাহাড়ি দুর্গ। সেখান থেকে ফিরে আসার পর আমার মাথা জুড়ে কেবল সেইসব ছবিই ঘুরছিল। আমি যেন চোখের সামনে সেই প্রাচীন অভিবাসন আর আক্রমণের দৃশ্যগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম। কম্পিউটারের যুগ আসার অনেক আগের কথা বলছি; আমি একটা ক্যালিগ্রাফি পেন দিয়ে সেই অভিজ্ঞতার একটা আস্ত খাতা বা পাণ্ডুলিপি লিখে ফেলেছিলাম। মনে আছে, কাগজটাকে পুরনো লুক দেওয়ার জন্য আমার দাদি কফির গুঁড়ো দিয়ে কাগজটা হলদেটে করতে আমাকে সাহায্য করেছিলেন। কোনো একটা ঐতিহাসিক যুগ বা সময়ের প্রতি এমন একটা টান অনুভব করাটা আসলে পুরোপুরি যুক্তি দিয়ে বিচার করা যায় না। ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে আমার পারিবারিক কোনো শিকড় নেই, তাই এটা কোনো আঞ্চলিক টানও নয়। কিন্তু কেন জানি স্রেফ একটা বিশেষ সময় বা ইতিহাসের কোনো এক পরিপ্রেক্ষিতের প্রতি আপনার মনে এক গভীর মায়ার তৈরি হয়। যারা প্রত্নতত্ত্বকে পেশা হিসেবে বেছে নেন, তাদের মধ্যে হয়তো এই ‘নেশা’র মাত্রাটা একটু বেশিই থাকে।

    অ্যারন বাস্তানি: আপনার বই ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ (The Dawn of Everything)-এর মূল প্রসঙ্গে আসি। প্রচলিত জ্ঞান হলো, মানুষ পৃথিবীতে আছে প্রায় দুই-তিন লক্ষ বছর ধরে। আপনি উত্তরে সুনির্দিষ্ট সংখ্যাটা বলতে পারেন। তবে আমরা কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছি মাত্র ১২ হাজার বছর—কিংবা ১১-১২ হাজার বছর আগে। বলা হয় যে, কৃষির আগমনের ফলেই নগর, সংখ্যা দিয়ে গণনা, লিখন পদ্ধতি, জ্যোতির্বিদ্যা আর আমাদের চেনা সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে। আপনার এবং সম্প্রতি প্রয়াত ডেভিড গ্রেবারের যৌথভাবে লেখা বইটা বলছে যে, এই ধারণা পুরোপুরি ভুল অথবা অন্তত বড় রকমের ভুল আছে এতে।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: দেখুন অ্যারন, আপনি যা বললেন সেগুলোকে একটু খুঁটিয়ে দেখা দরকার। জানেন তো, আপনি যখন বলছেন যে ১২ হাজার বছর আগে আমরা কৃষিকাজ শুরু করেছিলাম, তখন আসলে পৃথিবীর খুব অল্প কিছু মানুষ সুনির্দিষ্ট কিছু জায়গায় সেটা শুরু করেছিল। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে (Middle East), যেটাকে অনেকে ফারটাইল ক্রিসেন্ট (Fertile Crescent) বলেন। সেই সময়েও বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষই ছিল শিকারী ও সংগ্রাহক এবং মৎস্যজীবী। আসলে আপনি যেটা সংক্ষেপে বললেন, সেটা হলো আমাদের সেই চেনা ‘যুগবিভাজনের তত্ত্বর’ (Stage Theory) একটা ধ্রুপদী উদাহরণ। এখানে দেখানো হয় যে, দীর্ঘ সময় ধরে তেমন কিছুই ঘটছে না, তারপর হঠাৎ সবকিছু বদলে গেল—কৃষি বিপ্লব হলো, জনসংখ্যা বাড়ল, তারপর নগর এলো এবং আবারও সব বদলে গেল। তারপর এলো সভ্যতা। আমরা বইটাতে এটাই দেখানোর চেষ্টা করেছি যে, এই পুরো প্রক্রিয়াটা আসলে এর চেয়ে অনেক বেশি কৌতূহলোদ্দীপক। ইতিহাসের তথাকথিত ভিন্ন ভিন্ন পর্যায় বা ধাপের মানুষগুলো আসলে একদম পাশাপাশি বসবাস করত। তারা একে অপরের থেকে রসদ নিত, একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাত এবং ভিন্ন ভিন্ন মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে সচেতনভাবে সমাজ গঠন ও নকশা করত। জানেন তো, সভ্যতা আর আধুনিকতা নিয়ে আলোচনার সময় আমাদের মনে এক ধরণের বদ্ধমূল ধারণা কাজ করে। আমরা ভাবি যে কেবল আমরা এই আধুনিকরা, বা তথাকথিত আধুনিকরা—মানে এই যে আলোকায়ন পরবর্তী মানুষ—তারাই কেবল সিদ্ধান্ত নিতে পারি যে আমরা কেমন সমাজে বাস করতে চাই। তারপর সচেতনভাবে সেই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করি। আমি মনে করি, ইউরোপীয় ঐতিহ্যে বামপন্থী বা ডানপন্থী—উভয় তাত্ত্বিক, দার্শনিক ও রাজনৈতিক ধারাতেই এই ধারণাটা গভীরভাবে গেঁথে আছে। কিন্তু আমাদের মতে এটা ভুল। আপনি যেমনটা বললেন, মানুষ পৃথিবীতে আছে প্রায় দুই থেকে তিন লক্ষ বছর ধরে—যাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা একদম আপনার আর আমার মতোই। তাদের মস্তিষ্ক আমাদের মতোই এবং তারা আমাদের মতোই কথোপকথন চালিয়ে যেতে পুরোপুরি সক্ষম ছিল। অথচ সেই সুদীর্ঘ সময়ের খুব সামান্য অংশ সম্পর্কেই আমরা জানি। একবার ভেবে দেখুন তো, এটা কত অসাধারণ একটা ব্যাপার! কত কিছু ঘটতে পারত সেই সময়ে, কত ধরণের কথোপকথন আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা হতে পারত! অথচ আমরা শুরুর সেই সময়গুলো নিয়ে লেখার সময় বা সেগুলোকে সংজ্ঞায়ন করার সময় ঠিক উল্টোটা করি। মনে হয় যেন মানুষ কোনো এক কুয়াশাচ্ছন্ন ঘোরের (Haze) মধ্যে বাস করছিল, কেবল কিছু ধরাবাঁধা নিয়ম বা রুটিন মেনে চলত—যতক্ষণ না একদিন কেউ কৃষিকাজ আবিষ্কার করল আর সব বদলে গেল। আমার মনে হয়, এটাই আমাদের অতীতের প্রতি করা এক ধরণের ‘ধারণাগত ক্ষতি’ (Conceptual damage)। ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ আসলে এই ভুলটাই ভাঙার চেষ্টা করছে। আমরা ইতিহাসের অতি সুদূর সেই সময়গুলো নিয়ে লিখতে চেয়েছি—যার সপক্ষে আমাদের কাছে প্রমাণ আছে—যেন সেখানে সত্যিকারের রক্তমাংসের মানুষ ছিল। শুনতে হাস্যকর মনে হলেও ইতিহাসচর্চায় এই কাজটা খুব কমই করা হয়। জানেন তো, প্রাগৈতিহাসিক মানুষদের আমাদের মতো মানুষের সাথে তুলনা করার চেয়ে বরং মানবেতর প্রাইমেটদের (Non-human primates) সাথেই বেশি তুলনা করা হয়।

    অ্যারন বাস্তানি: আপনার বইয়ের এই অংশটা আমার খুব ভালো লেগেছে—আগে কখনো এভাবে ভাবিনি। আমরা কি শিকারী ও সংগ্রাহকদের নিয়ে একটু বিস্তারিত আলাপ করতে পারি? তারা কি আধুনিক মানুষের তুলনায় অনেক কম ‘সংকীর্ণমনা’ ছিল? মানে ইন্টারনেটের এই যুগের কথা বলছি না, তবে তার আগের সময় পর্যন্ত কি তারা অনেক বেশি বিস্তৃত ছিল না? আপনি কি এ বিষয়ে কিছু বলবেন?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: আধুনিক প্রত্নতত্ত্বের অন্যতম বড় উদঘাটন (Revelation) হলো এই আলামতগুলো । আগে ভাবা হতো যে, কৃষির আগের মানুষগুলো ছোট ছোট দলে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাস করত। তারা যাযাবর ছিল, উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াত এবং একে অপরের সাথে তেমন যোগাযোগ ছিল না—এই পুরো ধারণাটাই ভুল। আমরা এখন সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে দেখাতে পারি যে, কৃষিকাজ শুরুর কয়েক হাজার বছর আগেও, এমনকি বরফ যুগের (Ice Age) অনেক আগে থেকেই মানুষের সমাজ বিশাল এলাকা জুড়ে সুসংগঠিত ছিল। তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ রাখত এবং বিভিন্ন জিনিসপত্র আদান-প্রদান করত। বর্তমানে আমাদের হাতে এমন বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি আছে যা দিয়ে হাজার হাজার বছর আগের মানুষের খাদ্যভ্যাস পর্যন্ত শনাক্ত করা যায়। তারা কি উপকূলীয় এলাকায় ছিল নাকি স্থলভাগে চলে এসেছিল, তা আমরা এখন বলতে পারি। এমনকি উদ্ভিদ, প্রাণী এবং কাঁচামালের চলাচলও শনাক্ত করা যায়। আমাদের কাছে প্রাচীন ডিএনএ আছে। সুতরাং আদি মানব সমাজকে ব্যাখ্যা করার অনেক পদ্ধতি এখন আমাদের হাতে। আর তা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, সেই জগতটা ছিল ভীষণভাবে একে অপরের সাথে সংযুক্ত। একটু ভেবে দেখলে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ মানুষের প্রথম কাজগুলোর একটি হলো স্থান পরিবর্তন করা। আমরা সাধারণত বলি যে মানুষ পুরো পৃথিবী ‘দখল’ বা ‘উপনিবেশায়ন’ করেছে—যদিও শব্দটা একটু অদ্ভুত কারণ তখন সেখানে দখল করার মতো কেউ ছিল না। কিন্তু আমরা বিচরণ করেছিআফ্রিকা থেকে দক্ষিণ আমেরিকা পর্যন্ত। এমনকি শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়াতেও পৌঁছে গিয়েছি। ফলে আমরা শুরুই করেছিলাম এক ধরণের সুসংহত এবং সংযুক্ত সামাজিক পরিমণ্ডল (Social Universe) দিয়ে। জনসংখ্যার দিক থেকে তারা হয়তো খুব বেশি ছিল না। কিন্তু তারা অবিশ্বাস্য দূরত্বের মধ্যেও যোগাযোগ রক্ষা করত এবং ধ্যান-ধারণা বিনিময় করত। মধ্যযুগের ইউরোপের কথা ভাবুন। সেখানে পরিস্থিতি মোটেও এমন ছিল না। একজন সাধারণ গ্রাম্য কৃষক তার গ্রামের বাইরে খুব একটা যেত না। আর এই বিষয়টি খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। কারণ এর মানে হলো আমাদের ইতিহাসের ব্যাপ্তি বা স্কেল (Scale) নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। আমার মনে হয় বেশিরভাগ মানুষের মনে ইতিহাসের যে গতানুগতিক ছবিটা আছে তা আসলে উল্টো। মানুষ ভাবে যে আমরা ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী দিয়ে শুরু করেছি এবং শেষ পর্যন্ত এই বিশ্বায়নের যুগে এসে পৌঁছেছি। কিন্তু আসলে ঘটনাটা উল্টো। আপনি যদি মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস দেখেন, তবে দেখবেন যে আগে সেখানে বিশাল আঞ্চলিক ব্যবস্থা ছিল। অথচ আজ যদি আপনি কায়রো থেকে দামেস্কে যেতে চান, তবে আপনাকে হয় সিআইএর জন্য কাজ করতে হবে, না হয় প্রায় ৫০টা বর্ডার চেকপয়েন্ট পার হতে হবে। দেখা যাচ্ছে যে, জাতিরাষ্ট্র আর কঠোর সীমান্ত ব্যবস্থার কারণে সময়ের সাথে সাথে আমরা আসলে অনেক বেশি রুদ্ধ বা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছি।

    অ্যারন বাস্তানি: মেগালিথিক প্রত্নস্থান (Megalithic sites) নিয়ে একটা কথা—যেটা আমি গত কয়েক বছরেই আবিষ্কার করেছি এবং সেকথাগুলো আপনাদের বইয়েরও অংশ; সে বিষয়টি হলো জ্যোতির্বিদ্যার (Astronomy) ভূমিকা। এখানে বিষুব (Equinoxes) আর অয়নান্তের (Solstices) [ক্রান্তিয়, কর্কট ক্রান্তি ও মকর ক্রান্তি] বিষয় তো আছেই, তবে এর বাইরেও আরও অনেক কিছু আছে। প্রায়ই দেখা যায় নির্দিষ্ট কিছু নক্ষত্রমণ্ডলকে (Constellations) সারিবদ্ধ করা হয়েছে বা শনাক্ত করা হয়েছে। তার মানে কি আমরা এমন অনেক সমাজকে দেখছি যারা তখনও কৃষিকাজ শুরু করেনি, অথচ অত্যন্ত উন্নত জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী ছিল? কারণ এটাও এমন একটা বিষয় যা নিয়ে মানুষ সাধারণত তেমন ভাবে না।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: এবং নৌচালনবিদ্যা (Navigation) নিয়েও। আমরা এখানে এমন এক মানবগোষ্ঠীর কথা বলছি যারা আয়ারল্যান্ডের ল্যান্ডস্কেপ থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো পর্যন্ত যাতায়াতের পথ খুঁজে নিয়েছিল। অবশ্যই এর জন্য ভূসংস্থান (Topography) এবং সমুদ্রের আচরণ সম্পর্কে ব্যবহারিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক—উভয় দিক থেকেই তাদের অসাধারণ দখল থাকতে হয়েছিল। আর হ্যাঁ, আপনি প্রারম্ভিক যুগের বৃহদাকার স্থাপত্যগুলোতেও এর প্রতিফলন দেখতে পাবেন। এগুলো প্রায়ই খুব নিখুঁতভাবে সারিবদ্ধ করে সাজানো হতো—কখনও অন্য কোনো স্মৃতিস্তম্ভের সাপেক্ষে, আবার কখনও অয়নান্তের সাপেক্ষে। এখানে যুক্তরাজ্যে স্টোনহেঞ্জ (Stonehenge) তো এ বিষয়ে জগৎবিখ্যাত। মানুষ যে অত্যন্ত উন্নত গাণিতিক ও জ্যামিতিক জ্ঞান অর্জনে সক্ষম ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই; যদিও তাদের পদ্ধতিগুলো আমাদের বর্তমান পদ্ধতির চেয়ে ভিন্ন ছিল। আমার মনে হয় ১৯৬০-এর দশকে ক্লদ লেভি-স্ট্রসের (Claude Levi-Strauss) বইতে এ নিয়ে সবচেয়ে বিখ্যাত আলোচনাটি হয়েছিল। সেখানে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে বিজ্ঞানের মূলত দুটি ভিন্ন রূপ আছে। একটা হলো বিজ্ঞানের প্রতি আমাদের বর্তমান ধারণা যা ল্যাবরেটরিতে শুরু হয়—যেখানে আপনি একটা কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করেন এবং সাদা কোট পরা মানুষরা নতুন নতুন আইডিয়া বা থিওরি তৈরির চেষ্টা করেন, যা পরে বহির্বিশ্বে প্রয়োগ করা হয়। তিনি এর সাথে তুলনা করেছেন মানুষের ইতিহাসের সেই ধরণের আবিষ্কারের পদ্ধতির, যেখানে কোনো ল্যাবরেটরি ছিল না। সেখানে আবিষ্কার ছিল সামাজিক জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটা ছিল মানুষের ল্যান্ডস্কেপ, গাছপালা এবং প্রাণীর সাথে মিথস্ক্রিয়ার ফল—যা শুরু থেকেই সরাসরি প্রয়োগ করা হতো। সম্ভবত এভাবেই নৌচালনবিদ্যা, বিশাল স্থাপত্য নির্মাণ বা ধাতুবিদ্যার মতো প্রাথমিক ব্যবস্থাগুলো আবিষ্কৃত হয়েছিল। আমাদের পরিচিত জ্ঞানতাত্ত্বিক ব্যবস্থার বাইরে অন্য কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে এগুলো তৈরি হয়েছিল—যা আসলে নিজের মধ্যেই বেশ কৌতূহলোদ্দীপক।

    অ্যারন বাস্তানি: আচ্ছা, স্টোনহেঞ্জ কি কৃষিজীবী মানুষেরাই তৈরি করেছিল? এটা কি আমরা নিশ্চিতভাবে জানি?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: খুব সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত এটাই ছিল সর্বজনসম্মত ধারণা। কিন্তু গত কয়েক দশকে আমরা যা জানতে পেরেছি তা আসলে আরও অনেক বেশি চমকপ্রদ। প্রায় ৫০০০ বছর আগে যখন স্টোনহেঞ্জ (Stonehenge) তৈরি হচ্ছে, তার আগেই ইউরোপীয় মহাদেশ থেকে আমদানিকৃত পদ্ধতি হিসেবে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে চাষাবাদ শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিশ্বের আরও অনেক জায়গার মতো এখানেও একই ঘটনা ঘটেছিল—আবারও সেই আপনার শুরুর দিকে বলা মানব ইতিহাসের যুগবিভাজনের তত্ত্ব (Stage Theory)-এর প্রসঙ্গে আসি, যেখানে বলা হয় কৃষি এলো আর সবকিছু বদলে গেল। ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ আসলে এমন অনেক উদাহরণের একটি, যেখানে মানুষ কৃষিকাজ গ্রহণ করার পর মূলত তাদের সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেছিল। স্টোনহেঞ্জ (Stonehenge) এবং আরও অনেক বড় বড় স্মৃতিস্তম্ভ যখন তৈরি হচ্ছে, সেই সময়ে এই দ্বীপের মানুষরা শস্য চাষের অভ্যাস প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল। তারা প্রধান উদ্ভিদজাত খাদ্য হিসেবে আবারও বুনো বাদাম বা ওক ফল বা একর্ন (Acorns) জাতীয় খাবার সংগ্রহের দিকে ফিরে গিয়েছিল। তবে তারা সব কিছু ছাড়েনি; যেমন তারা শুকর আর গরু পালনের মতো পশুপালন চালিয়ে গিয়েছিল। স্টোনহেঞ্জ (Stonehenge)-এর কাছে ডারিংটন ওয়ালস (Darrington Walls) নামে একটি প্রত্নস্থান আছে। সেখানে এমন এক জায়গার সন্ধান পাওয়া গেছে যেখানে মানুষ ঋতুভিত্তিক উৎসবের জন্য জড়ো হতো এবং প্রচুর পরিমাণে মাংস খেয়ে ভোজ করত। সেটা নিশ্চয়ই বিশাল কোনো আয়োজনের উৎসব ছিল। আর সম্ভবত সেই সময়েই তারা এই ধরণের বড় বড় সমন্বিত নির্মাণ কাজগুলো করত যা আমরা এখন দেখতে পাই। তাই এই পুরো চিত্রটা আসলে বেশ জটিল। তারা পুরোপুরি কৃষকও ছিল না, আবার শুধু শিকারী ও সংগ্রাহকও ছিল না; বরং তারা ছিল কৃষক, খাদ্য সংগ্রহকারী এবং পশুপালকের এক ধরণের সংকর (Hybrid) সমাজ।

    অ্যারন বাস্তানি: তার মানে আপনি বলতে চাইছেন যে, এটা মূলত একটা সামাজিক পছন্দ ছিল যা তারা নিজেরা নিয়েছিল।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: অবশ্যই তাই ছিল। কারণ আমি আর কোনোভাবেই এটা কল্পনা করতে পারি না যে, দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের মানুষ শস্য চাষের মতো একটা অনুশীলনের দিক থেকে হুট করে মুখ ফিরিয়ে নিল। এটা তো অবচেতনভাবে ঘটা সম্ভব নয়। এখানে জলবায়ুগত কোনো বড় বিপর্যয় বা জনশূন্য হয়ে যাওয়ার মতো কোনো প্রমাণও নেই। এর মানে দাঁড়ায় মানুষ স্রেফ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে তারা আর কৃষিজীবী হয়ে থাকতে চায় না।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, স্টোনহেঞ্জ (Stonehenge) তো আসলেও অনন্য। মানুষ যে এই ধরণের নির্মাণ কাজ করতে আগ্রহী হয়েছিল, তার পেছনে নিশ্চয়ই খুব অসাধারণ কিছু ঘটেছিল। সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে এর তুলনা হতে পারে এমন যে—আমরা হুট করে সিদ্ধান্ত নিলাম যে শিল্প বিপ্লব আসলে কোনো ভালো আইডিয়া ছিল না অথবা আমরা জীবাশ্ম জ্বালানি  ব্যবহার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। তারা অবশ্য এই পরিভাষায় ভাবছিল না। তবে এটা একটা প্রশ্ন তো তুলেই দেয়, তাই না? আমাদের শেখানো হয় যে সেই আদিম সমাজগুলো অত্যন্ত আদিম বা ‘প্রিমিটিভ’ ছিল; কিন্তু তারা যদি ওই মাপের বড় বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তবে আমরা এখন এই ধরণের কাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এত হিমশিম খাই কেন? আর এটাই আমাকে আমাদের দর্শকদের জন্য বইটির মূল প্রশ্নের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যারা মূলত রাজনৈতিক সচেতন দর্শক। যদি ইতিহাসের এই জেনেরিক ‘যুগবিভাজনের তত্ত্ব’ ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ হয়, তবে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য কিন্তু বিশাল। কারণ এটিই হলো লক, রুসো বা হবসের মতো আধুনিক রাজনৈতিক তত্ত্বের ভিত্তি। আবার বর্তমানে স্টিফেন পিঙ্কার বা ইউভাল হারারিদের মতো মানুষদেরও ভিত্তি এটি। কারণ তাদের মূল বক্তব্যই হলো—সমাজ যত জটিল হবে, সেখানে বৈষম্য আর অন্যায় তত বাড়বে। তবে যেহেতু এটা প্রাচুর্য তৈরি করে, তাই এর পেছনে এক ধরণের উপযোগবাদী যুক্তি (Utilitarian argument) দেওয়া হয়। আপনি এমন কিছু লেখক আর বইয়ের কথা বলছেন যারা কখনও কখনও সরাসরি দুই বা তিনশ বছর আগের সেই দার্শনিকদের মডেল অনুসরণ করেন। অনেকে তো সরাসরি বলেনও যে আমি একজন ‘নব্য-হবসিয়’ (Neo-Hobbesian) বা ‘নব্য-রুশোইও’ (Neo-Rousseauan)। এটা বেশ মজার। আমি আর ডেভিড যখন এই বিষয়গুলো নিয়ে প্রথম ভাবতে শুরু করি, তখন সময়টা ছিল ২০০৮-০৯ সালের সেই বড় আর্থিক ধ্বসের কাছাকাছি। সেসময় বৈষম্য এবং বৈষম্যের মূল শিকড় নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হচ্ছিল। হঠাৎ করেই সপ্তদশ বা অষ্টাদশ শতাব্দীর সেই পুরনো ধারণাগুলো খুব আগ্রাসীভাবে ফিরে এলো। মানুষ আবারও হবস বা রুসোর কাছে ফিরে যেতে চাইল। আপনি যেমনটা বললেন, আমরা আসলে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান তত্ত্বের প্রারম্ভিক পাঠগুলো নিয়েই কথা বলছি। কিন্তু মনে রাখা জরুরি যে সেগুলো ছিল পুরোপুরি কল্পনাপ্রসূত বা অনুমিত (Speculative)। লক্ষ বছর আগের মানব সমাজের প্রকৃতি কেমন ছিল, সে বিষয়ে কোনো বাস্তব তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই সেই দার্শনিকরা স্রেফ নিজেদের কল্পনা থেকে সেগুলো তৈরি করেছিলেন। অর্থাৎ এগুলো হলো প্রাগৈতিহাসের এক কাল্পনিক জগত। একথা ভাবলে বেশ অবাক লাগে যে, আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তা আসলে এমন কিছু কল্পনা থেকে এসেছে যার শিকড় প্রোথিত ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। যেমন, ‘লেভিয়াথান’ (Leviathan) ১৬৫১ সালে লেখা হয়েছিল ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের মাঝখানে। সেখানে মূলত সরকারহীন সমাজের প্রকৃতি এবং সরকারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। রুশো মারা গিয়েছিলেন ফরাসি বিপ্লবের ১০ বছর আগে। তিনি যখন বৈষম্যের উৎস কী—এই প্রশ্ন তুলছেন, তখন সেটা ছিল তাঁর সময়ের এক জ্বলন্ত প্রশ্ন। তাই এগুলো পুরোপুরি রাজনৈতিক কল্পনার চর্চা ছিল। সেই সময়ে এসব চিন্তা হয়তো বৈপ্লবিক ছিল। কিন্তু আমাদের হাতে যখন এখন এত নতুন তথ্য আর প্রমাণ আছে, তখন কেন আমরা ২০২২ সালে দাঁড়িয়ে ১৭৫৪ সালের প্রাসঙ্গিক প্রশ্নগুলো নিয়ে পড়ে থাকব? কেন আমরা এখনও এই স্থবির বা জড় পদ্ধতিতে একই প্রশ্নগুলো করে যাচ্ছি? এই জিজ্ঞাসা নিজেই একটা বড় প্রশ্ন।

    অ্যারন বাস্তানি : আপনি একজন একাডেমিক, আপনি ইউসলে (UCL) আছেন। আমিও তো ইউসিএলে আন্ডারগ্রাজুয়েট ছিলাম। আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞান তত্ত্বের কিছু মডিউল পড়েছিলাম। আমাদের কী পড়ানো হয়? রাষ্ট্রবিজ্ঞান তত্ত্বের প্রারম্ভিক পাঠ: হবস, লক, প্লেটো, রবার্ট নজিক এবং একটু সমসাময়িকদের মধ্যে জন রল্‌স। কিন্তু এরা সবাই তো কার্যকরভাবে লক আর হবসের সেই প্রারম্ভিক উদারতান্ত্রিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করেই নিজেদের চিন্তা গড়ে তুলেছেন। সেখানে মূলত শেখানো হয় যে কেন আপনার রাষ্ট্রকে মেনে চলা উচিত। আর আপনি যেমনটা বলছেন, এগুলো কয়েকশ বছরের পুরনো কিছু অনুমানের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা এই আধুনিক পশ্চিমা পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতির প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছি, যেখানে আমরা তথাকথিত প্রত্যক্ষণবাদের (Empiricism) উপর অগাধ আস্থা রাখি। অথচ আমাদের রাজনৈতিক স্থিতাবস্থাকে বৈধতা দেওয়ার যে মূল ভিত্তি, তা আসলে পুরোপুরি ভিত্তিহীন কথাবার্তা।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো : এই প্রসঙ্গটি আসলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যার একটা ভালো উদাহরণ। কারণ আপনি যেখানে ওই বিষয়গুলো পড়ছিলেন, তার ঠিক পাশেই ছিল আমার কর্মস্থল। ২০০৩ সালের কথা বলছেন? তার মানে আপনি যেখানে লক বা রল্‌স সম্পর্কে শিখছিলেন, তার ঠিক কোণায় গেলেই ছিল ‘ইনস্টিটিউট অব আর্কিওলজি’। আমি সম্ভবত তখন থেকেই সেখানে পড়ানো শুরু করেছি। তার মানে খুব কাছেই একদল মানুষ আসলে মানুষের প্রাগিতিহাস নিয়ে গবেষণা করছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃতিই এমন যে, এগুলোকে আলাদা আলাদা বিভাগে ভাগ করে ফেলা হয়। ফলে জ্ঞানের যে আদান-প্রদান খুব স্বাভাবিকভাবে হওয়া উচিত ছিল, তা আর হয় না। আমাদের হাতে এখন যা তথ্য আছে, তার আলোকে বিষয়গুলো এখন কেমন দেখায় এবং এর তাৎপর্য কী— সেই জিজ্ঞাসাগুলো নিয়ে আর আলাপ হয় না। প্রত্নতত্ত্বের ছাত্ররা সম্ভবত সেই দার্শনিকদের কথা ভাবত না, আবার যারা ওই দার্শনিকদের কথা পড়ত, তারা সম্ভবত মানুষের সুদূর অতীতের ইতিহাস আর প্রমাণগুলো নিয়ে ভাবত না। আমার মনে হয় এই বিষয়টি একটা বড় সমস্যা। এক কথায় বলতে গেলে আমরা শেখার এক বিশাল সুযোগ হারিয়েছি।

    অ্যারন বাস্তানি : কিন্তু এই পরিস্থিতি কি একাডেমিকদেরও এক ধরণের ব্যর্থতা নয়? মানে, মেধাবী পেশাজীবীরা তরুণদেরকে এই ধরণের ভিত্তিহীন কথা বা ‘ননসেন্স’ শেখাচ্ছেন— এমন কাজকর্ম তো পুরোপুরি পাগলামি বলেই মনে হয়। অথচ বিষয় হিসেবে এই আলাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: দেখুন, এটাকে কেবল ভিত্তিহীন কথা হিসেবে পড়ানোর দরকার নেই; আপনি এটাকে একটা ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেও দেখতে পারেন। এগুলো পাঠ করা জরুরি, তবে সেই পাঠ করতে হবে তার সীমাবদ্ধতার ভেতরে থেকেই। আসলে আপনি যদি এই টেক্সটগুলো খুঁটিয়ে দেখেন, তবে দেখবেন সেগুলো যে স্রেফ কল্পনাপ্রসূত (speculative), তা লেখক নিজেই স্বীকার করেছেন। যেমন রুশো যখন ওই যে আপনি শুরুতে যেটা বলছিলেন—মানে কৃষিকাজ আর ব্যক্তিগত সম্পত্তির আবিষ্কার কীভাবে আমাদের নতুন ধরণের জীবনযাত্রায় আটকে ফেলেছে—সেই গল্পটা বলার সময় এক জায়গায় স্পষ্ট করেই বলেছেন: এই আলাপকে ইতিহাস হিসেবে নেবেন না। তিনি বলতে চেয়েছেন ওই আলাপ মূলত একটা তাত্ত্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাই হয়েছিল যেন আপনি ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং এই দুনিয়ায় তার প্রভাব নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারেন। এই আলাপ কোনো ঐতিহাসিক পুনর্নির্মাণ নয়। অথচ মজার ব্যাপার হলো, আপনি যেসব আধুনিক লেখকের কথা বললেন, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টা খুব অদ্ভুতভাবে বদলে গিয়েছে। যা একসময় স্রেফ কল্পনাপ্রসূত আলোচনা হিসেবে শুরু হয়েছিল, এখন সেই বয়ানগুলোকেই বস্তুনিষ্ঠ সত্য (objective truth) বা ইতিহাসের অলঙ্ঘনীয় নিয়ম হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আর এই পরিস্থিতিই আসলে আমাদের—মানে নৃতাত্ত্বিক হিসেবে ডেভিড আর প্রত্নতত্ত্ববিদ হিসেবে আমাকে—এক ধরণের ধাক্কা দিয়েছিল। আমাদের মনে হয়েছিল, এভাবে তো চলতে দেওয়া যায় না; আমাদের কিছু একটা করা দরকার। মূলত সেই তাড়না থেকেই আমরা আমাদের এই অসাধারণ জ্ঞানভাণ্ডারকে বর্তমানের এই সব বিচ্ছিন্ন পরিপ্রেক্ষিত (siloed contexts) থেকে মুক্ত করার কাজটা শুরু করি। পে-ওয়াল জার্নালের (paywall journals) দেয়াল ভেঙে আমরা মানব ইতিহাসের সেই রহস্যের জটগুলো খুলতে শুরু করি যা এখনও গ্রন্থিবদ্ধ। কিন্তু এখন পর্যন্ত যে তথ্যগুলো আমাদের হাতে আছে, তা থেকেই বলা যায় যে—আলোকায়ন (Enlightenment) থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে আমরা ইতিহাসের যে বয়ান পেয়েছি, বাস্তব ইতিহাস মোটেও তেমন নয়।

    অ্যারন বাস্তানি : চলুন আদিবাসী আমেরিকান সমাজ নিয়ে একটু আলাপ করি। এই বিষয়ে আমার আরও কিছু প্রশ্ন আছে। বিশেষ করে আপনারা বইটিতে যেসব সোর্স মেটেরিয়াল ব্যবহার করেছেন, সেগুলো সত্যিই খুব প্রভাবশালী। গত কয়েক বছরে আমি নিজেও অনেক নতুন কিছু শিখেছি। চলুন আবারও সেই ধরাবাঁধা ধারণা (stereotypes) আর প্রচলিত জ্ঞান (received wisdom) নিয়ে একটু কথা বলি। প্রচলিত ধারণাটা হলো—ইউরোপীয়রা ১৪৯২ সালে পশ্চিম গোলার্ধ  আবিষ্কার করে। আমরা না হয় লেইফ এরিকসনকে আপাতত পাশে সরিয়েই রাখলাম—আমি আসলে মাত্রই সুইডেন থেকে ফিরেছি।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, ওরা কিন্তু এরিকসনের কথা ভোলেনি।

    অ্যারন বাস্তানি: একদমই ভোলেনি! নর্ডিক (Nordic) দেশগুলো ওই বিষয়টা বেশ ফলাও করে প্রচার করে, তাই না? তো আমরা যে ধারণাটা নিয়ে চলি তা হলো—আমরা মূলত একটা অনগ্রসর সভ্যতাকে আবিষ্কার করেছিলাম এবং তারপর বন্দুক, জীবাণু আর ইস্পাত—অর্থাৎ ‘গানস, জার্মস অ্যান্ড স্টিলের’ (Guns, Germs, and Steel) [ জারেড ডায়মন্ডের বিখ্যাত বই Guns, Germs, and Steel: The Fates of Human Societies দ্রষ্টব্য] সমন্বয়ে তাদের প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলাম। কিন্তু এই বয়ানটা তো পুরোপুরি সঠিক নয়, তাই না?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: না, একদমই নয়। অতিমারির পর যাতায়াত ব্যবস্থা যখন আবারও স্বাভাবিক হলো, তখন গত বছর আমি কানাডা আর আমেরিকায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেখানে বিভিন্ন ক্যাম্পাসের আদিবাসী গবেষক আর ইতিহাসবিদদের সাথে কথা বলার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। ডেভিডের সাথে লেখা বইটিতে কলম্বাস-পূর্ব আমেরিকা এবং ইউরোপীয় উপনিবেশকারী ও আদিবাসীদের মধ্যকার প্রাথমিক সম্পর্ক নিয়ে অনেক কিছু আছে। সত্যি বলতে, এই ক্ষেত্রটি আমাদের দুজনের কারোই মূল গবেষণার বিষয় ছিল না। নৃতাত্ত্বিক হিসেবে ডেভিডের কাজের ক্ষেত্র ছিল মাদাগাস্কার, আর আমার পিএইচডি এবং বেশিরভাগ মাঠপর্যায়ের গবেষণা ছিল উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে। ফলে এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের অনেক নতুন কিছু শিখতে হয়েছে। তবে আমরা শুরুতে যে প্রশ্নটা নিয়ে কাজ করছিলাম—বিশেষ করে বৈষম্যের উৎস কী—তার উত্তর খুঁজতে এই পথেই হাঁটতে হয়েছে। আপনি যদি আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ের সাহিত্য বা রুসোর মতো চিন্তাবিদদের দিকে তাকান, তবে দেখবেন যে সেই সময়ের বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে যেসব ধারণা নিয়ে বিতর্ক হচ্ছিল, সেখানে আপনি আমেরিকাকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারবেন না। বিশেষ করে উত্তর আমেরিকার সেই অংশটি—যা বর্তমানে কানাডা এবং আপস্টেট নিউ ইয়র্কের মাঝে বিভক্ত; মূলত গ্রেট লেকস অঞ্চল এবং যেটাকে অনেক সময় ইস্টার্ন উডল্যান্ডস বলা হয়। সেখানেই ইউরোপীয়রা এমন কিছু সমাজের মুখোমুখি হয়েছিল যাদের জীবনযাত্রা ছিল আমূল ভিন্ন। তারা ছিল অনেক বেশি গণতান্ত্রিক। বিশেষ করে নারীদের সেখানে যে ধরনের স্বাধীনতা ছিল, তা তৎকালীন ইউরোপীয় সমাজে অকল্পনীয় ছিল। আর এসবের প্রভাবে ইউরোপীয়দের রাজনৈতিক কল্পনায় এক বিশাল প্রভাব পড়েছিল। আমরা যখন সিদ্ধান্ত নিলাম যে কয়েকশ বছরের পুরনো ওইসব গৎবাঁধা প্রশ্ন আর গল্পের ফাঁদে পা দেব না, তখন আমাদের বুঝতে হলো যে ওই ধারণাগুলো আদতে এলো কোথা থেকে। আর সেই উত্তর খুঁজতে গেলেই আপনাকে আমেরিকার দিকে তাকাতে হবে। এ কারণেই বইটির একটা বড় অংশ জুড়ে আমেরিকা গুরুত্ব পেয়েছে।

    অ্যারন বাস্তানি: কোন্দিয়ারোঙ্ক নিয়ে একটু আলাপ করা যাক। সম্ভবত আপনার ফ্রেঞ্চ উচ্চারণটা বেশ ভালো। আমি প্রস্তুতির জন্য এ বিষয়ক কিছু ভিডিও দেখেছি। তিনি তো আসলে বাস্তবের একজন রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: অবশ্যই। আপনি চাইলে গুগলে ‘গ্রেট পিস অব মন্ট্রিল’ নামের ১৭১১ সালের একটি চুক্তির ছবি দেখতে পারেন, যেখানে কোন্দিয়ারোঙ্কের স্বাক্ষর বা চিহ্ন আছে।

    অ্যারন বাস্তানি: তো কোন্দিয়ারোঙ্কের গুরুত্বটা আসলে কোথায়? তিনি কে ছিলেন?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: কোন্দিয়ারোঙ্ক ছিলেন হুরন-ওয়েনডাট নেশনের (Huron-Wendat Nation) একজন অত্যন্ত পরিচিত ব্যক্তি। এই জাতিসত্তাটি কিন্তু আজও টিকে আছে। কুইবেক সিটির উপকণ্ঠে তাদের প্রশাসনিক কেন্দ্রটি অবস্থিত। আমি সেখানে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেখানে ‘কোন্দিয়া’ নামে ছোট একটা রাস্তা আছে। আমরা মজা করে বলছিলাম যে রাস্তাটা হয়তো এখন আরও বড় করা উচিত কারণ আমাদের বইয়ে তিনি একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাঁর সম্পর্কে আমরা বেশ কিছু স্বতন্ত্র বিবরণ পাই যা থেকে জানা যায় যে, সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দিকে তিনি কূটনীতি, যুদ্ধবিগ্রহ এবং নিজের জাতির মানুষের জন্য এক উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ফরাসি, ইংরেজ আর ওলন্দাজ উপনিবেশকারীদের সঙ্গে জটিল পরিস্থিতির মাঝেও তিনি যেভাবে দর কষাকষি করেছিলেন, তা এক কথায় অনন্য। তিনি বহুভাষী ছিলেন। এছাড়াও তিনি ছিলেন একজন তুখোড় বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ আর চমৎকার বক্তা। তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন বিবরণ আমাদের এসব তথ্য দেয়। তবে ইতিহাসের কিছু কাকতালীয় কারণে কোন্দিয়ারোঙ্ক এবং তৎকালীন ইউরোপীয়দের মাঝে ঘটে যাওয়া সেইসব কথোপকথন আর চিন্তাভাবনাগুলো ইউরোপের বিশাল জনসমষ্টির কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। আমরা জানতে পারি, সেই সময় ‘নিউ ফ্রান্স’ বা কলোনির সেই অংশের গভর্নর কোন্দিয়ারোঙ্ককে নিয়মিত নিজের টেবিলে দাওয়াত দিতেন কেবল বিতর্কের নেশায়। গভর্নর নিজেই বলেছিলেন, তিনি তাঁর কর্মকর্তাদের বিনোদনের জন্য এই কাজটা করতেন কারণ লোকটা ছিল ভীষণ রসিক আর উপস্থিত বুদ্ধি সম্পন্ন। তাঁরা এমন অনেক বিষয়ে বিতর্ক করতেন যা পরবর্তীতে আলোকায়নের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছিল; যেমন যুক্তি বনাম ধর্মবিশ্বাস, বিয়ের রীতি, স্বাধীনতার প্রশ্ন কিংবা সমাজে অর্থের ভূমিকা। সেইসব কথোপকথনের প্রত্যক্ষদর্শীদের মাঝে একজন সামান্য ফরাসি উচ্চবিত্ত মানুষ ছিলেন যার নাম ছিল ব্যারন লাহোন্তাঁ। তিনি খুব অল্প বয়সে কলোনিতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি এক দশক ছিলেন এবং অন্তত দুটি আদিবাসী ভাষা জানতেন। তিনি সেই উত্তাল সময়ের পরিস্থিতির সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিলেন। তবে তিনি কিছুটা গোলমেলে স্বভাবের মানুষ ছিলেন। কর্তৃপক্ষের সাথে ঝামেলার কারণে তাঁকে কলোনি থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং এক সময় তিনি আমস্টারডামের রাস্তায় কপর্দকহীন অবস্থায় দিন কাটাতেন। তখন তিনি তাঁর ভ্রমণকাহিনীমূলক বইগুলো লিখতে শুরু করেন এবং আবারও রাজদরবারের অনুগ্রহ পান। তাঁর সেই বইগুলোর একটির নাম ছিল কিউরিয়াস ডায়ালগস উইথ এ স্যাভেজ অব গুড সেন্স (Curious Dialogues with a Savage of Good Sense)। সেখানে লেখক নিজের চরিত্রের সাথে ‘আদারিও’ নামের এক চরিত্রের কথোপকথন তুলে ধরেছেন। আর সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন যে এই আদারিও চরিত্রটি আসলে কোন্দিয়ারোঙ্কের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি। এই সংলাপে আদারিও বা কোন্দিয়ারোঙ্ক ইউরোপীয় সভ্যতার এক তীক্ষ্ণ আর বিধ্বংসী বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। আর এই বইটিই তখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং অসংখ্য মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। বইটি ছিল সেই সময়ের ‘বেস্টসেলার’। বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় বইটির অনুবাদ হয় এবং বছরের পর বছর মঞ্চনাটক চলে। পরবর্তীতে প্রায় সব বড় আলোকায়নের চিন্তাবিদই এই ধরণের সংলাপ বা ‘ডায়ালগ’ লেখার চেষ্টা করেছেন। তাঁরা তাঁদের মূল বক্তব্যগুলো কোনো এক কাল্পনিক বিদেশি চরিত্রের মুখে বসিয়ে দিতেন; তিনি হতে পারেন তাহিতি বা চীনের কোনো নাগরিক। কিন্তু এইসব ঘটনার মূল প্রেক্ষাপটটি ছিল দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির সংঘাত আর বিনিময়ের এক বাস্তব অভিজ্ঞতা। আর আমরা বলতে চাইছি, ইউরোপীয় চিন্তাধারার ওপর এসব ঘটনার প্রভাব ছিল এক কথায় বিস্ফোরক।

    অ্যারন বাস্তানি : তার মানে ভলতেয়ার বা দিদেরোর মতো কোন্দিয়ারোঙ্ককেও আমাদের আলোকায়নের ইতিহাসের অংশ হিসেবে দেখা উচিত। শুধু তাই নয়, তিনি তো তাঁদের সবার অন্তত কয়েক দশক আগের। তাই ইউরোপের সেই বিখ্যাত সব ‘স্যালঁ’ বা বৈঠকখানাগুলো গড়ে ওঠার আগেই সেখানে এক ধরণের প্রায়-আলোকায়িত (proto-Enlightenment) স্যালঁ তৈরি হয়েছিল। আপনি একে ‘আদিবাসীদের সমালোচনা’ বলতে পারেন। আসলে এখন এইসব পড়ার সময় মনে হয়, বিষয়টা তো বেশ স্পষ্ট। ১৫০০ সাল থেকে ১৮০০ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত প্রায় ২০০ বছর ধরে আমেরিকা আর ইউরোপের মাঝে সংস্কৃতির এক ব্যাপক আদান-প্রদান চলেছে। ফলে সেখানে এই ধরণের সংলাপ আর ইউরোপে সেই আইডিয়াগুলোর সঞ্চারিত হওয়াটাই তো স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, আমেরিকার এই উপনিবেশায়ন আর শোষণের ইতিহাসে এই তাত্ত্বিক বিনিময়ের বিষয়টা আমাদের ধারণায় তেমন একটা আসেই না। মনে করা হয় আইডিয়া, পুঁজি আর মানুষ — সবই কেবল একপাক্ষিকভাবে ইউরোপ থেকে এসেছে। কিন্তু আপনি যেটা বলছেন তা গ্লোবাল নর্থের  (global North) বাইরের দেশগুলোর জন্য বেশ অনুপ্রেরণাদায়ক। এই যে আমেরিকায় জন্ম নেওয়া এক ধরণের আদিবাসী চিন্তাধারা বা ঘরানা ইউরোপীয় আলোকায়নের ভেতরেই জায়গা করে নিয়েছে — এটা আসলেও এক বিশাল ব্যাপার।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: তাই নয় কি? আসলে একথা যে আমাদের আলাদা করে প্রমাণ করতে হচ্ছে, সেটাই বেশ অদ্ভুত। নয়তো একথার মানে কী দাঁড়ায়? এই মানুষগুলো কি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন কোনো জগতে বাস করত? সেটা তো সম্ভব নয় কারণ আমরা বাণিজ্য আর সামরিক মিত্রতার এক নিবিড় সম্পর্কের সময়ের কথা বলছি। সেই সময় ইউরোপীয়রা যে আমেরিকার অনেক বস্তুগত অভ্যাস গ্রহণ করেছিল তা নিয়ে তো কোনো বিতর্ক নেই। এমনকি পাইপে তামাক খাওয়া বা ক্যাফেইন জাতীয় পানীয় পান করার মতো অভ্যাসগুলোও তো ছিল এই ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনারই অংশ। অথচ সেই বস্তুগত অভ্যাসের সাথে সাথে যে আইডিয়া বা চিন্তাভাবনাও আসতে পারে, তা মানতে কেন জানি এক ধরণের তীব্র অনীহা কাজ করে। বিষয়টি বেশ কৌতূহলউদ্দীপক। আমরা আসলে শুধু একথা বলতে চাইছি যে, গণতন্ত্র বা স্বাধীনতা নিয়ে যেসব আইডিয়া আলোকায়নের দার্শনিকরা খোদ আমেরিকার ওপর আরোপ করেছিলেন, সেগুলো আসলে ওখানকার আদিবাসীদেরই ছিল। স্বাধীনতার এই ধারণাগুলো শোষিত বা ঔপনিবেশিক মানুষের কাছ থেকে আসেনি, বরং প্রাচীন গ্রিস (Greece) বা ইউরোপীয় উপনিবেশকারীদের মাটি থেকে এসেছে, আমি মনে করি এভাবে চিন্তা করাটা শোষিত মানুষের জন্য অসম্মানজনক। যারা এখনও বিষয়টা উপলব্ধি করতে পারেননি, তাদের জন্য বলছি, শোষণের হাত থেকে নিজেকে কীভাবে মুক্ত করা যায়, সেই আইডিয়াটা আসলে শোষিত মানুষের কাছ থেকেই আসে। আর এই উপলব্ধিটাই হলো আসল মুক্তি।

    অ্যারন বাস্তানি : আমেরিকার কিছু সুনির্দিষ্ট জায়গা নিয়ে কথা বলা যাক। কাহোকিয়া (Cahokia) নামে একটা জায়গা আছে। খুব বেশিদিন আগে না, আমি প্রায় আট মাস আগে সেখানে গিয়েছিলাম। তো, প্রায় হাজার বছর আগে এই জায়গাটা আয়তনে লন্ডনের সমান ছিল। মানে ১০০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এখানে কয়েক হাজার মানুষের বসতি ছিল; বড় অংকে বলতে গেলে এই বসতির স্বর্ণযুগে জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ হাজারের মতো। চতুর্দশ শতাব্দীর দিকে ইউরোপের বড় কোনো নগরের সাথে বসতিটি তুলনা চলত। তো এই জায়গাটার আসলে কী হয়েছিল?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: এটা অত্যন্ত চমৎকার এবং কিছুটা বিতর্কিত একটি বিষয়। তবে এটা পরিষ্কার যে জায়গাটা একসময় বেশ বড় হয়ে উঠেছিল। আমি আমার সহকর্মীদের সাথে ওখানে ঘুরতে গিয়েছিলাম, যাদের মধ্যে একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ তাঁর জীবনের প্রায় ৩০ বছর ওখানে কাজ করেছেন। ওটা বেশ দারুণ ছিল কারণ আপনি যখন সেখানে যাবেন, আপনার সামনে দেখার মতো খুব বেশি কিছু নেই। সেখানে মঙ্কস মাউন্ড (Monk’s Mound) নামে বিশাল এক ঢিবি আছে। এর বাইরে আরও অনেক ধরণের মাটির কাজ আর ঢিবি আছে এবং সেগুলো আকারে বিশাল। জায়গাটা এখন একটা ন্যাশনাল পার্কের মাঝখানে, যার ভেতর দিয়ে রাস্তা চলে গিয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত উত্তর আমেরিকার অনেক গুরুত্বপূর্ণ আদিবাসী হেরিটেজ প্রত্নস্থানের (Heritage sites) কপালে এমনটাই ঘটেছে। রাস্তার ধারে বেশ ভালো মেক্সিকান খাবার পাওয়া যায়, ছোট ছোট রেস্তোরাঁ আছে। আসলে আপনি উত্তর আমেরিকার কলম্বাস-পূর্ব সময়ের সবচেয়ে বড় আদিবাসী জনপদ বা নগরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রত্নতাত্ত্বিকরা অনেক বছর ধরে সেখানে কাজ করেছেন। একসময় এই বসতি একটি পুরো আঞ্চলিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল; হয়তো আমরা যেভাবে সাম্রাজ্য বুঝি ঠিক সেভাবে না। কিন্তু মিসিসিপি অববাহিকা জুড়ে কাহোকিয়ার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব ছিল অবিশ্বাস্য। সেখানে যে একধরণের হায়ারার্কি বা উচ্চ-নিচ ভেদাভেদ আর বৈষম্য ছিল, তার কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন একটি ঢিবি পাওয়া গিয়েছে যেটা তরুণীদের মৃতদেহের অবশেষে ভরা ছিল; মনে করা হয় কোনো এক ভয়ংকর আচারের মাধ্যমে তাদের হত্যা করা হয়েছিল। আবার মঙ্কস মাউন্ড (Monk’s Mound) থেকে পুরো জনপদের ওপর নজরদারি করার চমৎকার ব্যবস্থা ছিল। আমরা জানি যে যখন এই জায়গাটি কেন্দ্রীভূত হতে শুরু করে, তখন আশেপাশের গ্রামাঞ্চলগুলো জনশূন্য হয়ে যায়। আপনি সেখান থেকে ঘরবাড়ির এলাকাগুলো দেখতে পেতেন; দুর্গের মতো দেয়ালও তৈরি হতে শুরু করেছিল। মনে হচ্ছিল সমাজটা ওই হায়ারার্কির দিকেই এগোচ্ছে। কিন্তু এরপরই সব বদলে যায়। এলাকাটি পরিত্যক্ত হয় এবং মানুষ সেখান থেকে চলে যায়। প্রত্নতাত্ত্বিকরা কাহোকিয়ার চারপাশের পুরো অঞ্চলকে একধরণের ‘জনশূন্য অঞ্চল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। জায়গাটা যেন একসময় পুরোপুরি বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল; এমনকি আমরা এই জায়গাটার আসল নামও জানি না। পরবর্তীকালের কথ্য ইতিহাসে এই বসতির তেমন কোনো স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় না। তার মানে মানুষ কোনো এক কারণে কাহোকিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। এ নিয়ে অনেক তত্ত্ব আছে, যেমন পরিবেশগত বিপর্যয়—যা আমার মতে খুব একটা জোরালো যুক্তি নয়। বর্তমানে মানুষ একে আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমের পুয়েবলো (Pueblo) সভ্যতার মতোই দেখছে—যেখানে অনেক বড় বড় কেন্দ্রীভূত প্রত্নস্থান হুট করে পরিত্যক্ত হয়েছিল। তো আমরা কেন অন্তত এই সম্ভাবনাটা বিবেচনা করব না যে—মানুষ আসলে সচেতনভাবেই ওই জায়গা থেকে চলে গিয়েছিল? তারা হয়তো এক নতুন ধরণের সামাজিক ব্যবস্থা আর নিয়মকানুন তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আপনি যখন বিষয়টাকে এভাবে দেখবেন, তখন কয়েকশ বছর পর ইউরোপীয়রা ওই অঞ্চলে যে ধরণের সমাজের মুখোমুখি হয়েছিল, সেগুলোর যোগসূত্র মেলাতে পারবেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ তখনও বেশ হায়ারার্কিকাল ছিল—যেন ছোট ছোট কাহোকিয়া। কিন্তু অন্যরা অত্যন্ত সাম্যবাদী (egalitarian) জীবনযাপন পদ্ধতি গড়ে তুলেছিল। ইউরোপীয়রা স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিয়েছিল যে তারা বোধহয় সবসময় এমনই ছিল। কিন্তু আমরা এখানে এমন মানুষদের কথা বলছি যাদের ইতিহাস সচেতনতা ছিল প্রখর; তাদের নিজেদের ইতিহাসে কাহোকিয়া আর তার বিশাল আঞ্চলিক ব্যবস্থার কথা ছিল। ফলে সেখানে এক ধরণের হায়ারার্কিকাল অতীত ছিল যেখান থেকে মানুষ কোনো না কোনো কারণে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল এবং এক নতুন সমাজ গঠন করেছিল। বইটাতে আমরা এ নিয়ে বেশ বিশদ আলোচনা করেছি কারণ এটি ওই ধারণাকে ভেঙে দেয় যে—আদিবাসী মানুষরা কোনো একটা সাংস্কৃতিক ছাঁচে স্থির হয়ে আছে অথবা তাদের কোনো ইতিহাস নেই।

    অ্যারন বাস্তানি: তেওতিওয়াকান (Teotihuacan) নামে আরেকটা দারুণ উদাহরণ আছে।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: উচ্চারণটা বেশ ভালো হয়েছে। তবে আমার মেক্সিকান সহকর্মী বলেন যে ওখানকার পণ্ডিতরাও সবসময় ‘তেওতিওয়াকান’ (Teotiwa-kan) উচ্চারণ করতে পারেন না। যাই হোক, আমরা সম্ভবত ওটা নিয়েই কথা বলছি। আকার, আয়তন আর জাঁকজমকের দিক থেকে এই নগরটি ছিল রোমের প্রতিদ্বন্দ্বী। এটি ছিল অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত আর কর্তৃত্ববাদী। এরপর সেখানে কিছু একটা বদল আসে। আপনি বইতে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এটি যেন পশ্চিম গোলার্ধের এক ‘প্যারিস কমিউন’। প্রত্নতাত্ত্বিক রেনে মিলনের (Rene Millon) কথা বলতে হয় যিনি এর এক অসাধারণ মানচিত্র তৈরি করেছিলেন। ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ বইতে আমরা ওই ম্যাপটি ব্যবহার করার অনুমতি পেয়েছি। তিনি প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাসে অন্যতম সেরা একটি সারভে পরিচালনা করেছিলেন। ৩০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এর স্বর্ণযুগে এখানে রক্ষণশীল হিসেবে ১ লাখ মানুষের বসতি ছিল, কেউ কেউ সংখ্যাটা এর দ্বিগুণ বলেন। মিলন এবং পরবর্তী গবেষকরা দাবি করেন যে সেখানে জনসংখ্যার ভাগ্যে এক আমূল পরিবর্তন ঘটেছিল। শুরুতে সমাজটি ছিল অত্যন্ত হায়ারার্কিকাল। আপনি যদি আজ সেখানে পর্যটক হিসেবে যান বা গুগলে ছবি দেখেন, তবে সূর্যের পিরামিড (Pyramid of the Sun) এবং চাঁদের পিরামিড (Pyramid of the Moon) নামে দুটি বিশাল স্থাপনা দেখতে পাবেন। এছাড়া টেম্পল অব দ্য ফেদারড সার্পেন্ট (Temple of The Feathered Serpent) নামে আরেকটি বড় স্থাপনা আছে। এগুলো অবশ্য পরবর্তীকালে অ্যাজটেকদের দেওয়া নাম; আমরা জানি না আদি নাম কী ছিল। তো শুরুটা ছিল হায়ারার্কিকাল এবং সেখানেও আচারগত নরবলির প্রমাণ পাওয়া যায়। পিরামিডের ভিত্তির নিচে বন্দিদের মৃতদেহ পুঁতে রাখা হতো; তাদের হাত পেছনে বাঁধা থাকত। কিন্তু ২৫০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে কিছু একটা বদলে গেল। এরপর ওই বিশাল মাপে আর কোনো স্মৃতিস্তম্ভ বা মন্দির তৈরি হয়নি। মন্দির আর পিরামিড তৈরির পেছনে যে শ্রম আর সম্পদ ব্যয় হতো, তা অন্য কাজে ব্যবহার শুরু হলো। আর সেই কাজটি ছিল আবাসন বা হাউজিং। তারা পুরো জনপদ জুড়ে গ্রিড পদ্ধতিতে চমৎকার সব অ্যাপার্টমেন্ট কম্পাউন্ড তৈরি করল। এগুলো খুব একটা উঁচু ছিল না; অনেকটা ভিলার মতো ছিল যেখানে কয়েকটি ছোট পরিবার একসাথে থাকতে পারত। মাঝখানে বিশাল উঠান, মেঝের নিচ দিয়ে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং দেয়ালে চমৎকার সব ম্যুরাল চিত্র ছিল। শুরুতে প্রত্নতাত্ত্বিকরা যখন এগুলো নিয়ে গবেষণা শুরু করেন, তারা ভেবেছিলেন এগুলো বোধহয় রাজপ্রাসাদ। পরে তারা বুঝতে পারলেন যে ওই নগরের সবাই আসলে রাজপ্রাসাদেই বাস করত! এখন আমরা বিষয়টাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করব? আমাদের কাছে তখনকার কোনো লিখিত উৎস নেই। কিন্তু এটুকু বলা যায় যে সেই সময় থেকে ওই নগরের মানুষের জীবনযাত্রার মান ছিল অনেক উন্নত এবং তা নগরের পুরো জনসংখ্যার জন্যই সাধারণ ছিল। এটি সত্যিই অসাধারণ। আপনি যেমন ‘গানস, জার্মস অ্যান্ড স্টিলের’ কথা বলছিলেন। আমরা যদি কয়েকশ বছর এগিয়ে ১৬শ শতাব্দীর সেই স্প্যানিশ দখলদারিত্বের বিজয়ের সময়ের কথা ভাবি তাহলে সেসময়ের বিবরণগুলোতেও নানা ধরণের নগরের কথা পাওয়া যায়। আমরা সাধারণত তেনোচতিৎলান (Tenochtitlan), মন্টেজুমা আর অ্যাজটেক সাম্রাজ্য নিয়ে ভাবি। এই সাম্রাজ্যগুলো ছিল খুব উচ্চ-নীচ ভেদাভেদের শ্রেণিবিন্যস্ত/হায়ারার্কিকাল। কিন্তু হার্নান করতেস এবং তাঁর কনকুইস্তাদোররা (Conquistadors) যে নগরের সাথে হাত মিলিয়ে অ্যাজটেক সাম্রাজ্যকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, তার নাম ছিল ত্লাসকালা (Tlaxcala)। তেনোচতিৎলান আর ত্লাসকালার সম্পর্ক ছিল অনেকটা এথেন্স আর স্পার্টার মতো। একটি ছিল ভীষণ হায়ারার্কিকাল, অন্যটি অত্যন্ত গণতান্ত্রিক। ত্লাসকালা ছিল একধরণের প্রজাতন্ত্র, যেখানে নিজস্ব পার্লামেন্ট ছিল। স্প্যানিশ ভাষায় সেখানে হওয়া বিতর্কগুলোর রেকর্ডও পাওয়া যায়। অথচ আমাদের বিশ্ব ইতিহাসে এগুলোর কোনো উল্লেখ নেই। আমাদের শেখানো হয় যে তেনোচতিৎলানের পতনই ছিল পশ্চিমা বিশ্ব-আধিপত্যের শুরু। কিন্তু আমাদের এটা শেখানো হয় না যে ওই পথের একটি ধাপ ছিল ইউরোপীয় বিজেতাদের সঙ্গে একটি আদিবাসী নগর গণতন্ত্রের এক অসাধারণ মোলাকাত। আমি ওই ব্যবস্থাকে গণতন্ত্র বলতে দ্বিধাবোধ করি না। কারণ সেই সময় ইউরোপেও এই ধরণের নগর খুব একটা দেখা যেত না। করতেস নিজেই স্পেনের রাজাকে চিঠি লিখেছিলেন যে, আমি এমন এক জায়গা খুঁজে পেয়েছি যেখানে কোনো রাজা নেই। এই রাজ্য অনেকটা আমাদের ফ্লোরেন্স বা ভেনিসের মতো অন্য কোনো নীতিতে চলে। এসব তথ্য সামনেই আছে। কিন্তু ইতিহাসে এই তথ্যগুলোকে কখনোই সেই প্রাপ্য গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অথচ এগুলো ছিল ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, প্রাচীন গ্রিস বা রোমের সঙ্গে কোনো সম্পর্কহীন এক আদিবাসী নগর ব্যবস্থা। তেওতিওয়াকানে (Teotihuacan) যা ঘটেছিল তা মূলত ছিল এক সামাজিক বিপ্লব।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, একদমই তাই। ওই প্রত্নস্থানের অনেক বিশেষজ্ঞও মনে করেন যে সেখানে এমন কিছু একটা ঘটেছিল। প্রত্নতত্ত্বে সাধারণত সব বিষয়ে একমত হওয়া কঠিন। তবে সবাই এটুকু স্বীকার করেন যে সেখানে এক আমূল রূপান্তর ঘটেছিল। এমন আলামত অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কারণ মানব ইতিহাসের প্রথাগত বয়ানে আমাদের শেখানো হয় যে, জনসংখ্যা যখন খুব ঘন হয় এবং একবার হায়ারার্কি বা ভেদাভেদ তৈরি হয়, তখন তা আর ফেরানো সম্ভব নয়। কিন্তু এখানে আমরা উল্টোটা দেখছি।

    অ্যারন বাস্তানি: হ্যাঁ, আপনি যেমনটা বলেছেন যে পশ্চিমা রাজনৈতিক ইতিহাসে বলা হয় হাইতি বিপ্লবের আগে কোনো সফল দাস বিদ্রোহ ছিল না। আমাদের জানা মতে এই ধারণা মোটামুটি সঠিক হলেও আমেরিকায় হয়তো বিষয়টা অন্যরকম ছিল। আপনি বইতে একটা চমৎকার আলংকারিক প্রশ্ন তুলেছেন। আমরা যখন দাসপ্রথা বিলোপ নিয়ে কথা বলি, তখন আমরা সিমন বলিভার বা তুসঁ লুভর্তুয়রের কথা বলি। কিন্তু সম্ভবত ইতিহাসে এই প্রথা আরও অনেকবার বিলুপ্ত হয়েছে।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, আমার মনে হয় এই বয়ানগুলো আসলে এক ধ্রুপদী ইউরোপকেন্দ্রিকতা। ভাবা হয় যে অন্য কোথাও হয়তো এসব ঘটেছে কিন্তু ইউরোপীয় প্রেক্ষাপটে না ঘটা পর্যন্ত তার যেন কোনো স্বীকৃতি নেই। এমন চিন্তাভাবনা এক ধরণের ছাঁকুনি যা ইউরোপকে প্রগতিশীল রাজনীতির একচেটিয়া অধিকার দিয়ে দেয়। চরম পর্যায়ে গেলে এই চিন্তাভাবনাই আবার উপনিবেশায়ন আর গণহত্যার যৌক্তিকতা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বলা হয় যে আমরাই তো গণতন্ত্রের মতো সব প্রগতিশীল ধারণা নিয়ে এসেছি যা অন্য কোথাও ছিল না। ফলে তাদের জনপদ ধ্বংস করা বা মানুষ মারার দায়টা ঢাকা পড়ে যায়। তারা বলে যে, অন্তত আমরা তো তাদের একধরণের স্থবিরতা থেকে বের করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে এসেছি। অথচ আমরা বইতে দেখিয়েছি যে ইউরোপের বাইরের জগতেও সচেতন রাজনৈতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার এক বিশাল জগৎ ছিল এবং তার প্রমাণ আমাদের কাছে আছে।

    অ্যারন বাস্তানি: আপনার গবেষণার ক্ষেত্র হলো পশ্চিম এশিয়া আর উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা। যদিও আপনি আমেরিকার বিষয়েও খুব স্পষ্ট ধারণা রাখেন এই ৭০০ পৃষ্ঠার বিশাল বইয়ের জন্য আপনাকে গবেষণা করার কারণে। আমি যেটা নিয়ে কথা বলতে চাই তা হলো, তুরস্কের গোবেকলি তেপে (Gobekli Tepe) কিংবা মাল্টার সেই মেগালিথিক প্রত্নস্থানগুলো প্রসঙ্গে। শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে, কিন্তু শহর বা নগর যদি কৃষির আগে থেকে থাকে—তবে কি এমনটা হওয়া সম্ভব যে ‘হোমো সেপিয়েন্স’ (Homo sapiens) রা অন্য কোনো আদি মানবের (Archaic humans) সাথে একসাথে কোনো নগর পরিবেশে বাস করত? কারণ নিয়ানডার্থালরা তো ইউরোপে বেশ কিছুদিন আগে পর্যন্ত ছিল। আপনার কি মনে হয় এমন কোনো স্থায়ী জনপদ থাকা সম্ভব যেখানে তাদের একই সঙ্গে দেখা গিয়েছে?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: আমি ব্যক্তিগতভাবে গোবেকলি তেপেকে (Gobekli Tepe) এই আলোচনায় আনব না কারণ ওটা অনেক পরের ঘটনা; তখন নিয়ানডার্থালরা ছিল না। মধ্যপ্রাচ্যে আমরা প্রায় ৯০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কথা বলছি। আমি গোবেকলি তেপেকে নগর হিসেবেও সংজ্ঞায়ন করব না। আমি মনে করি গোবেকলি তেপে এমন এক প্রত্নস্থান যেখানে মানুষ স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেছিল এবং এক নির্দিষ্ট সময়ে বিশাল সংখ্যায় মানুষ একত্রিত হয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করত।

    অ্যারন বাস্তানি: আচ্ছা, আমি প্রশ্নটা অন্যভাবে করি। এখানে তো একটি স্থায়ী স্থাপনা ছিল। তো, এমন কোনো জায়গায় মানুষের সাথে অন্য কোনো আদি মানবের একসঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনা আছে কি?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: আমরা যদি আরও অনেক পেছনে—ধরুন প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে ফিরে যাই—তবে আমরা জানি যে তখন পৃথিবীতে অন্তত চার বা পাঁচটি ভিন্ন প্রজাতির মানুষ ছিল। আমরা ছিলাম, নিয়ানডার্থালরা ছিল, ডেনিসোভানরা (Denisovans) ছিল; ইন্দোনেশিয়ায় ছিল হোমো ফ্লোরেসিয়েনসিস (Homo floresiensis), যাদের ভালোবেসে ‘হবিট’ (Hobbits) বলা হয়। এছাড়া ফিলিপাইনের লুজান দ্বীপেও আরও কিছু সাম্প্রতিক আবিষ্কার হয়েছে। আধুনিক সময়ে এমন তুলনীয় পরিস্থিতি নাই যখন মানুষেরই বিভিন্ন প্রজাতি একে অপরের সাথে মিথস্ক্রিয়া করছে। আমরা জেনেটিক্যালি জানি যে তাদের মাঝে নিবিড় সম্পর্ক ছিল এবং আন্তঃপ্রজাতি প্রজননও হয়েছিল। আসলে আপনি যখন আমাদের প্রজাতির উৎসের আরও গভীরে যাবেন, তখন চিত্রটা এমনই দেখাবে। আমরা এখন আফ্রিকার কথা বলছি। এক সময় ধারণা করা হতো এক ‘মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ’ (Mitochondrial Eve) বা কোনো এক আদি সাভানা (Savannah) পরিবেশ থেকে হুট করে আমরা মানুষ হয়ে উঠেছি। আধুনিক ফসিল এবং জেনেটিক প্রমাণ বলছে যে এই ধারণা ভুল। আমরা আফ্রিকাতেই বিবর্তিত হয়েছি, তবে সেটি ছিল একাধিক ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে। সেটা প্রায় ৫ লাখ থেকে ২ লাখ বছর আগের কথা। উপকূলীয় অঞ্চল, বনজঙ্গল এবং সাভানা – এই সব জায়গায় আদি মানবগোষ্ঠীর মধ্যে কখনও বিচ্ছিন্নতা ছিল, আবার কখনও দীর্ঘস্থায়ী যোগাযোগ ছিল। ফলে শারীরিক গঠনেও বিশাল বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছিল। শারীরিক বৈচিত্র্য যদি থেকে থাকে, তবে কল্পনা করুন ভাষা, শিশু লালন-পালন বা সামাজিক রীতিনীতিতে কত ধরণের বৈচিত্র্য ছিল! এসব উপাত্ত মানুষের আদি সমাজ কেমন ছিল তা পুনর্নির্মাণের গভীর প্রোথিত দার্শনিক অভ্যাসকে চ্যালেঞ্জ করে। আসলে কোনো একটি নির্দিষ্ট আদি সমাজ ছিল না; বরং সেখানে ছিল এক বিশাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর সামাজিক রূপের সমাহার। সেই দশাগুলো আমরা এখন কল্পনাও করতে পারি না। আসলে আমরা ওই বিভিন্ন উপপ্রজাতি আর বিভিন্ন ঐতিহ্যের এক সংমিশ্রণ থেকেই এসেছি।


    অ্যারন বাস্তানি: চলুন ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্ব (Pseudo-archaeology) নিয়ে কিছু আলাপ করি, যদি শব্দটা সঠিক হয়ে থাকে। ইদানীং ইন্টারনেট আর ইউটিউবের উত্থানের ফলে ছদ্মপ্রত্নতত্ত্ব সম্ভবত অনেকের জন্য প্রত্নতত্ত্বের জগতে ঢোকার একটা পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা হয়তো এখান থেকেই শুরু করে এবং পরে আপনার মতো কারও কাছে পৌঁছে আসল প্রত্নতত্ত্ব শিখতে আগ্রহী হয়।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, তা হতে পারে। আপনার কী মনে হয়? কেন ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্ব (Pseudo-archaeology) দিন দিন এত জনপ্রিয় হচ্ছে? আমাদের বর্তমান সাংস্কৃতিক কালচেতনার (Zeitgeist) মধ্যে নিশ্চয়ই এই ধরনের প্রত্নতত্ত্বের প্রতি এক ধরণের তীব্র বাসনা কাজ করছে। তবে আমরা ঠিক কী নিয়ে কথা বলছি, সেটা আগে স্পষ্ট করা দরকার। কারণ আমার মতো পেশাদাররা যা পড়ান বা করেন, তার সাথে ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্বের (Pseudo-archaeology) পার্থক্য কী—তা অনেকের কাছে স্পষ্ট নয়। ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে কাজ করেন মূলত এমন সব মানুষ, যারা জীবনে কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক মাঠ-গবেষণায় অংশ নেননি। আমরা এতক্ষণ যেসব প্রমাণ নিয়ে কথা বললাম, সেগুলো গবেষণার সঙ্গেও তারা যুক্ত নন। তারা মূলত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে অতীতের এক ধরণের পুনর্নির্মাণ পেশ করেন। প্রায়ই এগুলোকে খুব রহস্যময় বা ষড়যন্ত্রমূলক (conspiratorial) হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। মনে করা হয় যে, আমার মতো মানুষরা—যারা সারা জীবন এই দক্ষতাগুলো শিখতে আর শেখাতে ব্যয় করছি—তারা আসলে সত্য গোপন করতে চাইছি। আর সেই লুকানো সত্য নাকি কেবল তাঁদের কাছেই আছে যারা এই পেশার সাথে যুক্ত নন! আমি কোনো উন্নাসিকতা দেখাতে চাই না; মানুষের নিজস্ব কল্পনা বা সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মধ্যে ভুল কিছু নেই। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, তাঁরা যেগুলোকে বিশাল কোনো নতুন উদঘাটন হিসেবে তুলে ধরেন, সেগুলো আসলে অনেক পুরনো আর বাতিল হয়ে যাওয়া কিছু তত্ত্ব। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এগুলো মূলধারার প্রত্নতত্ত্বেরই অংশ ছিল; যেমন আটলান্টিসের হারানো নগরী (lost city of Atlantis)। এই ধরণের চিন্তাভাবনা মোটেও নতুন কিছু নয়। আমাদের বই আর আলাপচারিতা থেকে আমি আশা করি এটুকু বোঝা যাচ্ছে যে আসল তথ্যপ্রমাণগুলো নিজেই যথেষ্ট বিস্ময়কর এবং রহস্যময়। বিষয়টাকে আকর্ষণীয় করার জন্য আপনাকে অতিরঞ্জিত কিছু কল্পনা করার প্রয়োজন নেই। আসল রহস্যগুলোর জট খোলার চেষ্টা করাটাই যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং আর উদ্দীপনামূলক। একে কৃত্রিম রহস্য দিয়ে ঘিরে রাখার কোনো দরকার পড়ে না।

    অ্যারন বাস্তানি: ষড়যন্ত্রতত্ত্বের ক্ষেত্রে সবসময়ই এমনটা ঘটে। আপনি কারও সঙ্গে কথা বললে তারা বলবে অমুক ব্যক্তি অমুক কিছু নিয়ন্ত্রণ করছে; এগুলো এক গোপন চক্রের কাজ। অথচ পৃথিবীতে প্রচুর শোষণ আর বঞ্চনা আছে এবং ক্ষমতাধরেরা আসলেও অসাধারণ সব উপায়ে পুরো ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা সেগুলো আসলে শনাক্ত করতে আর বুঝতে পারি। এমন বোঝাপড়ার জন্য বিল্ডারবার্গ গ্রুপ (Bilderberg Group) বা এই জাতীয় অবাস্তব কিছু নিয়ে কথা বলার প্রয়োজন নেই।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: না, তবে একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্বের প্রতিক্রিয়ায় আমার অনেক সহকর্মী যেভাবে সাড়া দেন, তা আমাকে মাঝে মাঝে কিছুটা বিরক্ত করে। তাঁরা অনেকটা এমন ভাবে বলেন যে, আমরাই বিজ্ঞানী, আমরাই সব ভালো জানি এবং আপনি যদি ওসব বিশ্বাস করেন তবে আপনি পাগল। কথাটি এক অর্থে সত্য হলেও আমাদের নিজস্ব শাস্ত্রের ইতিহাসের দিকেও তাকাতে হবে। ইতিহাসচর্চার এই পদ্ধতিগুলো মাঝেমধ্যে বেশ অদ্ভুত হয়ে ওঠে যখন তারা পুরো এক জনগোষ্ঠীর মানবিকতা আর চেতনাকে অস্বীকার করে। যখন ইউরোপীয়রা প্রথম কাহোকিয়ার মতো স্মৃতিস্তম্ভগুলো দেখেছিল, তারা বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে আদিবাসীরা ওগুলো তৈরি করেছে। তখন তারা সব উদ্ভট তত্ত্ব হাজির করল, যেমন লেইফ এরিকসন বা ভাইকিংরা এসেছিল, অথবা এটি ইসরায়েলের হারানো কোনো বংশের কাজ। সেই সময়কার মূলধারার ইউরোপীয় জ্ঞান থেকেই এই ধরণের ধারণাগুলো আসত। আমি মিশরে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার উৎস নিয়ে অনেক কাজ করেছি। পিরামিড বা মমীকরণের মতন বিখ্যাত জিনিসের আগের সময়টাকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলেন প্রাক-রাজবংশীয় যুগ (Pre-dynastic)। নামটা এমন যে মানুষ যেন এতে আগ্রহী না হয়! আপনি যদি এই প্রাক-রাজবংশীয় যুগ নিয়ে কোনো কনফারেন্সে যান, তবে দেখবেন তাঁরা মাটির পাত্রের মাপজোখ নিয়ে পড়ে আছেন। যারা আসলে জানতে চায় ওখানে কী ঘটেছিল, তাদের জন্য বিষয়টি ভীষণ বিরক্তির। আপনি যেখানে পড়াশোনা করেছেন সেই ইউসিএলে পেট্রি মিউজিয়াম আছে। সেই জাদুঘর এখন নিজেরই ইতিহাসের দিকে খুব খোলামেলাভাবে তাকাচ্ছে। যে প্রত্নতত্ত্ববিদের নামে এই মিউজিয়াম, সেই ফ্লিন্ডার্স পেট্রি ছিলেন একজন সুপ্রজননবাদী (eugenicist)। তিনি বিশ্বাস করতেন যে অ-ইউরোপীয়রা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে নিচু মানের। তিনি কপাল বা করোটির গঠনতত্ত্ব (Phrenology) দিয়ে মানুষের মেধা মাপার বিষয়ে খুব আগ্রহী ছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে তাঁর একটা তত্ত্ব ছিল যে—প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা আফ্রিকানদের দ্বারা তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। তাঁর মতে সেখানে অন্য কোনো ‘নতুন নরগোষ্ঠী’ (new race) এসে আক্রমণ চালিয়ে এই সভ্যতা গড়েছিল। আমরা এখন নেটফ্লিক্সে যেসব উদ্ভট তত্ত্ব দেখি, এগুলোও ঠিক ততটাই ভিত্তিহীন ছিল; কিন্তু এগুলো আসত আমাদেরই বিদ্যায়তনিক ক্ষেত্র থেকে। আটলান্টিসের হারানো জাতি নিয়ে ওই ধরণের তত্ত্বগুলো প্রত্যক্ষণলব্ধ প্রমাণের ভিত্তিতে নাকচ করে দেওয়াটা খুব সহজ। কিন্তু লড়াইটা কেবল অর্ধেক। আমাদের নিজেদের ভেতরেও তাকাতে হবে এবং কঠিন প্রশ্নগুলো করতে হবে। এই ধরণের তত্ত্বগুলো জায়গা পায় কীভাবে? আমার মনে হয় জায়গা পাওয়ার মূলে রয়েছে বর্ণবাদ। এই ধারণা যে—সুদূর অতীতে অন্য কোনো মহাদেশের মানুষ আমাদের মতোই বুদ্ধিমান আর সৃজনশীল হতে পারে, তা অনেকে মেনে নিতে পারেন না। যদি কারো মনে এই ধরনের বাধার দেয়াল থাকে, তবে তাকে নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে যে কেন এমনটা হচ্ছে।

    অ্যারন বাস্তানি : তবে এর কিছু অস্পষ্ট উদাহরণও তো আছে। অনেকে বলেন যে স্ফিংস আসলে পিরামিডের চেয়েও অনেক বেশি পুরনো। এটা কোনো এলিয়েন নয় বরং মিশরের মানুষরাই তৈরি করেছে এবং আমাদের বর্তমান ধারণার চেয়ে এটি কয়েক হাজার বছর আগের। আপনি কি একেও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বলবেন?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: না, এটি একটি পুরোপুরি বৈধ প্রশ্ন হতে পারে। তবে আমার মনে হয় না এটি খুব একটা কৌতূহলোদ্দীপক কোনো দিকে আমাদের নিয়ে যায়। এই ধরণের বিষয়গুলো তদন্ত করার পদ্ধতি আমাদের কাছে আছে। তবে পিরামিড আর স্ফিংস তৈরির আগের চতুর্থ রাজবংশের সময়ে কী ঘটছিল—সেই প্রেক্ষাপটটা বুঝতে পারাটাই বেশি জরুরি। আমি দক্ষিণ মিশরের উম্ম এল-কায়াব (Umm el-Qa’ab) নামে একটি জায়গায় গিয়েছিলাম। সেখানে মিশরের প্রথম রাজবংশীয় যুগের আদি রাজকীয় কবরস্থান আছে এবং সেটি আসলেও বিস্ময়কর। সেখানে এক ভয়ংকর চিত্র দেখা যায় যা আমরা ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ বইতেও আলোচনা করেছি। এই কবরস্থানে রয়েছে মিশরের আদি রাজা আর রানীদের সমাধি। মাটির নিচে বড় বড় গর্তের ভেতর সিঁড়ি আর আসবাবপত্রসহ সমাধিগুলো তৈরি করা হতো। আর তার চারপাশে শত শত ছোট ছোট কক্ষ থাকত যেখানে অন্য মানুষদের কবর দেওয়া হতো। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, রাজকীয় কবরের পাশে সমাহিত করার জন্য ওইসব মানুষকে আচারগতভাবে হত্যা করা হতো। শুধু মানুষ নয়, মিশরের একজন আদি রাজা, আমরা প্রারম্ভিক হায়ারোগ্লিফে তার নাম পড়তে পারি – আহা (Aha)। তার সমাধির গর্তে মানুষের পাশাপাশি তিনটি সিংহকেও সমাহিত করা হয়েছিল। এগুলো কি যথেষ্ট চমকপ্রদ নয়? বইয়ের ১০ নম্বর অধ্যায়ে আমরা এগুলো নিয়েই আলাপ করেছি। তথাকথিত প্রাচীন রাষ্ট্রের শুরুতে কেন মানুষের বিরুদ্ধে এমন সুপরিকল্পিত সহিংসতার প্রয়োজন হলো, সেটা অনুসন্ধান করাটাই বেশি রোমাঞ্চকর। এই প্রেক্ষাপটে স্ফিংসের আলাদা কোনো জায়গা নেই। আমরা বরং যাকিছু ঘটেছিল তা পুনর্নির্মাণ করতে পারি এবং সেগুলো তো নিজ-গুণেই অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

    অ্যারন বাস্তানি: কিন্তু একজন ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্ববিদ হয়তো আপনাকে বলবেন যে—এই সভ্যতা প্রথম রাজবংশীয় যুগের চেয়েও পুরনো এবং এটা একটি হারানো সভ্যতা।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: দেখুন, তখনকার সময় নিয়ে আসলে আমরা অনেক কিছুই জানি। আমার পিএইচডি গবেষণার বিষয়ই ছিল খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দ; অর্থাৎ সেই দীর্ঘ সময় যাকে প্রাক-রাজবংশীয় যুগ বলা হয়। সেই সময়ে কী ঘটছিল তা আমরা বেশ ভালোভাবেই জানি। আপনি যেকোনো জাদুঘরে গেলেই তা দেখতে পাবেন। অক্সফোর্ডের অ্যাশমোলিয়ান মিউজিয়াম বা ব্রিটিশ মিউজিয়ামে অসাধারণ সব জিনিস আছে। আমরা সবাই বড় বড় স্মৃতিস্তম্ভ, স্ফিংস বা পিরামিড নিয়ে মেতে থাকি। কিন্তু আপনি যদি সাধারণ মানুষের দিকে এবং বিশেষ করে তাদের সমাধির দিকে নজর দেন, তবে অনেক কিছু স্পষ্ট হয়ে যায়। মৃত্যুর পরের বিভিন্ন আচারের ক্ষেত্রে মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হতো, সেগুলোর বিবর্তনটা কয়েক হাজার বছর ধরে মিশরে খুব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। প্রথম রাজবংশীয় যুগ বা ফারাওদের উত্থানের আগে প্রায় যে কাউকেই রাজপুত্রের মতো জাঁকজমকভাবে সমাহিত করা যেত। সুন্দর কারুকাজ করা অলঙ্কার, ব্যক্তিগত নকশা করা মাটির পাত্র আর প্রসাধন সামগ্রী তাদের সাথে দেওয়া হতো। কিন্তু যখনই রাজতন্ত্র আর ফারাও শাসনের উত্থান ঘটল, তখন সাধারণ মানুষ তাদের নিজেদের জীবনের এই নান্দনিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। তারা আর আগের মতো নিজেদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া পরিচালনা করতে পারছিল না। ইনকা সাম্রাজ্যের উত্থানের সময়ও আমরা একই চিত্র দেখতে পাই যেকথা স্প্যানিশদের বিবরণ থেকে জানা যায়। সেখানে বিবাহ বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মতো কোনো সামাজিক আচার পালনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু সম্পদের প্রয়োজন হতো; যেমন শস্য থেকে তৈরি ‘চিচা’ (Chicha) নামে পরিচিত পানীয়। কিন্তু সবাই তো সেই সম্পদ সমানভাবে পেত না। ঠিক একইভাবে মিশরের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতেও এক পর্যায়ে শস্য আর বিয়ারের প্রয়োজন হতো। কিন্তু এসবকিছু ব্যবহারের জন্য আপনাকে সেই ভূসম্পত্তির ওপর অধিকার থাকতে হতো যেখানে চাষাবাদ হয়। ফলে যেসব মানুষ তাদের পরিবারের এই সামাজিক আচারগুলো পালন করতে পারত না তারা এক পর্যায়ে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ত। আমি এখানে কেবল বেঁচে থাকার কথা বলছি না, বরং সামাজিক কর্তব্যের কথা বলছি। এই ঋণের সম্পর্ক থেকেই এক সময় উচ্চ-নিচ ভেদাভেদ আর পরাধীনতার জন্ম হয়। মানুষ যখন তাদের জীবনের মৌলিক আচারগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখনই এই ধরণের বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাগুলো গড়ে ওঠে।

    অ্যারন বাস্তানি: আপনার ভবিষ্যতের প্রজেক্টগুলো কী কী?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: আমি এই মুহূর্তে বেশ কিছু সাইড প্রজেক্টের সাথে যুক্ত আছি। খুব গভীর গবেষণার জন্য এখন তেমন সময় পাচ্ছি না। তাই আমি এমন কিছু কাজ করছি যেগুলো কেবল লেখালেখি নয়, বরং নিজেকে সক্রিয় রাখার চেষ্টা। গোল্ডস্মিথস কলেজের ফরেনসিক আর্কিটেকচার নামের একটি দলের সাথে আমি কাজ করছি। তারা মূলত মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে। আমাজনের বন উজাড় থেকে শুরু করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড — নানা বিষয়ে তারা স্থাপত্যবিদ্যার মডেল ব্যবহার করে আদালতে তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করে। ইয়াল ওয়াইজম্যান (Eyal Weizman) এবং তাঁর অসাধারণ দলের সাথে আমার এই কাজ চলছে। জার্মানিতে ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ নিয়ে তিন দিনের একটি বড় ইভেন্ট হয়েছিল যেখানে ইয়াল একটি প্রেজেন্টেশন দিয়েছিলেন এবং সেটি আমাকে মুগ্ধ করেছিল। লন্ডনে ফিরে আসার পর আমরা কফি খেতে গিয়েছিলাম এবং বইটির ওপর তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমাদের দারুণ আলাপ হয়। প্রথমে আমি আমাদের কাজের মধ্যে কোনো মিল খুঁজে পাইনি কারণ সময়ের ব্যাপ্তিটা ছিল আমূল ভিন্ন। কিন্তু তিনি আমাদের বইটিকে ফরেনসিক আর্কিটেকচারের একটি বিস্তৃত কেস স্টাডি হিসেবে দেখেছিলেন। কারণ এটি একটি রাষ্ট্র-বিরোধী আখ্যান। অনেক সময় আপনি হয়তো বিকল্প কোনো ঘটনার সত্যতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করতে পারবেন না, কিন্তু আপনি যদি সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক বয়ানের ফুটোগুলো দেখিয়ে দিতে পারেন, তবেই সেটি নড়বড়ে হয়ে যায়। আর যখনই প্রথাগত বয়ানটি নড়বড়ে হয়, তখনই নতুন কোনো সম্ভাবনার পথ খুলে যায়। আমি দেখলাম বইটির ক্ষেত্রে আমরা ঠিক একই যুক্তি ব্যবহার করেছি। তাই আমরা ইউক্রেনের কিছু অসাধারণ প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মেসোপটেমিয়া বা বর্তমান ইরাক আর সিরিয়ার আদি নগরগুলোর সমসাময়িক কিছু নগর ইউক্রেনেও পাওয়া গিয়েছে। আজ থেকে প্রায় ৬০০০ বছর আগের এই বিশাল নগরগুলোতে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কেন্দ্রীভূত শাসনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। এ নিয়ে বিশাল বিতর্ক আছে যে এগুলোকে নগর বলা হবে নাকি ‘অতিকায় গ্রাম’ বা মেগা-সাইট (Mega sites) বলা হবে। এই বসতিগুলো মূলত আমাদের ভাবায় যে ‘নগর’ বলতে আমরা আসলে কী বুঝি এবং আমাদের মনে আগে থেকেই কী ধরণের ধারণা গেঁথে আছে। আমরা একটি ভিজ্যুয়াল ইনস্টলেশন তৈরি করছি যা সরাসরি কোনো উত্তর না দিলেও দর্শকদের এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে। এটি একটি প্রজেক্ট। এর বাইরে ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ প্রকাশের পর আমি সবচেয়ে বেশি সাড়া পেয়েছি সৃজনশীল মানুষদের কাছ থেকে—যেমন সংগীতশিল্পী, শিল্পী আর চলচ্চিত্র নির্মাতা। গত সপ্তাহে প্যারিসের ইয়াসমিন ডিবোয়া নামের একজন চমৎকার গায়িকার সাথে দেখা হলো যাঁর স্টেজ নাম হলো ‘লাফান্ডা’ (Lafawndah)। তিনি ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ নামে একটি গান লিখেছেন এবং কয়েক সপ্তাহ আগে লন্ডনে সেটি পরিবেশন করেছেন। ইরানে মানবাধিকার আন্দোলন ‘উইমেন লাইফ ফ্রিডম’-এর একটি অনুষ্ঠানে তিনি এটি গেয়েছেন। আমি শিকাগো থেকে ফেরার কারণে ক্লান্তিতে সেখানে উপস্থিত হতে পারিনি যা আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছিল। এই ধরণের সাড়া আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়। আমার মনে হয় এটি আমার সহ-লেখক প্রয়াত ডেভিডের  প্রতি এক বিশাল শ্রদ্ধাঞ্জলি। তাঁর এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল কঠিন আর অস্পষ্ট বিষয়গুলোকে এমনভাবে লিখে ফেলার যা মানুষের মন ছুঁয়ে যেত। মানুষ এতে নিজেকে যুক্ত করতে পারত এবং নতুন কিছু করার অনুপ্রেরণা পেত। আমি এগুলোকে তাঁর প্রতি এক সম্মিলিত শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবেই দেখি এবং আমি নিজেকে এই কর্মকাণ্ডে একজন ভাগ্যবান সহযাত্রী মনে করি।

    অ্যারন বাস্তানি: সম্ভব হলে ডেভিড সম্পর্কে একটা শেষ প্রশ্ন করতে চাই। ডেভিড গ্রেবার আপনার এই বইয়ের সহ-লেখক ছিলেন। ২০২০ সালে সম্ভবত তিনি টুইট করেছিলেন যে পাণ্ডুলিপি তৈরির কাজ শেষ হয়েছে।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, ঠিক তাই। তিনি জিম মরিসনের একটা ছদ্ম-উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছিলেন— ‘আমার মস্তিষ্ক যেন অসাড় বিস্ময়ে আহত, আমরা শেষ করেছি’— অথবা এই ধরণের কিছু একটা।

    অ্যারন বাস্তানি: আর এর এক মাস পরেই তিনি মারা গেলেন।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, পাণ্ডুলিপি শেষ করার প্রায় তিন সপ্তাহ পর। মাত্র তিন সপ্তাহ।

    অ্যারন বাস্তানি: তো এমন একটা বই প্রকাশ করার অভিজ্ঞতা কেমন— যা বিশ্বজুড়ে ‘বেস্টসেলার’ হয়েছে এবং অনেক ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে? একজনের সাথে দীর্ঘ এক দশক ধরে কাজ করার পর যখন বড় ধরনের সাফল্য এল, তখন তিনি তা ভাগ করে নেওয়ার জন্য আর পাশে নেই— বিষয়টা কেমন?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: আসলে আমাকে দুইভাবে বিষয়টি অনুভব করতে হয়। একটা হলো ভালো অনুভূতি— বইটি যেভাবে সমাদৃত হয়েছে তা অসাধারণ। সম্প্রতি একজন আমাকে কিছু তথ্য দিলেন যে বিশ্বজুড়ে বইটির প্রায় ১০ লাখ কপি বিক্রি হতে চলেছে; ভাবতেই অবাক লাগে। তবে অন্য অনুভূতিটা খুব যন্ত্রণাদায়ক। অবিরামভাবে এই বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া যে ডেভিড এসবের সাক্ষী হওয়ার জন্য বেঁচে নেই। তিনি এই বইটির জন্য খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন; তাঁর তর সইছিল না বইটা মানুষের হাতে তুলে দিয়ে এই ধরণের আলোচনা করার জন্য। আসলে আপনার সাথে এখানে বসে আড্ডা দেওয়া আর এসব বিষয় নিয়ে আলাপ করার সময় আমাদের দুজনেরই থাকার কথা ছিল। তাই এই অনুভূতি একইসঙ্গে খুব যন্ত্রণাদায়ক এবং এক ধরণের প্যারাডক্স। এসবের মধ্যে আমি শুধু একটা বিশ্বাসই আঁকড়ে ধরি। তিনি অবশ্যই চাইতেন আমি যেন বাইরে বের হই, কঠোর পরিশ্রম করি এবং মানুষকে এই বই আর আমাদের কাজগুলো নিয়ে জানাই। আমি যথাসাধ্য সেটাই করার চেষ্টা করছি; বলতে পারেন কাজটা আমি খানিকটা তাঁর জন্যই করছি। যখন আমি একটু বাড়তি শ্রম দিই, তখন তাঁর কথাই মনে হয়।

    অ্যারন বাস্তানি: একদম ঠিক। ডেভিড ওয়েনগ্রো, আমাদের সাথে যোগ দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: আমারও খুব ভালো লেগেছে, ধন্যবাদ।

    [সূত্র : Everything We Think We Know About Early Human History is Wrong | David Wengrow on Downstream); নোভারা মিডিয়া (Novara Media) | ৪ ডিসেম্বর, ২০২২

    ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬; অরুণাপল্লী, সাভার, ঢাকা

  • গাজা প্রসঙ্গে হ্যাবারমাসদের চিন্তা-রাজনীতির ‘ভন্ডামি’ ও আসেফ বায়াতের চিঠি

    গাজা প্রসঙ্গে হ্যাবারমাসদের চিন্তা-রাজনীতির ‘ভন্ডামি’ ও আসেফ বায়াতের চিঠি

    • নাজমুল আরেফিন

    আজকে আমরা ‘ক্রিটিকাল থিওরি’ বলতে যা বুঝি তার আধুনিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের ভূমিকা লিখে শেষ করা যাবে না। ‘নয়া বামধারার পিতা’ নামে পরিচিত হার্বাট মারকুস (১৮৯৮-১৯৭৯) এই ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের একজন অন্যতম সদস্য ছিলেন। মারকুসের ‘ওয়ান ডাইমেনশনাল ম্যান’(১৯৬৪) আমার জীবনে পড়া গুরুত্বপূর্ণ ফরমেটিভ টেক্সটের একটা। আমাদের বাংলাদেশের যুদ্ধকালীন সময়ে মারকুস এক সপ্তাহের জন্য ইসরায়েলে যান। মারকুসের বয়স তখন ৭২। তিনি ফিরে এসে ৪ পাতার একটা বিবৃতি লিখলেন। সেখানে তিনি ইসরায়েলের মিলিটারি অকুপেশনকে যেকোন মূল্যে বন্ধ করতে বললেন। সেখানে তিনি ইসরায়েলকে একটি ‘দখলদার শক্তি’ এবং ফিলিস্তিনি আন্দোলনকে ‘জাতীয় মুক্তি আন্দোলন’ হিসেবে দেখিয়ে ইসরায়েলকে সতর্ক করলেন যে ইসরায়েলের বর্তমান দখলদারী নীতি তাদের নাৎসি ঘটনার পুনরাবৃত্তির দিকে পরিচালিত করতে পারে।[1] তিনি ইহুদিদের অস্তিত্বের অধিকারের স্বার্থে ইসরায়েল রাষ্ট্র চেয়েছিলেন বটে কিন্তু স্বাধীন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের প্রতি ঘোর সমর্থন জানিয়েছিলেন। একজন ইহুদি হওয়া সত্ত্বেও তাকে ‘ইহুদি-বিদ্বেষি’ গালি খেতে হয়েছে বহুবার। তাকে মুন্নী সাহা কায়দায় একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল ‘Jewishness’ নিয়ে আপনার নিজের অনুভূতি কি? তিনি বলেছিলেন, ইহুদিরা যতদিন আন্ডারডগ ছিল ততদিন আমি এই পরিচয়ের সাথে একত্বতা ঘোষণা করতাম। কিন্তু এখন ইহুদিরা এমন জাতিতে পরিণত হয়েছে যারা নিজেরাই অন্য আন্ডারডগদের উপর চড়াও। তাই আমার জন্য নিজেকে এই পরিচয়ে পরিচিত করা আরও কঠিন।[2]

    হেবারমাস, এআই জেনারেটেড

    সেই হার্বাট মারকুসের পিএইচডি ছাত্রী ছিলেন আমেরিকান বামপন্থী নারীবাদের পোস্টার গার্ল, রাজনৈতিক এক্টিভিস্ট, দার্শনিক অ্যাঞ্জেলা ডেভিস। আমেরিকার আধুনিক বর্ণবাদের একজন জলজ্যান্ত স্বাক্ষী এই অ্যাঞ্জেলা ডেভিস। ডেভিস সম্প্রতি আলজাজিরার আপফ্রন্টে বলেছেন ব্ল্যাকদের মুক্তি আন্দোলন আর ফিলিস্তিনিদের মুক্তি সংগ্রাম একই সূত্রে গাঁথা। আমেরিকায় ব্ল্যাকদের প্রতি যে বর্ণবাদ, দক্ষিণ আফ্রিকায় যে বর্ণবাদ, আর ইসরায়েলি বর্ণবাদ তা নানানভাবে সংযুক্ত। তাই “প্যালেস্টাইন বিশ্বের জন্য একটি নৈতিক লিটমাস টেস্ট”।

    অ্যাঞ্জেলা ডেভিসের সাথে আমি পুরোপুরি একমত। এই লিটমাস টেস্ট দিয়ে আমরা এখন পশ্চিমা চিন্তাবিদদের হিপোক্রেসি বা ভন্ডামিগুলো আরও স্পষ্ট ভাবে দেখতে পারি। যাচাই করতে পারি। আজকের ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের রাজনীতি-চিন্তার ভন্ডামি ঠিক যেমনটি যাচাই করেছেন প্রফেসর আসেফ বায়াত। আসেফ বায়াত সম্পর্কে হয়তো অনেকের ধারণা নাও থাকতে পারে। তাই উনার সম্পর্কে দুলাইন খরচ করি। আসেফ বায়াত ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়, আরবানা-শ্যাম্পেইনের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের গ্লোবাল এবং ট্রান্সন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক। তিনি “post-Islamism” তত্ত্বের প্রবক্তা। ২০০৯ সালে প্রকাশিত “Life as Politics: How Ordinary People Change the Middle East” (Stanford University Press), এবং ২০১৩ সালে প্রকাশিত “Post-Islamism: The Changing Faces of Political Islam” (Oxford University Press) বই দুটি তাকে একাডেমিক দুনিয়ায় স্বনামে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ‘আরব বসন্ত’কে ক্রিটিকাল ডিল করে তাত্ত্বিক রুপ দিতেও তিনি প্রচুর কাজ করেছেন।

    ছবি: টুরিং অব গোয়ের্নিকা গাজা উৎস: আরব কালচারাল ফান্ড

    গত ১৩ নভেম্বর, ২০২৩, Goethe University Frankfurt-এর “Normative Orders” গবেষণা সেন্টার থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের মহারথী দার্শনিক য়ুর্গেন হ্যাবারমাসের একটি বিবৃতি ছাপানো হয়। যার জার্মান শিরোনাম “Grundsätze der Solidarität. Eine Stellungnahme”। ইংরেজিতে মানে দাঁড়ায় “Principles of solidarity. A statement”। হ্যাবারমাসের সাথে ফ্রাঙ্কফুর্ট ভিত্তিক আরও তিনজন প্রথিতযশা একাডেমিক এই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন। নিকোল ডাইটেলহফ, রেইনার ফার্স্ট, এবং ক্লাউস গুন্টার। সন্দেহ নাই যে হ্যাবারমাসের নাম থাকাতেই এই বিবৃতি পুরো ইউরোপ তথা পশ্চিমা বিশ্ব জুড়ে ভাইরাল হয়। কি আছে এই বিবৃতিতে? যদি সংক্ষেপে বলতে হয় এর মূল কথা হল, ৭ই অক্টোবরের হামাসের সন্ত্রাসী হামলা ইহুদি জীবনকে নির্মূল করার ঘোষিত অভিপ্রায় নিয়েই করা হয়েছে। এই ঘটনাই মূলত ইসরায়েলকে পাল্টা আক্রমণ করতে প্ররোচিত করেছে। এবং ইসরায়েলের এই রিটালিয়েশন বা পাল্টা আক্রমণ ন্যায়সঙ্গত (“justified in principle”)। বেসামরিক মানুষ যাতে না মরে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে—এই মুখস্থ সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ দেবার পর হ্যাবারমাসরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জার্মানিতে ইসরায়েলের এই কর্মকান্ড কোনওভাবেই এন্টি-সেমেটিক প্রতিক্রিয়ার ন্যায্যতা দেয় না। বিশেষ করে জার্মানিতে তা সহ্য করা হবে না। হ্যাবারমাস গং জার্মানবাসীকে আরও মনে করিয়ে দেন যে ফেডারেল রিপাবলিক অফ জার্মানির গণতান্ত্রিক নৈতিকতা হলো “মানুষের মর্যাদাকে সম্মান করার বাধ্যবাধকতা”। কিন্তু এখানে হ্যাবারমাসদের কাছে মানুষ মানে শুধু হলো ‘ইহুদি’ পরিচয়। জীবন মানে শুধু হলো ‘ইহুদি জীবন’। ৭০ দশকের বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনি মানুষের অমানবিক মর্যাদাহীনতা, কিংবা হাজারো লাশ উনাদের কাছে ম্যাটার করে না। তাই এই বিবৃতিতে উনারা জার্মানবাসীদের নাৎসি হলোকাস্টকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছেন—ইহুদি জীবন এবং ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকারকে বিশেষ ভাবে সুরক্ষিত রাখার প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকা আমাদের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম মৌলিক নৈতিকতা।

    আসেফ বায়াত হ্যাবারমাসের অনেক তাত্ত্বিক চিন্তা দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন। হ্যাবারমাসের “পাবলিক স্ফিয়ার” ধারণাকে ইরান তথা মধ্যপ্রাচ্য প্রেক্ষিতে নানানভাবে কাজে লাগিয়ে ছিলেন। এই বিবৃতি আসেফকে স্বাভাবিকভাবেই খুবই আহত করে। গত ডিসেম্বরের ৮ তারিখ তিনি সেই ক্ষোভ থেকে হ্যাবারমাসকে উদ্দেশ্য করে একটি খোলা চিঠি লেখেন। চিঠিটা শুধু হ্যাবারমাসদের ভন্ডামিকে বুঝতেই সাহায্য করেনা বরং ইউরোপের ক্রিটিকাল চিন্তার রাজনীতি বোঝার জন্য নানান দিক থেকে এটি তাৎপর্যপূর্ণ। আজকের ফিলিস্তিনি গণহত্যা শুধু আজকের ক্রাইসিস না। শুধু ‘পোস্ট-অক্টোবর ৭’ সিজন থেকে এই ক্রাইসিস বোঝার কোন সুযোগ নেই। পঞ্চাশের দশক থেকে যে সেটলার কলোনিয়াল ড্রামা দিনে দিনে এতদূর এসেছে তা বোঝার জন্য আগের প্রতিটি সিজন, প্রতিটি এপিসোড গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। এবং তা দেখা শুরু করলেই বোঝা যায় ইউরোপের কতখানি হাত এই ক্রাইসিসের মূলে। গ্রীসের ক্রিটিকাল অর্থনীতিবিদ ইয়ানিস ভারোফাকিসের তাই সরল স্বীকারোক্তি—“আমাদের ইউরোপীয়ানদের লজ্জায় মাথা নিচু করে হাটা উচিত…আমরা ইউরোপীয়রা এটি (আজকের ক্রাইসিস) তৈরি করেছি…[প্রথমে] আমরা শত বছর ধরে ইহুদি-বিদ্বেষি প্রোগ্রাম বানিয়েছি, তারপর ইহুদিদের হলোকাস্টে ঢুকিয়েছি…আবার তারপর ‘আ ল্যান্ড উইদাউট আ পিপল ফর আ পিপল উইদআউট আ ল্যান্ড’ এর মত জঘন্য একটা মতবাদ বা নীতিকে সাপোর্ট করেছি। মনে হয় যেন প্যালেস্টাইন জনমানব শূন্য ছিল। মূলত এটি দখলদার হোয়াইট সুপ্রেমেসিস্ট ভাষা যা ব্রিটিশরা অস্ট্রেলিয়াতে আদিবাসীদের গণহত্যার ন্যায্যতা প্রমাণের জন্য অস্ট্রেলিয়াকে একটি ‘জনশুন্য খালি জমি’ হিসাবে ঘোষণা করতে ব্যবহার করেছিল।”[3]

    উৎস: ফ্রিপিকস

    হ্যাবারমাসরা এই পুরো ইতিহাসকে মুছে ফেলে জার্মান নাৎসিদের করা অন্যায়ের খেসারত দিতে সবাইকে চুপ থাকতে বলছেন। যারা কথা বলছেন, সমালোচনা করছেন তাদেরকে ঢালাওভাবে ইহুদি-বিদ্বেষি ট্যাগ দিচ্ছেন। এই ইন্টেলেকচুয়াল হিপোক্রেটিক পজিশন হ্যাবারমাসের নিজের দেওয়া বড় বড় তত্ত্বের সাথে কতখানি সাংঘর্ষিক তা আসেফ বায়াত তার চিঠিতে দারুণভাবে দেখিয়েছেন। জার্মানিতে গাজা নিয়ে কথা বললে কিভাবে ‘এন্টিসেমেটিক’ তকমা দিয়ে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হচ্ছে, ফ্রাঙ্কফুর্টের মত শহরে যা কিনা ক্রিটিকাল চিন্তার সূতিকাঘর হিসেবে পরিচিত সেখানেও ফিলিস্তিনিদের পুরস্কার-সম্মাননা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে সেসব ব্যাপারে হ্যাবারমাসদের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বায়াত।

    হ্যাবারমাস “public sphere,” “rational dialogue”, “deliberative democracy” ইত্যাদি ধারণাগুলোর আধুনিক প্রবক্তা। অথচ বর্তমান জার্মানিতে (পড়ুন ‘পোস্ট-সেক্যুলার’ ইউরোপে) এই ধারণাগুলোর কি করুণ অবস্থা; এবং খোদ হ্যাবারমাস এই ধারণাগুলোর প্র্যাক্টিসের সময় কতখানি বিপরীতে অবস্থান করেন তা গাজা ‘লিটমাস টেস্ট’ আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল কি? আসেফ বায়াত হ্যাবারমাসের মত রকস্টার তাত্ত্বিকদের স্ববিরোধিতা সম্পর্কে সেই উদ্বেগ বার বার প্রকাশ করেছেন তার চিঠিতে। চলুন একটু ধৈর্য নিয়ে উনার পুরো চিঠিটা পড়া যাক (চিঠিটা খুবই অল্প সময়ে যতটা সম্ভব মূলের সাথে মিল রেখে প্রফেসর বায়াতের কাছে অনুমতি নিয়ে অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি। ভুল ত্রুটি মার্জনীয়):

    প্রিয় অধ্যাপক হ্যাবারমাস,

    আপনি হয়তো আমাকে মনে করতে পারবেন না, কিন্তু ১৯৯৮ সালের মার্চ মাসে মিশরে আমাদের দেখা হয়েছিল। আপনি কায়রোর আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ে distinguished Visiting Professor হিসেবে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং পাবলিকের সাথে সংযুক্ত হতে এসেছিলেন। সবাই আপনাকে শোনার জন্য উৎসুক ছিল। যখন মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামপন্থী এবং স্বৈরাচারীরা “ইসলামকে রক্ষা করার” ছদ্মবেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে দমন করছিল, সেই দমবন্ধ সময়ে “পাবলিক স্ফিয়ার”, “যুক্তিসঙ্গত সংলাপ” এবং গণতান্ত্রিক জীবন সম্পর্কে আপনার [তাত্ত্বিক] চিন্তাগুলি তাজা বাতাসের মত হাজির হলো। এক সহকর্মীর বাড়িতে রাতের খাবারের সময় ইরান ও ধর্মীয় রাজনীতি নিয়ে আমাদের মধ্যে যে দারুণ কথোপকথন হয়েছিল তা আমার এখনও মনে আছে। আমি আপনাকে ইরানে “ইসলাম-পরবর্তী” (post-Islamist)  সমাজের উত্থান সম্পর্কে জানানোর চেষ্টা করেছিলাম, সেটা আপনি ২০০২ সালে যখন আবার তেহরান ভ্রমণে আসেন অনুভবও করেছিলেন বলে মনে হয়। তখনও আপনি ইউরোপের “ধর্মনিরপেক্ষ-পরবর্তী” (post-secular) সমাজ নিয়ে কথা বলা শুরু করেন নি। আমরা আপনার মূল তাত্ত্বিক ধারণাগুলির মাধ্যমে কায়রোতে একটি আন্তঃদেশীয় পাবলিক স্ফিয়ার এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপ গড়ে তোলার এক বিরাট সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলাম। মুক্ত বিতর্কের মাধ্যমে কীভাবে ঐক্যমতের-সত্যে পৌঁছানো যায় সে সম্পর্কে ধারণা পেতে আপনার কমিউনিকেটিভ ফিলোসফির মূল বিষয়বস্তুকে আমরা খুবই গুরুত্ব সহকারে নিয়েছিলাম।

    আর এখন, প্রায় ২৫ বছর পর, বার্লিনে বসে গাজা যুদ্ধের উপর আপনার যৌথ-লিখিত “Principles of Solidarity”  বিবৃতিটি যথেষ্ট উদ্বেগ এবং শংকা নিয়ে পড়লাম। বিবৃতিটি মূলত জার্মানিতে যারা ৭ই অক্টোবর হামাসের ভয়ঙ্কর হামলার প্রতিক্রিয়ায় গাজায় ইসরায়েলের নিরলস বোমাবর্ষণের বিরুদ্ধে বিবৃতি বা প্রতিবাদের মাধ্যমে স্বরব তাদেরকে তিরস্কার করার জন্যই লেখা। এর থেকে বোঝা যায় যে, ইসরায়েলের এই সমালোচনাগুলি [আপনাদের কাছে] অসহনীয়। কারণ ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন জার্মান রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি মৌলিক দিক—“যার মূল আলাপ হলো ইহুদি জীবন এবং ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার বিশেষ সুরক্ষার দাবিদার”। এই “বিশেষ সুরক্ষা” নীতির যে বয়ান তার বীজ মূলত জার্মানির ব্যতিক্রমী ইতিহাসের “নাৎসি যুগের গণ-অপরাধের” মধ্যে নিহিত।

    এটা প্রশংসনীয় যে আপনি এবং আপনার দেশের রাজনৈতিক-বুদ্ধিজীবী শ্রেণী সেই ঐতিহাসিক ভয়াবহতার স্মৃতি ধরে রাখতে অনড়, যাতে ইহুদিদের (এবং আমি অনুমান ও আশা করি অন্যান্য মানুষদের) উপর একই ধরনের ভয়াবহতার প্রভাব না পড়ে। কিন্তু আপনার জার্মান ব্যতিক্রমবাদের উপর ভিত্তি করে বানানো ফর্মুলা এবং অনড়তা ইসরায়েলের নীতি এবং ফিলিস্তিনি অধিকার সম্পর্কে আলাপের জন্য কার্যত কোন পথই খোলা রাখেনা। আপনি যখন “ইসরায়েলের কর্মকান্ডের” সমালোচনাকে “ইহুদি বিরোধী প্রতিক্রিয়া” বলে বানচাল করছেন, তখন আপনি [আসলে] চুপ থাকতে এবং বিতর্ককে দমন করতে উৎসাহিত করছেন।

    একজন একাডেমিক হিসেবে আমি এটা জেনে হতভম্ব হয়েছি যে জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে-এমনকি শ্রেণিকক্ষের মধ্যেও, যা কিনা আলোচনা ও অনুসন্ধানের জন্য মুক্ত স্থান হওয়া উচিত-সেখানে প্যালেস্টাইনের বিষয়টি সামনে এলে প্রায় সবাই চুপ থাকে। সংবাদপত্র, রেডিও এবং টেলিভিশন এই বিষয়ে খোলামেলা এবং অর্থপূর্ণ বিতর্ক থেকে প্রায় সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত। যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো ইহুদি সহ বহু লোককে তাদের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে, তাদের অনুষ্ঠান এবং পুরষ্কার বাতিল করা হয়েছে এবং “ইহুদি বিদ্বেষের” অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। স্বাধীনভাবে কথা বলতে না দিলে কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল সে বিষয়ে মানুষ চিন্তাভাবনা করে কীভাবে? “পাবলিক স্ফিয়ার”, “যুক্তিসঙ্গত সংলাপ” এবং “সুচিন্তিত গণতন্ত্র” (deliberative democracy) আপনার এইসব বিখ্যাত [তাত্ত্বিক] ধারণাগুলো এখন তাহলে কোথায় গিয়ে দাঁড়ালো?বাস্তবতা হলো, আপনি যে সমালোচক ও প্রতিবাদগুলোকে তিরস্কার করছেন, তাদের অধিকাংশই কখনোই ইহুদিদের জীবন রক্ষার নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে নি। এবং দয়া করে ইসরায়েলি সরকারের এই যুক্তিসঙ্গত সমালোচকদের সাথে ফালতু চরম-ডানপন্থী নব্য-নাৎসি বা অন্যান্য ইহুদি বিরোধীদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না, তাদের জন্য অবশ্যই [আলাদাভাবে] তীব্র নিন্দা ও মোকাবিলা জারি রাখতে হবে।

    আমার পড়া প্রায় প্রতিটি বিবৃতিই ইসরায়েলে বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে হামাসের নৃশংসতা এবং ইহুদি বিদ্বেষ উভয়কেই নিন্দা করেছে। এই সমালোচকরা ইহুদিদের জীবন রক্ষা বা ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার নিয়ে মোটেও কোন বিতর্ক করছেন না। তারা ফিলিস্তিনিদের জীবন এবং প্যালেস্টাইনের অস্তিত্বের অধিকার নিয়ে যে ডিনায়াল তা নিয়ে বিতর্ক করছেন। অথচ (ডিনায়ালের) এই দিকটা নিয়ে আপনাদের দেওয়া বিবৃতি দুঃখজনকভাবে নীরব।

    (আপনাদের) বিবৃতিতে এক বারের জন্যেও ইসরায়েলকে একটি দখলদার শক্তি বা গাজাকে একটি উন্মুক্ত কারাগার হিসাবে উল্লেখ করা হয়নি। না আছে (ইসরায়েলের) বিকৃত বৈষম্য সম্পর্কে কোন কথা। এটি দখলকৃত পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি জীবনের দৈনন্দিন ধ্বংসের কথা বলার জন্য লেখা হয়নি। “ইসরায়েলের কর্মকান্ড”—যা আপনি “নীতিগতভাবে ন্যায়সঙ্গত” বলে মনে করেন—একটি প্রতিরক্ষাহীন জনসংখ্যার উপর ছয় দিনের মধ্যে ৬০০০ বোমা ফেলেছে; ১৫০০০ এরও বেশি মানুষ মেরেছে (তাদের মধ্যে ৭০% মহিলা ও শিশু), ৩৫০০০ আহত করেছে; ৭০০০ মানুষকে নিখোঁজ বানিয়েছে; এবং ১.৭ মিলিয়নকে করেছে বাস্তুচ্যুত। পুরো একটা জনসংখ্যাকে খাদ্য, জল, আবাসন, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করার নিষ্ঠুরতার কথা তো বাদই থাকলো। (গোটা ফিলিস্তিনি) জীবনের মূল পরিকাঠামোই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

    যেখানে আপনার বিবৃতিতে আপনি বোঝাচ্ছেন যে, এগুলি প্রযুক্তিগতভাবে “গণহত্যার অভিপ্রায়” নাও হতে পারে, জাতিসংঘের কর্মকর্তারা দ্ব্যর্থহীনভাবে এগুলিকে “যুদ্ধাপরাধ”, “জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি” এবং “জাতিগত নির্মূলকরণ” নামে অভিহিত করেছেন। এখানে আমার উদ্বেগ আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে “ইসরায়েলের কর্মকান্ড” কীভাবে বিচার করা যায় তা নিয়ে নয়, বরং এই ধরনের বিস্ময়কর ধ্বংসযজ্ঞের মুখে আপনি যে নৈতিক শীতলতা এবং উদাসীনতা দেখাচ্ছেন তার গভীরতা কীভাবে নির্ণয় করবো তা নিয়ে। (আপনার) মনোযোগ পাওয়ার যোগ্য হওয়ার জন্য আর কত কত জীবন বিলীন হতে হবে? আপনার বিবৃতির শেষে জোরালোভাবে আন্ডারলাইন করা “মানুষের মর্যাদাকে সম্মান করার বাধ্যবাধকতা” কথাটার কি মানে দাঁড়ায় আসলে? এটা এমন যেন আপনি আশঙ্কা করছেন যে, ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগের কথা বললে ইহুদি জীবনের প্রতি আপনার নৈতিক অঙ্গীকার হ্রাস পাবে। যদি তা-ই হয়, অতীতে করা এক বিশাল অন্যায়ের সংশোধনকে বর্তমানের আরেকটা ভয়ানক অন্যায়কে পাকাপোক্ত করার প্রক্রিয়ার সঙ্গে ত্যানা প্যাঁচানো কতই না দুঃখজনক!

    আমি আশঙ্কা করি যে এই প্যাঁচানো নৈতিক কম্পাস জার্মান ব্যতিক্রমীতার যুক্তির সাথে সম্পর্কিত, যার আপনি ধারক-বাহক। সংজ্ঞানুসারে, ব্যতিক্রমীতা কোন সর্বজনীন মান নয় বরং ইহা বিশেষ কোন মানকে মানিয়া লয়। (ব্যতিক্রমবাদের নিক্তিতে) কিছু লোক অধিকতর যোগ্য মানুষ হয়ে ওঠে, অন্যরা কম যোগ্য, এবং আর বাকীরা অযোগ্য। এই [বিশেষ] যুক্তি যৌক্তিক সংলাপকে রুদ্ধ করে এবং নৈতিক চেতনাকে অসংবেদনশীল করে তোলে। এমন এক কগনিটিভ ব্লক নির্মান করে যা আমাদের অন্যের দুর্দশা-আহাজারি দেখতে দেয় না, সহানুভূতিকে আটকে দেয়।

    কিন্তু সবাই এই কগনিটিভ ব্লক এবং নৈতিক অসাড়তার কাছে নতিস্বীকার করে না। আমি বুঝতে পারি যে অনেক তরুণ জার্মান তাদের ব্যক্তিগত দুনিয়ায় ইসরায়েলি-ফিলিস্তিন সংঘাত সম্পর্কে দেশের রাজনৈতিক শ্রেণীর থেকে একদম ভিন্ন মতামত প্রকাশ করে। এমনকি কেউ কেউ জনসাধারণের বিক্ষোভেও অংশ নেয়। তরুণ প্রজন্ম এখন বিকল্প মিডিয়া এবং জ্ঞানের উৎসের সংস্পর্শে থাকে এবং তাদের কগনিটিভ প্রক্রিয়ার অভিজ্ঞতা পুরানো প্রজন্মের থেকে আলাদা। কিন্তু বেশিরভাগই [রাষ্ট্রীয়] প্রতিহিংসার ভয়ে পাবলিক দুনিয়াতে নীরবতা বজায় রাখে।

    পরিহাসমূলকভাবে গণতান্ত্রিক জার্মানিতে, প্রাক-১৯৮৯ ইউরোপের মতো বা হাল মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরাচারী শাসনের অধীনস্থতার মত, এক ধরনের “হিডেন স্ফিয়ার” আবির্ভূত হচ্ছে বলে মনে হয়। যখন ভীতি-ত্রাস জনসাধারণের অভিব্যক্তি বন্ধ করে দেয়, তখন মানুষ পাবলিকলি সরকার অনুমোদিত বয়ানের সাথে তাল মেলালেও, গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয়-আষয়ে ব্যক্তিগত [গোপন] দুনিয়ায় তাদের নিজস্ব বিকল্প ন্যারেটিভ তৈরি করার প্রবণতা দেখায়। সুযোগ এলে এসব হিডেন স্ফিয়ার বিস্ফোরিত হতে পারে।

    এটা খুবই অস্থির সময়, অধ্যাপক হ্যাবারমাস। এটা ঠিক সেই সময় যখন আপনার মতো চিন্তাবিদদের প্রজ্ঞা, জ্ঞান এবং সর্বোপরি নৈতিক সাহস সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। সত্য ও সংযোগমূলক পদক্ষেপ, বিশ্বজনীনতা, নাগরিকত্ব-সমতা, সুচিন্তিত গণতন্ত্র এবং মানবিক মর্যাদা সম্পর্কে আপনার মৌলিক ধারণাগুলি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা সত্ত্বেও আপনার ইউরোসেন্ট্রিজম, জার্মান এক্সেপশনালিজম এবং ইসরায়েল ও প্যালেস্টাইন ইস্যুতে আপনার তর্ক-বন্ধ-করা তৎপরতার সঙ্গে এই ধারণাগুলি সাংঘর্ষিক হিসেবে প্রতীয়মান হবে।

    আমি আশঙ্কা করি যে নিছক জ্ঞান-বুদ্ধি এবং সচেতনতা বোধহয় যথেষ্ট না। আন্তোনিও গ্রামসি যেমন বিস্মিত হয়েছিলেন, একজন বুদ্ধিজীবী কীভাবে “না বুঝেই” “জানতে” এবং “অনুভূতি” ছাড়া বুঝতে পারেন? যখন আমরা সহানুভূতির মাধ্যমে একে অপরের দুর্দশা-আহাজারি “অনুভব” করি, কেবলমাত্র তখনই আমাদের এই অশান্ত পৃথিবীর জন্য আশা থাকতে পারে।

    চলেন আমরা ত্রয়োদশ শতাব্দীর ফার্সি কবি সাদি শিরাজির আভাসকে স্মরণ করিঃ

    পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ আদতে পরস্পর একাকার,
    এক নির্যাসে তৈরি সবাই আত্মীয় আত্মার।
    একজন যখন ব্যথায় কাতর, অস্বস্তিতে রয় সকল অন্তর।
    যদি অপরের ব্যথা তোমার মনে আদৌ দাগ না কাটে,
    মানুষের নাম পরিচয় তবে রাখো কোন অজুহাতে!

    সম্মানের সঙ্গে,
    আসেফ বায়াত
    ডিসেম্বর ৮, ২০২৩

    ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠাবাদী দর্শনকে একটি মুক্ত সমাজ নির্মানের ক্ষেত্রে বাধা হিসাবে বিবেচনা করত। সেটা যে হ্যাবারমাস ভুলে গেছেন বায়াতের এই চিঠি আমাদের সেটাই মনে করিয়ে দেয় বৈকি। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, গাজা নিয়ে হ্যাবারমাসদের চিন্তা-বিবৃতি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ এই বিবৃতিগুলো প্রকাশ করে পশ্চিমা ক্রিটিকাল চিন্তাবিদরা কি নিয়ে টেনশন করছে। আর কি তাদের চিন্তাতে নেই।  ইউনিভার্সিটিতে কাগজসর্বস্ব জ্ঞান উৎপাদনের বাইরেও একটা দুনিয়া আছে। বাস্তব দুনিয়া। ক্রিটিকাল চিন্তা এবং জ্ঞানকে যখন সেই বাস্তব দুনিয়ায় অনুশীলন করার সময় আসে তাদের মোরাল কম্পাস তখন কোন দিকে ঝুলে থাকে? আসেফ বায়াত যাকে ‘জার্মান এক্সেপশনালিজম’ বা ‘জার্মান ব্যতিক্রমীতা’ বলছেন তাকি আসলেই শুধু জার্মান চিন্তা, নাকি গোটা ইউরোপের বা পশ্চিমা দুনিয়ার? মরোক্কোর নৃতত্ত্ববিদ এবং রাজনৈতিক বিজ্ঞানী মোহাম্মদ আল-মাজোজে মনে করেন হ্যাবারমাসদের এই অবস্থানকে মূলত পশ্চিমা চিন্তাবিদদের প্রতিনিধি হিসাবে চিহ্নিত করা যায়।[4] আমার বর্তমান পশ্চিমা পিএইচডি জীবনের বাস্তবিক অভিজ্ঞতা এবং অব্জার্ভেশনও সেটাই বলে। কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সারা দুনিয়ায় একাডেমিক ফ্রিডম চর্চায় সবচেয়ে অগ্রগণ্য হিসেবে সুনাম থাকা সত্ত্বেও গাজা গণহত্যা নিয়ে সোচ্চার হতে কিংবা কথা বলতে যাদের দেখেছি তাদের সংখ্যা একদম হাতে গোণা যায়। আর আমেরিকার কথা নাই বা বললাম। প্যালেস্টাইন ‘লিটমাস টেস্ট’ হার্ভাড কিংবা অন্যান্য আইভি লীগ বিশ্ববিদ্যালয়সহ নর্থ আমেরিকান একাডেমিয়ার মোরাল পজিশনের ভিতরের চেহারাটাকে খুব ভালভাবেই উন্মুক্ত করেছে।

    থিয়েটার গাজা ২০২৪
    শিল্পী: ওসামা দিয়াব
    উৎস: আর্টসি

    তাহলে কি ব্যতিক্রম নাই? সেটাও অনেক আছে। গাজা নিয়ে যারা একাডেমিক দুনিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন এবং করছেন তাদের মধ্যে পশ্চিমা ইহুদিদের কাজ এবং সোচ্চারতা অগ্রগণ্য। কিন্তু তাদেরকেও নানাভাবে ‘ইহুদি-বিদ্বেষি’ তকমা দিয়ে হয়রানি করেছে এবং করছে পশ্চিমা একাডেমিয়া। একটা উদাহরণ দেওয়া জরুরি। জুডিথ বাটলারকে বাংলাদেশে অনেকে প্যাথেটিকভাবে সুড়সুড়ি দিয়ে ‘রেইনবো স্কলার’ হিসেবে পরিচিত করান। উনার সমকামী ব্যক্তিগত জীবনকে সামনে এনেও অনেকে অনেক কিছু উস্কে দিতে চান। এই জুডিথ বাটলার গতমাসের ৩ তারিখ (মার্চ, ২০২৪) প্যারিসে এক প্যানেল ডিসকাশনে হামাসের ৭ই অক্টোবরের হামলাকে “আপরাইজিং” এবং “সশস্ত্র প্রতিরোধ” (armed resistance) বলেছেন।[5] বাটলারের বক্তব্যের মূল কথা হলো—”রাজনৈতিক দল হিসেবে হামাস সম্পর্কে আমাদের ভিন্ন মতামত থাকতে পারে। সশস্ত্র প্রতিরোধ সম্পর্কে আমাদের ভিন্ন মতামত থাকতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি এটা বলা অনেক বেশি সততার এবং ঐতিহাসিকভাবে সঠিক যে ৭ই অক্টোবরের আপরাইজিং একটা সশস্ত্র প্রতিরোধ ছিল। এটি কোনও সন্ত্রাসবাদী হামলা নয় এবং এটি কোনও ইহুদি বিরোধী হামলাও নয়। এটি ছিল ইসরায়েলিদের বিরুদ্ধে আক্রমণ।”[6] বাংলাদেশ কিংবা মুসলিম বিশ্বের কয়জন স্কলার পাবলিকলি এটা বলতে পেরেছেন?

    এবারই প্রথম না। ২০০৬ সালেও তিনি হামাস ও হিজবুল্লাহকে “গ্লোবাল লেফট” হিসেবে চিহ্নিত বা বর্গীকরণ করেছিলেন। অক্টোবর, ২০২৩-এও যখন হ্যাবারমাসরা ইসরায়েলের ক্রমাগত বোমাহামলাকে ন্যায্যতা দেবার জন্য কলম ধরছেন তখন বাটলার এই কর্মকান্ডকে “বারবারিক” ও “জেনোসাইড” হিসেবে  ঘোর নিন্দা জানিয়েছেন, আমেরিকান সরকার এবং মিডিয়া কিভাবে এই জেনোসাইডকে মদদ দিচ্ছে সে ব্যাপারে সবাই মিলে কথা বলার জন্য তাগিদ দিয়েছেন।[7] তখনই তাকে শুনতে হয়েছে—বাটলারের কাছে হামাসের হামলা ‘বারবারিক’ না অথচ ইসরায়েলিরা সাদা বলে তাদের হামলাকে ‘বারবারিক’, কারণ ইহুদি হলেও বাটলারকে ইসরায়েলে থাকতে হয় না, তাই সে জানেনা হামাস একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন যা ইহুদিত্বের কারণে ইসরায়েলিদের পৃথিবীর থেকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়।[8] অবিরত সমালোচনা, ফ্রেমিং তাকে তাকে সত্য প্রকাশ থেকে দমাতে পারেনি। প্যারিসে মার্চের ৩ তারিখের উপর্যুক্ত বক্তব্যের পর ফরাসি তথা পশ্চিমা একাডেমিয়া আরও কঠোরভাবে তার সমালোচনা করতে থাকে। এখনও তাকে মিডিয়ায় খোলা চিঠিসহ বিভিন্নভাবে ভৎসনা করা হচ্ছে প্রায় প্রতিদিন। এসব সমালোচনার প্রেক্ষিতে ফ্রান্সের নানান পূর্বনির্ধারিত প্রোগ্রাম থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হন বাটলার। কিন্তু নিজের মোরাল পজিশন থেকে সরে আসেন নি।

    উৎস: পিলগ্রিমেজ আর্ট, পিন্টারেস্ট

    হার্বাট মারকুস এবং তার ছাত্রীকে দিয়ে শুরু করেছিলাম। মারকুসের শিক্ষক সম্পর্কে আলাপ করেই না হয় শেষ করি। তার শিক্ষক ছিলেন ২০ শতকের প্রধানতম মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার। হাইডেগারের সাথে মারকুসের গুরুশিষ্য সম্পর্ক অসাধারণ ছিল। কিন্তু ১৯৩২ সালে মারকুস হাইডেগারের সান্নিধ্য পরিত্যাগ করেন। এর কারণ হাইডেগার নাজি পার্টির দিকে ঝুঁকে যান। ১৯৩৩ সালে হাইডেগারকে ফ্রেইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নাৎসি রেক্টর বানানো হয়।[9] হাইডেগার যত বড় দার্শনিকই হোক না কেন, নাৎসিদের নৈতিক সমর্থন দেবার জন্য একাডেমিক দুনিয়া আজও তাকে ক্ষমা করে নি। ইউরোপীয় দর্শনের গভীর বর্ণবাদ, চুপ থাকা ও ফ্যাসিস্ট শেকড় বোঝার জন্য হাইডেগারকে আজও অনেকে একটি প্রবেশদ্বার হিসাবে ব্যবহার করতে চায়।[10] ঠিক একই ভাবে হ্যাবারমাসদের দর্শন, তত্ত্বচিন্তা তাদের বর্ণবাদী কারণে চুপ থাকা, ইসরায়েলের সেটলার কলোনিয়াল চরিত্রকে প্রশ্ন করতে না পারা এবং গাজায় চলমান গণহত্যাকে নৈতিক সমর্থন দেওয়ার জন্য দিনকে দিন আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাদের ক্রিটিকাল চিন্তাগুলি আরও বেশি হিপোক্রেটিকালি অগুরুত্বপূর্ণ বলে গণ্য হবে। আসেফ বায়াত বোধহয় তার চিঠিতে সেই সিগনালই দিয়েছেন।

     

    তথ্যনির্দেশ: 

    [1] Jack Jacobs. (2014). The Frankfurt School, Jewish Lives, and Antisemitism.

    Cambridge University Press. P. 121. pp.119-122

    [2] Marcuse’s View of Israel is That She Lacks Eros and Civilization. (1972). Jewish Telegraphic Agency. https://www.jta.org/archive/marcuses-view-of-israel-is-that-she-lacks-eros-and-civilization

    [3] Yanis Varoufakis on Israel-Gaza: ‘We Europeans have created this’ | UpFront. (2023, Nov 14). Al Jazeera English. https://www.youtube.com/watch?v=_OAniUDMA1Y

    [4] Alieddien Hilal. (2014, Jan 09). Challenging Habermas on Israel. Ahram Online. https://english.ahram.org.eg/NewsContent/50/1204/515359/AlAhram-Weekly/Opinion/Challenging-Habermas-on-Israel-.aspx

    [5] Michael Starr. (2014, March 14). Judith Butler defends calling October 7 Massacre ‘armed resistance’. The Jerusalem Post. https://www.jpost.com/diaspora/antisemitism/article-791928

    [6] Laurel Duggan. (2024, March 5). Judith Butler: 7 October was armed resistance, not terrorism. Unherd. https://unherd.com/newsroom/judith-butler-7-october-was-armed-resistance-not-a-terrorist-attack/

    [7] Palestinian Lives Matter Too: Jewish Scholar Judith Butler Condemns Israel’s “Genocide” in Gaza. (2023, Oct 26). Democracy Now. https://www.youtube.com/watch?v=CAbzV40T6yk

    [8] Hamutal Gouri. (2023, Nov 03). An Open Letter to Prof. Judith Butler. The Times of Israel. https://blogs.timesofisrael.com/an-open-letter-to-prof-judith-butler/

    [9] See: Andrew Feenberg. (2005). Heidegger and Marcuse: The Catastrophe and Redemption of History. Routledge.

    [10] See: Adam Knowles. (2019). Heidegger’s Fascist Affinities: A Politics of Silence. Stanford University Press.

  • হামজা আলাভি ।। উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাষ্ট্র

    হামজা আলাভি ।। উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাষ্ট্র

    [পাকিস্তানি সমাজবিজ্ঞানী হামজা আলাভির প্রবন্ধ The State in Post-Colonial Societies : Pakistan and Bangladesh১৯৭২ সালে New Left Review জার্নালে প্রকাশিত হয়। এই লেখাটি আলাভির প্রবন্ধের নির্বাচিত অংশের অনুবাদ। প্রবন্ধটির শুরুতে আলাভি উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাষ্ট্র সম্পর্কে সনাতনী মার্ক্সীয় তত্ত্বায়নের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, যেখানে রাষ্ট্রকে কেবল বুর্জোয়া শ্রেণির একটি হাতিয়ার ভাবা হয়। এর বিপরীতে তিনি একটি অতি-বিকশিত রাষ্ট্রের তত্ত্বায়ন প্রদান করেন, যেখানে ঔপনিবেশিক বাস্তবতার ফলে উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র দুর্বল দেশীয় বুর্জোয়াদের থেকে আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে। প্রবন্ধের শেষার্ধে তিনি পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনার মাধ্যমে এর বাস্তবতা খতিয়ে দেখেন। প্রবন্ধটির দৈর্ঘ্য বিবেচনায় অনুবাদের জন্য এর প্রথমাংশকে নির্বাচন করা হয়েছে, যেখানে তিনি উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে অতি-বিকশিত রাষ্ট্র ও সামরিক-আমলাতান্ত্রিক অলিগার্কির একটি সাধারণ তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড় করান। নব্য-উদারবাদী বিশ্বায়নের মুখে একুশ শতকে এসে রাষ্ট্রের আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন আদৌ অক্ষত আছে কিনা তা প্রশ্নের দাবি রাখে; তবে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর নিয়মিত হস্তক্ষেপের বংশনামা বুঝতে হলে আলাভির এই লেখাটি এখনও অত্যাবশ্যক। – অনুবাদকের ভূমিকা]

    ছবি: হামজা আলাভি

    উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজগুলোর সরকারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক ক্রমবিকাশে আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় ভূমিকার দিকে দৃষ্টিপাত করলে বেশ কিছু মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে, বিশেষ করে সনাতনী মার্ক্সীয় তত্ত্বের নিরিখে। মিলিব্যান্ড১ যাকে রাষ্ট্র সম্পর্কে প্রধান মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বলছে তার সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট বহিঃপ্রকাশ পাওয়া যায় কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর সেই বিখ্যাত উদ্ধৃতিতে :“আধুনিক রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ হলো সমগ্র বুর্জোয়া শ্রেণির সাধারণ কার্যাবলি পরিচালনার একটি কমিটি মাত্র,” এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা হলো “মূলত এক শ্রেণি কর্তৃক অন্য শ্রেণিকে দমন করার জন্য একটি সংগঠিত শক্তি।“

    …উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে সামরিক বাহিনী ও আমলাতন্ত্রকে এই সনাতনী মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে কেবল একটি একক শাসক গোষ্ঠীর হাতিয়ার হিসেবে দেখলে চলবেনা। ঔপনিবেশিক সম্পর্কের মাধ্যমে সৃষ্ট নির্দিষ্ট কাঠামোগত বিন্যাস ও উত্তর-ঔপনিবেশিক আমলে বিকশিত পুনর্বিন্যাস রাষ্ট্র ও সামাজিক শ্রেণিসমূহের মধ্যকার সম্পর্ক আরো জটিল করে তুলেছে। এ দুটি ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশের ধারা সম্পূর্ন ভিন্ন। পশ্চিমা সমাজে আমরা দেশীয় বুর্জোয়াদের দ্বারা তাদের উদীয়মান ক্ষমতার প্রেক্ষিতে জাতি-রাষ্ট্রের উদ্ভব হতে দেখি, যা পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় আইনী কাঠামো ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তৈরি করে। ঔপনিবেশিক সমাজগুলোতে এই প্রক্রিয়া তাৎপর্যপূর্ণভাবে আলাদা।

    উপনিবেশে বুর্জোয়া বিপ্লব সংগঠিত হয় কেন্দ্রস্থ২ (Metropolitan) বুর্জোয়াদের ঔপনিবেশিক শাসন আরোপের মাধ্যমে, যেখানে বুর্জোয়া রাষ্ট্র ও এর আনুষাঙ্গিক আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রবর্তন করা হয়। কিন্তু উপনিবেশে এই বুর্জোয়া বিপ্লব সম্পন্ন করতে কেন্দ্রস্থ বুর্জোয়াদের ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট একটি বাড়তি লক্ষ্য অর্জন করতে হয়। উপনিবেশে তাদের কাজ কেবল নিজ দেশে প্রতিষ্ঠিত উপরি-কাঠামোকে৩ নকল করা নয়। অধিকন্তু, তাদের এমন একটি রাষ্ট্রযন্ত্র তৈরি করতে হয় যার মাধ্যমে তারা উপনিবেশের সকল স্থানীয় সামাজিক শ্রেণির উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে। সুতরাং, এই মর্মে উপনিবেশের (অব)কাঠামোর তুলনায় এর ‘উপরি-কাঠামো’কে ‘অতি-বিকশিত’(Over-developed) বলা যেতে পারে। কেননা, এর ভিত্তি খোদ কেন্দ্রের কাঠামোতেই নিহিত, যা থেকে পরবর্তীতে এটি স্বাধীনতার সময় আলাদা হয়ে যায়। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র তাই একটি শক্তিশালী সামরিক-আমলাতান্ত্রিক যন্ত্র ও সরকারি কলকব্জা দ্বারা সজ্জিত, যা তাদের নিয়মমাফিক কার্যাবলির মাধ্যমে স্থানীয় সামাজিক শ্রেণিসমূহকে রাষ্ট্রের অধীনস্থ করতে সাহায্য করে। উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজ এই অতি-বিকশিত রাষ্ট্রযন্ত্র ও এর কার্যবিধির উত্তরাধিকার বহন করে, যার মাধ্যমে স্থানীয় সামাজিক শ্রেণি-সমূহকে নিয়ন্ত্রণ ও শাসন করা হতো। স্বাধীনতার সময়ে দুর্বল দেশীয় বুর্জোয়ারা নিজেদের এমন এক আমলাতান্ত্রিক বেড়াজালে আবদ্ধ খুঁজে পায়, যার মাধ্যমে কেন্দ্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়ে সামরিক-আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের চূড়ায় থাকা ব্যক্তিরা সমাজে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে এবং এমনকি বিস্তার করতে সক্ষম হয়।

    উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাষ্ট্রের আসল সমস্যা হলো যে এটি কোনো উদীয়মান দেশীয় বুর্জোয়া শ্রেণি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নয় বরং একে প্রতিষ্ঠা করে একটি বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়া শ্রেণি। স্বাধীনতার মাধ্যমে কাগজে কলমে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে বিদেশি বুর্জোয়াদের হুকুম রদ হলেও এর ওপর তাদের প্রভাব কোনো অংশেই শেষ হয়ে যায় না। কেন্দ্রস্থ বুর্জোয়ারা এখন নব্য-উপনিবেশবাদী বুর্জোয়াদের সাথে একাট্টা হয়ে উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজগুলোতে অবস্থান করে। একসাথে তারা সমাজগুলোর শ্রেণি কাঠামোতে একটি শক্তিশালী উপাদান হিসেবে হাজির হয়। নব্য-উপনিবেশবাদী বুর্জোয়া শ্রেণি ও উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের সম্পর্ক এবং সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়া শ্রেণি ও ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের সম্পর্ক স্পষ্টতই ভিন্ন। ফলে, উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের শ্রেণি বৈশিষ্ট্য বেশ জটিল। নব্য-উপনিবেশবাদী বুর্জোয়াদের ক্ষমতা ও প্রভাবের পরিপ্রেক্ষিতে, একে ঠিক দেশীয় বুর্জোয়াদের অধীনস্থ বলা যাবেনা। আবার এটি এদের কারো কেবলমাত্র একটি হাতিয়ারও নয়, যার অর্থ দাঁড়াতো যে, স্বাধীনতা কেবলই একটি প্রহসন। উভয় বুর্জোয়া শ্রেণিই একে অপরের প্রভাব নাকচ করতে পারেনা এবং তাদের মধ্যে স্বার্থের প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। যে মূল প্রস্তাবনার উপর আমি গুরুত্বারোপ করতে চাই তা হলো যে, উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাষ্ট্র কোনো একক শ্রেণির হাতিয়ার নয়। এটি আপেক্ষিকভাবে স্বায়ত্তশাসিত (relatively autonomous) এবং এটি তিনটি মালিক শ্রেণির প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক স্বার্থের মধ্যে মধ্যস্থতা করে, অর্থাৎ কেন্দ্রস্থ বুর্জোয়া, দেশীয় বুর্জোয়া ও জমিদার শ্রেণি। একইসাথে এটি সেই সামাজিক বন্দোবস্ত টিকিয়ে রাখতে তাদের সকলের হয়ে কাজ করে, যার মধ্যে তাদের স্বার্থ নিহিত আছে, অর্থাৎ ব্যক্তিগত সম্পত্তি ব্যবস্থা ও প্রধান উৎপাদন প্রক্রিয়া হিসেবে পুঁজিবাদী প্রক্রিয়া।

    … এই পরিস্থিতিতে সামরিক-আমলাতান্ত্রিক অলিগার্কি৪, অর্থাৎ রাষ্ট্রযন্ত্র ফলত একটি নতুন ও আপেক্ষিকভাবে স্বাধীন অর্থনৈতিক ভূমিকা লাভ করে, যা ধ্রুপদি বুর্জোয়া রাষ্ট্রে নজিরবিহীন। উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাষ্ট্র অর্থনৈতিক উদ্বৃত্তের একটি বড় অংশ সরাসরি আত্মসাৎ করে এবং তা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার নামে আমলাতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত করে। এসকল শর্তাবলি উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকে সনাতনী মার্ক্সীয় তত্ত্বে বিশ্লেষিত রাষ্ট্র থেকে মৌলিকভাবে আলাদা করে।

    তবে, রাষ্ট্রযন্ত্র স্রেফ সামরিক-আমলাতান্ত্রিক অলিগার্কি দিয়েই গঠিত নয়। যেখানে গণতান্ত্রিক শাসন-ব্যবস্থা বিদ্যমান, সেখানে রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দলসমূহও এর অংশ হিসেবে কাজ করে। যেখানে, রাজনৈতিক নেতারা আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনীর উপর কর্তৃত্ব সহকারে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়, সেখানে রাষ্ট্রে রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা এবং তাদের ক্ষমতার ব্যাপ্তি ও সীমাবদ্ধতাসমূহ সম্পর্কে সম্যক ধারণা ব্যতীত সামরিক-আমলাতান্ত্রিক অলিগার্কির ভূমিকা মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। রাজনীতিবিদেরা ও রাজনৈতিক দলসমূহ একটি জটিল আন্তঃসম্পর্কীয় কাঠামোর কেন্দ্রে অবস্থান করে। একদিকে, তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয় যে (আদর্শগতভাবে) তারা যাদের সমর্থন প্রত্যাশী, তাদের দাবিদাওয়াগুলো সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরবে এবং সরকারের কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা সেই দাবিগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে। অন্যদিকে, যারা আসলে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ করেন, তাদের হয়ে জনমত প্রভাবিত করতেও মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হয়; যাতে সেই নীতিগুলো জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায়। সেজন্য, তারা জনগণের ক্ষোভকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে এবং জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ব্যাপারে এমন এক ‘বোঝাপড়া’ তৈরি করতে চায়, যা সম্ভাব্য বিরোধিতাকে প্রশমিত করে ফেলবে। ফলে, সামরিক-আমলাতান্ত্রিক অলিগার্কির সাথে তাদের সম্পর্ক দোদুল্যমান; এটি একই সাথে প্রতিযোগিতামূলক আবার পরিপূরক। এই দোদুল্যমানতা আরো গভীর যেখানে উচ্চ রাষ্ট্রীয় পদে আসীন রাজনীতিবিদেরা আমলাতন্ত্রের কিংবা সামরিক বাহিনীর কোনো সদস্যের ক্যারিয়ারের উপর প্রভাব রাখতে পারে।

    আর্টওয়ার্ক: কলোনিয়ালিজম

    উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির মধ্যে ক্ষমতার বিন্যাস ও ভাগ-বাটোয়ারার অনেক ধরণের রূপভেদ বিদ্যমান। স্বাধীনতা আন্দোলনের ভ্যানগার্ড হিসেবে রাজনৈতিক দলের উপর বৈধতার মোড়ক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার জৌলুস অর্পিত হয়। তা সত্ত্বেও, বিপুল সংখ্যক উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে তাদের ক্ষমতার এক ক্রমবর্ধমান লঘুকরণ দেখা যাচ্ছে; এবং এর বিপরীতে, আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির ক্ষমতা বিস্তারলাভ করেছে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে অনেক ক্ষেত্রেই তাদের দ্বারা রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকাশ্য ‘দখল‘ সংঘটিত হয়েছে। তবুও, মোটা দাগে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির মধ্যে সমঝোতা ও একই সাথে টানাপোড়েন বিদ্যমান। পূর্বোক্ত পক্ষটি (রাজনৈতিক দল) পরোক্ত পক্ষটির (আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কি) জন্য একটি কার্যকরী উদ্দেশ্য সাধন করে থাকে। তারা সরকারকে রাজনৈতিক বৈধতার মোড়ক দান করে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নাটকের মাধ্যমে তারা জনঅসন্তোষ প্রশমিত করে এবং তাদের ক্ষোভ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে। রাজনৈতিক দলের ভূমিকা থাকলেই তা আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন নাকচ করে দেয় না। মূল বিষয়টি হলো সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্রের আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন এবং তিনটি মালিক শ্রেণির মধ্যকার প্রতিযোগী স্বার্থের মধ্যে এর মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা, অর্থাৎ দেশীয় বুর্জোয়া, কেন্দ্রস্থ বুর্জোয়া এবং জমিদার শ্রেণি। যতক্ষণ পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে ভূমিকা পালন করে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির স্বার্থ হাসিলে মূল্যবান হিসেবে বিবেচিত হয় এবং তারা অলিগার্কির তৃতীয় অংশ হিসেবে শরিক হয়। যখন কোনো রাজনৈতিক দল সেই আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসনকে ও আমলতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির মধ্যস্থতাকারী ভূমিকাকে চ্যালেঞ্জ করে কেবল তখনই তাদের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হয়, যেখানে এখন পর্যন্ত পরোক্ত পক্ষই জয়ী হয়েছে। কোনো পুঁজিবাদী উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে একটি রাজনৈতিক দল কর্তৃক রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের কোনো স্পষ্ট উদাহরণ আমরা আজ অবধি দেখতে পাইনি। ভারতের উদাহরণ এর সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছায়। কিন্তু এমনকি ভারতের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতিটি ঘোলাটে। ক্ষমতাসীন কংগ্রেস পার্টি কোনোভাবেই একটি একক শ্রেণির দল নয়; বরং এটি আমলাতন্ত্রের সাথে মিলিত হয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগী মালিক শ্রেণির দাবিদাওয়ার মধ্যে মধ্যস্থতা করার কাজে অংশগ্রহণ করে। একইসঙ্গে, তাদের সমাজতান্ত্রিক বক্তৃতাবাজি সত্ত্বেও তারা আমলাতন্ত্রের সাথে মিলেমিশে রাষ্ট্রক্ষমতাকে ব্যবহার করে সেই সামাজিক বন্দোবস্তকে টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট, যা ওই মালিক শ্রেণিগুলোর অস্তিত্ব বজায় রাখে। এমনকি বিদেশী পুঁজির ব্যাপারেও ভারত সরকারের প্রকৃত কর্মকাণ্ড কংগ্রেসের রাজনীতিবিদদের বক্তৃতাবাজির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমান বিশ্লেষণের জন্য যা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো যে, কংগ্রেসের রাজনীতিবিদদের আপাতদৃষ্টিতে দৃশ্যমান ক্ষমতার অন্তরালে ভারতীয় আমলাতন্ত্র প্রকৃতপক্ষে বিশাল পরিধির স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে থাকে, যার ওপর সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো নতুন করে আলোকপাত করেছে।

    ভারত ও পাকিস্তানে আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কি এবং রাজনীতিবিদদের মধ্যকার সম্পর্কের বিবর্তন বুঝতে হলে, তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্রমবিকাশের ঐতিহাসিক পটভূমি এবং বিশেষ করে সুদূরপ্রসারী আমলাতান্ত্রিক ও সামরিক স্বায়ত্তশাসনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের দিকে তাকাতে হবে। স্বাধীনতার আগে, আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনীর সদস্যরা ছিল ঔপনিবেশিক শক্তির হাতিয়ার। তাদের অন্যতম প্রধান কাজ ছিল বিভিন্ন স্থানীয় শ্রেণিকে অধীনস্থ রাখা এবং তাদের ঔপনিবেশিক প্রভুদের পক্ষ হয়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমন করা। মুক্তি সংগ্রামের সময়, তারা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিপরীতে রাজনৈতিক ব্যারিকেডের উল্টো দিকে অবস্থান করেছিল। স্বাধীনতার পর, সেই একই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, যাদের দমন করা ছিল তাদের কাজ, ক্ষমতার মসনদে আসীন হলেন এবং কাগজে কলমে তাদের (আমলা ও সামরিক বাহিনী) ওপর কর্তৃত্ব লাভ করলেন। ফলে, পারস্পরিক সমঝোতার একটি নতুন সম্পর্ক স্থাপনের প্রয়োজন দেখা দেয়। তবে বিশ ও ত্রিশের দশকে পর্যায়ক্রমে আংশিক ক্ষমতা হস্তান্তরের৫ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ইতিপূর্বেই এমন কিছু পদ্ধতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল, যার সাহায্যে আমলাতন্ত্র সেইসব রাজনৈতিক নেতাদের এড়িয়ে যেতে পারত, যারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের ছত্রছায়ায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের বিস্তার এবং সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যস্থতার ছাড়াই আমলাতন্ত্রের সাথে ব্যাপক হারে সরাসরি ও নিয়মিত লেনদেনের বাস্তবতার ফলে এসকল প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিগুলো আরও প্রসারিত ও সুসংহত হয়েছিল। এর ব্যতিক্রম কেবল তখনই ঘটে যখন ব্যক্তিগতভাবে কোনো রাজনীতিবিদ তার সমর্থকদের জন্য কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কোনো বিশেষ সুবিধা আদায় করতে চান; যেক্ষেত্রে আমলাতন্ত্রের সাথে তাদের সম্পর্ক শক্তিশালী হওয়ার বদলে বরং আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজনীতিবিদরা তখন সরকারি সুযোগ-সুবিধা আদায়ের দালালে পরিণত হন। জনগণের সাথে আমলাতন্ত্রের এই মধ্যস্থতা করা হলো, অন্যান্য দেশের মতো ভারতেও রাজনৈতিক ক্ষমতার অন্যতম প্রধান উৎস। তবে, রাজনীতিবিদরা কোনোভাবেই সরকারি কর্মকর্তার সুনজর হারানোর ঝুঁকি নিতে পারেন না, যা তাদের সামগ্রিক সম্পর্কের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে। আমলাতন্ত্রের শক্তি মূলত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের ব্যাপক বিস্তার এবং নানাবিধ কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত বিশাল সংখ্যক সরকারি সংস্থাসমূহের পরিচালনার ওপর নির্ভর করে।

    রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির মধ্যকার সম্পর্কের বিবর্তনের প্রকৃত ধরণ ঐতিহাসিক পটভুমির বৈচিত্র্য ও রাজনৈতিক শক্তিসমূহের বিবর্তনের ভিত্তিতে এক এক দেশে এক এক রকম। উদাহরণস্বরূপ, ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে, সুকর্ণর উৎখাতের মধ্য দিয়ে আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির প্রকাশ্য ক্ষমতার আবির্ভাব হতে হতে একটি দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। এর পিছনে অন্তর্নিহিত কারণগুলো বেশ জটিল; তবে ইন্দোনেশিয়ায় আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনী আপাদ-মস্তক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা ও অলিগার্কি সুসংহতকরণে কিছুটা সময় লাগা নিশ্চই সেই কারণগুলোর একটি। এর বিপরীতে, ভারত ও পাকিস্তান শক্তিশালীভাবে সংগঠিত আমলাতান্ত্রিক ও সামরিক কাঠামো উত্তরাধিকারসুত্রে লাভ করে। এটা ঠিক যে, স্বাধীনতার সময়ে, পাকিস্তানে সামরিক বাহিনী বেশ নাজুক অবস্থায় ছিল; কিন্তু রাজনৈতিক দলসমূহের সংগঠন ও জনভিত্তি ছিল আরও বেশি নাজুক। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ, তাদের নেতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ব্যক্তিত্ব ও কর্তৃত্বের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতো, যিনি স্বাধীনতার অল্প কিছুদিনের মাথায় মৃত্যবরণ করেন। ততক্ষণে মুসলিম লীগ ভেঙে পড়তে শুরু করে এবং এর নেতৃত্ব তাদের জনভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

    পাকিস্তানের ২৫ বছরের ইতিহাসে দুটি বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। প্রথমটি হলো আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির আধিপত্যশীল অবস্থান। তাদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতার কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ আসে, অক্টোবর ১৯৫৮ এর সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে নয়, যেমনটা সাধারণত ভাবা হয়ে থাকে; বরং নয়া রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই। প্রথম পর্যায়ে, সংসদীয় সরকারব্যবস্থার লেবাস প্রদানকারী রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কি হাতের পুতুল বানানো হয় এবং সেই অলিগার্কির সুবিধামতো তাদের ক্ষমতায় বসানো বা বহিষ্কার করা হতো। ১৯৫৮ সালে যখন আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের সম্ভাবনা আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির আধিপত্যের জন্যে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিল, তখন যারা ইতিমধ্যে ক্ষমতার লাগাম ধরে রেখেছিল, তারা সংসদীয় সরকারব্যবস্থার যে প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেই সেই চ্যালেঞ্জটি উত্থাপিত হচ্ছিল তা বিলুপ্ত করে দিয়ে ‘ক্ষমতা দখল’ করে। তবে তা সত্ত্বেও, আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির কিছু রাজনীতিবিদদের প্রয়োজন ছিল যারা একটি পরিপূরক ভূমিকা পালন করবে; এবং ১৯৬২ সালের মধ্যে আইয়ুব খানের ‘মৌলিক গণতন্ত্র’৬(Basic Democracy) ব্যবস্থার অধীনে গণতান্ত্রিক রাজনীতির এক প্যারোডির মধ্য দিয়ে রাজনীতিবিদদের পুনরায় কাজে লাগানো হয়। ১৯৬৯ সালে একটি বিশাল জাতীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইয়ুব খানের পতনের মধ্য দিয়ে সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু তবুও ক্ষমতার লাগাম আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির হাতেই সুরক্ষিত ছিল। সরকারের ভেতরে পরিপূরক ভূমিকা পালনের জন্য তাদের তখনও রাজনীতিবিদদের প্রয়োজন ছিল। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তার নিজের ভেটো প্রদানের ক্ষমতা বজায় রেখে ‘সাংবিধানিক সরকার’ পুনর্বহালের প্রতিশ্রুতি দেন। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় যা একটি রাজনৈতিক সংকটে পর্যবসিত হয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এটি একটি জটিল ইতিহাস, যা আমি অন্যত্র বিস্তারিতভাবে নিরীক্ষা করেছি। এর প্রথম পর্যায়ে, অর্থাৎ ‘সংসদীয় সরকার’-এর আমলে আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির প্রকৃত ভূমিকাটি একটি রাজনৈতিক কল্পকাহিনীর আড়ালে অস্পষ্ট ছিল, যার অধীনে এটি পরিচালিত হতো। ১৯৫৮ সালের পর এর আধিপত্যশীল এবং নির্ণায়ক ভূমিকাটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেটি এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে তা হলো পাকিস্তানের বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণি এবং এর বিভিন্ন অঞ্চলের প্রেক্ষিতে আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কি কিংবা এর বিভিন্ন অংশের সামাজিক চরিত্র, সম্পৃক্ততা এবং দায়িত্বসমূহ; যার মধ্যে সেই কেন্দ্রস্থ বুর্জোয়ারাও অন্তর্ভুক্ত, যারা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর বহুবচনে পুনরায় হাজির হয়েছে।

    পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসের দ্বিতীয় প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির কর্তৃত্বের প্রতি সবচেয়ে শক্তিশালী চ্যালেঞ্জগুলো আসে প্রধানত সেইসকল রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে যেগুলো তাদের শক্তি জড়ো করে সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলগুলোর মানুষদের থেকে; যেগুলো আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং ভৌত সম্পদের বণ্টন ও রাষ্ট্রক্ষমতায় সেই অঞ্চলগুলোর পূর্ণাঙ্গ হিস্যার সপক্ষে সোচ্চার ছিল। কেবল পূর্ববঙ্গ থেকেই নয়, বরং সিন্ধু, বেলুচিস্তান এবং পাঠানদের দেশ উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ (NWFP) থেকেও এই ধরণের চ্যালেঞ্জগুলো উত্থাপিত হয়। আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রতি সমর্থন র‍্যাডিকাল এবং বামপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর কাছে ইমানের অংশ হয়ে ওঠে। সত্যিকার অর্থেই, তাদের অধিকাংশই আঞ্চলিকতাবাদী আন্দোলনগুলোতে গভীরভাবে জড়িত ছিল । আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছিল যে, পাকিস্তানের র‍্যাডিকাল রাজনীতি আঞ্চলিক সীমানা ভেদকারী শ্রেণি সংহতির পরিবর্তে প্রধানত জাতিগত বা ভাষাগত সংহতির দ্বারা প্রভাবিত ছিল। আসলে র‍্যাডিকাল চ্যালেঞ্জগুলো শ্রেণিগত সুযোগ-সুবিধার বিরুদ্ধেই পরিচালিত ছিল। কিন্তু এই সুবিধাগুলোকে তারা মূলত আঞ্চলিক মানদণ্ডেই চিহ্নিত করে। রাজনৈতিকভাবে, এই র‍্যাডিকাল এবং বামপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোর দাবি ছিল একটি যুক্তরাষ্ট্ৰীয় সংসদীয় সরকারব্যবস্থা এবং আমলাতান্ত্রিক (ও সামরিক) নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতি-নির্ধারণী পদগুলোতে সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। পাকিস্তানের রাজনীতির এই দুটি অনন্য বৈশিষ্ট্য, অর্থাৎ, আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির আধিপত্য এবং এর বিরুদ্ধে পরিচালিত চ্যালেঞ্জের আঞ্চলিক ভিত্তি, মূলত পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি একক বাস্তবতারই দুটি দিক, যা এই আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির ভূমিকাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়।

    ১৯৫৮ সালের আগ পর্যন্ত পাকিস্তানের আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কি একের পর এক প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের মাধ্যমে ‘সরকার’ গঠন এবং পতন ঘটিয়েছিল। ১৯৫৬ সালে তারা এমনকি ‘রিপাবলিকান পার্টি’৭ গঠনেও উস্কানি দেয়। ১৯৫৮ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ‘ক্ষমতা দখল’-এর পর ১৯৬২ সালে আইয়ুব খান একটি নতুন ধরণের সংবিধান প্রণয়ন করেন। রাজনীতিবিদদের পুনরায় কাজে লাগানো শুরু হয়; আইয়ুব খানের আমলে তাদের ছলচাতুরি একটি নিখুঁত শিল্পে পরিণত হয়েছিল। এখানে লক্ষণীয় যে, রাজনৈতিক সরকারের একটি বহিরাবরণ বজায় রাখার ব্যাপারেও সামরিক নেতাদের প্রবল উদ্বেগ দেখা দেয়। ফলে, ১৯৬৯ সালে পুনরায় সামরিক আইন জারি করার পর প্রেসিডেন্ট জেনারাল ইয়াহিয়া খান আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির অধীনে যত দ্রুত সম্ভব একটি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ক্ষমতায় বসাতে অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সেই লক্ষ্যে তিনি নির্বাচনের আশ্বাস দেন এবং তৎক্ষণাৎ একদল মনোনীত বেসামরিক ব্যক্তিকে অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করেন। তার সবচেয়ে প্রভাবশালী সামরিক উপদেষ্টাদের মধ্যে কেউ কেউ বিশেষভাবে জোর দিয়েছিলেন যে, রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় না থাকলে সামরিক বাহিনী সরাসরি জনঅসন্তোষের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। এটি তার রাজনৈতিক বৈধতার মোড়ক হারাবে এবং ফলস্বরূপ প্রতিটি সংকটের মুহূর্তে তাদের হস্তক্ষেপ করার স্বঘোষিত অধিকার সংকটাপন্ন হয়ে পড়বে। সুতরাং, আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কি সর্বদা সরাসরি নিজেদের নামেই শাসন করতে পছন্দ করে, এমনটি ধরে নেওয়া একটি অতিসরলীকরণ হবে। তারা প্রায়শই রাজনীতিবিদদের মাধ্যমে শাসন করতে পছন্দ করে, যতক্ষণ পর্যন্ত না সেই রাজনীতিবিদরা তাদের আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন ও ক্ষমতা ক্ষুণ্ণ করে । কিন্তু পাকিস্তানের আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির জন্য ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের ফলাফল ছিল অস্বস্তিকর; এবং ফলস্বরূপ ১৯৭১ সালের সংকটের সূত্রপাত ঘটে, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

    ১. র‍্যালফ মিলিব্যান্ড একজন ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী ও তার আমলের অন্যতম প্রভাবশালী ইন্সট্রুমেন্টাল মার্ক্সবাদী চিন্তক।

    ২. কেন্দ্রস্থ বুর্জোয়া বলতে ঔপনিবেশিক শাসন কায়েমকারি দেশের পুঁজিপতি শ্রেণিকে বোঝায়।

    ৩. অবকাঠামো ও উপরি-কাঠামো মার্ক্সীয় দর্শনের অন্যতম মৌলিক ধারণা। অবকাঠামো বা বুনিয়াদ বলতে বোঝানো হয় একটি সমাজের উৎপাদিকা শক্তিসমূহ ও উৎপাদন সম্পর্কসমূহকে। আইন, রাষ্ট্র ও ভাবাদর্শ মিলে গঠিত হয় সমাজের উপরি-কাঠামো। ফরাসি চিন্তক লুই আলথুসের মতে উপরি-কাঠামোর আবার দুটি স্তর রয়েছে; রাষ্ট্র হলো প্রথম স্তর ও দ্বিতীয় স্তর হলো ভাবাদর্শ, যার অন্তর্ভুক্ত ধর্মীয়, নৈতিক, ও রাজনৈতিক ভাবাদর্শ। তবে, আলাভি তার লেখায় উপরি-কাঠামো মূলত রাষ্ট্র অর্থেই ব্যবহার করেছেন।

    ৪. অলিগার্কি হলো এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে ক্ষমতা একটি ছোট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। পাকিস্তানে এই কেন্দ্রীভবন ঘটে আর্মি জেনারেল ও কিছু উচ্চপদস্থ আমলাদের ঘিরে।

    ৫. ১৮৫৮ সালে কোম্পানি শাসনের অবসান হলে ভাইসরয়ের অধীনে আমলাদের মাধ্যমে ব্রিটিশ রাজ চালানো হয়। এই পর্যায়ে ক্ষমতা ছিল অনেকটাই আমলাতান্ত্রিক ও এককেন্দ্রিক। পরবর্তীতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের দাবির মুখে ১৯১৯ সালে ‘মর্লে-মিন্টো সংস্কার’-এর মাধ্যমে আইনসভার সদস্য সংখ্যা ১৬ থেকে বাড়িয়ে ৬০ করা হয় এবং এর ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়। পুলিশ, অর্থ, ভূমি রাজস্ব ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভাইসরয় এবং তাঁর মনোনীত পরিষদ সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রেখে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ইত্যাদি বিষয় নির্বাচিত ভারতীয় মন্ত্রীদের হাতে হস্তান্তর করা হয়। ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে প্রাদেশিক স্বায়তশাসন প্রদান করা হয়, ভাইস-রয়ের নির্বাহী কাউন্সিলের পরিবর্তে মন্ত্রীপরিষদ গঠন করা হয় এবং ভোটাধিকার সম্প্রসারণ করা হয়। এর মাধ্যমে ক্ষমতার পারদ আমলাদের থেকে রাজনীতিবিদদের দিকে খানিকটা ঝোকে।

    ৬. আইয়ুব খানের ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ (Basic Democracy) ছিল একটি নিয়ন্ত্রিত ও পরোক্ষ নির্বাচনী ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে তিনি তার সামরিক শাসনকে একটি বেসামরিক খোলস দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৫৯ সালে প্রবর্তিত এই পদ্ধতিতে সাধারণ ভোটাররা সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে পারতেন না; তারা কেবল তৃণমূল পর্যায়ের ৮০,০০০ স্থানীয় প্রতিনিধি (বিডি মেম্বার) নির্বাচিত করতেন, যারা পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট ও আইনসভার সদস্য নির্বাচনের জন্য একটি ইলেক্টোরাল কলেজ হিসেবে কাজ করত।

    ৭. ১৯৫৬ সালে ‘ওয়ান ইউনিট স্কিম’ অর্থাৎ, পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশগুলোকে একত্র করে একক পশ্চিম পাকিস্তান প্রদেশ করার দাবিতে মুসলিম লীগ ভেঙ্গে পাকিস্তান রিপাবলিকান পার্টি গঠিত হয়। এর গঠনের পেছনে কলকাঠি নাড়ে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব এবং সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইসকান্দার মির্জা ও পশ্চিম পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী ডা. খান সাহিব। জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে সামরিক আইন জারি করলে ৭ অক্টোবর ১৯৫৮ সালে দলটি বিলুপ্ত করা হয়। আলাভি মূলত ১৯৫৮ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের আগে থেকেই পাকিস্তানের রাজনীতিতে পর্দার আড়ালে সামরিক বাহিনীর ভূমিকার উদাহরণ হিসেবে রিপাবলিকান পার্টির প্রসঙ্গ টানেন।

  • এমা গোল্ডম্যান ।। নারীমুক্তির ট্র্যাজেডি

    এমা গোল্ডম্যান ।। নারীমুক্তির ট্র্যাজেডি

    • অনুবাদ: তন্বী তরুনীমা চৈতী

    [অনূদিত প্রবন্ধটি এমা গোল্ডম্যানের Anarchism and Other Essays গ্রন্থটি থেকে নেয়া হয়েছে। এটিই এমা গোল্পম্যানের প্রথম প্রকাশিত বই। বইয়ের প্রবন্ধগুলো প্রথমে বক্তৃতা আকারে দেয়া হয়, Mother Earth নামক জার্নালের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। মূল ইংরেজি লেখাটি “The Tragedy of Woman’s Emancipation” শিরোনামে। অরাজের জন লেখাটি অনুবাদ করেছেন তন্বী তরুণীমা চৈতী। – সম্পাদক]

    এমা গোল্ডম্যান
    (১৮৬৯-১৯৪০)
    আর্টওয়ার্ক: এলিয়া-ইলাস্ট্রেশন
    সূত্র: ডিভিয়ান্ট আর্ট

    একটি স্বীকারোক্তি দিয়ে আমি আলোচনা শুরু করছি—আমার মতে শ্রেণী, জাতি কিংবা নারী এবং পুরুষ অধিকারের নামে কৃত্রিম বিভক্তি রেখা সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তত্ত্বগুলো মানবজাতির পুর্ণাঙ্গ গল্পটি বলে না। এসব বিভাজনের ঊর্ধ্বে আছে এক অভিন্ন ভিত্তি, যা আমাদের সকলকে একীভূত করে—এমনটাই আমার বিশ্বাস।

    এই বিশ্বাসের মাধ্যমে কোনোপ্রকার শান্তিচুক্তির প্রস্তাব উত্থাপনের অভিপ্রায় আমার নেই। আজকের সমাজ স্বার্থের সংঘাত আর বৈষম্যের বেড়াজালে জর্জরিত। তবে এই বৈরিতা চিরস্থায়ী নয়। অর্থনৈতিক ন্যায্যতার ভিত্তিতে নির্মিত নতুন সমাজব্যবস্থায় এসব বিভেদের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।

    মানুষে মানুষে সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক শর্ত মানুষের উপরিগত অভিন্নতা কিংবা ব্যক্তির স্বকীয়তা মুছে ফেলা (superficial equalization of human beings) নয়। নিজস্বতা না খুইয়ে সকলের সাথে একাত্বতাবোধ করা, সবার প্রতি সংবেদনশীল হওয়ার পাশাপাশি নিজের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ধরে রাখাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই বিড়ম্বনার মোকাবেলা দ্রুততার সাথে করা প্রয়োজন। কেননা এই জটিলতার সমাধা হলেই সমাজ এবং ব্যক্তি, নারী এবং পুরুষ, গণতন্ত্রবাদী এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা বা true individuality-র চর্চাকারীরা একত্রিত হতে পারবে। উপরিউক্ত সমস্যার সমাধানেই বিরোধ আর বিবাদের নিষ্পত্তি নিহিত। আমাদের লক্ষ্য সকলকে ক্ষমা করা নয়; আমাদের লক্ষ্য একে অন্যকে বোঝার চেষ্টা করা। ব্যক্তিগতভাবে আমি মাদাম দে স্তালের (Madame de Staël) উদ্ধৃতি ‘সবকিছু বোঝার অর্থ সবকিছু ক্ষমা করা’–এর সাথে একমত নই। উদ্ধৃতিটি আমার কাছে স্বীকারোক্তিমূলক শোনায়। পুরো বিষয়টির ভেতর একপ্রকার কপট অহমিকা প্রকাশ পায়—ক্ষমাকারী যেনো নিজের আত্মম্ভরিতা জাহির করতে ইচ্ছুক। প্রকৃতপক্ষে, আরেকজন ব্যক্তিকে সত্যিকার অর্থে বোঝাটাই যথেষ্ট। আমার এই বিশ্বাস নারী মুক্তি এবং সকল নারীর উপর এর প্রভাব সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গির আংশিক প্রতিনিধিত্ব করে।

    মুক্তি নারীকে মানুষ হিসেবে যথার্থ জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি করে দেবে। নারীরা যা বলতে এবং করতে চায়—তার সবটাই সে করতে পারবে। বাঁধার সকলপ্রকার কৃত্রিম দেয়াল ভেঙে পরবে; শতাব্দীপ্রাচীন বশ্যতা আর দাস্যত্বের চিহ্ন বিলুপ্ত হয়ে উন্মুক্ত হবে স্বাধীনতার পথ। বস্তুত তাঁর পূর্ণ স্বাধিকার নিশ্চিত হবে।

    আর এটিই ছিলো নারীমুক্তি আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। তবে এই আন্দোলনের বাস্তবিক অর্জন (এখন পর্যন্ত) নারীর বিচ্ছিন্নতা। স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া এসব আন্দোলন নারীর সব আনন্দ এবং পরিপূর্ণতার উৎস কেড়ে নিয়েছে। নামেমাত্র অধিকার প্রাপ্তি আধুনিক নারীকে পরিণত করেছে কৃত্রিম সত্ত্বায়। তাদের দেখলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ফরাসি আর্বোরিকালচার (arboriculture) চর্চা; প্রত্যেকে যেনো পরিশীলিত উদ্যানের অদ্ভুত কায়দায় প্যাঁচানো পিরামিড বা চাকা আকৃতির গাছ। কৃত্রিমতার আড়ালে ঢাকা পরে যায় স্বকীয়তা। আমাদের চারপাশে কৃত্রিমতার ধারক ও বাহক এমন নারীর অভাব নেই। কথাটি তথাকথিত বৌদ্ধিক পরিধির ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য।

    নারীর মুক্তি আর সমতা। আহা! সেসময়ের মহৎ ও সাহসী কিছু ব্যক্তির মুখে উচ্চারিত এসব কথা আমাদের মনে কী আশাই না জাগিয়েছিলো! নারী স্বাধিকারের সূর্যের পূর্ণ গৌরবে উদিত হওয়ার কথা ছিল, আমাদের উদ্ভাসিত করার কথা ছিলো। নিজের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকারপ্রাপ্তির এই লক্ষ্যটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। আর এই লক্ষ্য অর্জনে বহু নারীপুরুষ তাদের সর্বস্ব উৎসর্গ করেছিলো। অজ্ঞতা আর কুসংস্কারকে তারা মোকাবেলা করেছিলো দৃঢ়তা আর সাহসের সাথে।

    স্বাধীনতার এই লক্ষ্যে আমিও বিশ্বাস রাখি। কিন্তু আজকের দিনের নারী মুক্তি সম্পর্কিত বোঝাপড়া এবং এর চর্চা সেই মহান লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে সময়ের নারীরা এক অদ্ভুত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে—প্রকৃত অর্থে স্বাধিকার অর্জনের পূর্বশর্ত স্বাধীনতার আধুনিক ধারণা থেকে নিজেকে মুক্ত করা। পুরো বিষয়টি আপাতবিরোধী শোনালেও এটাই বাস্তবতা।

    তথাকথিত এই মুক্তি থেকে নারীর অর্জন কী? গুটিকয়েক রাজ্যে ভোটাধিকার চর্চার সুযোগ। কিন্তু তাতে কি হিতাকাঙ্ক্ষীদের সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্নের একাংশও বাস্তবায়িত হয়েছে? মোটেই না। অনেকের কথা শুনলে মনে হয় সমাজে বিদ্যমান দুর্নীতির প্রাদুর্ভাবকে স্বীকার করতে তারা অপারগ। বিচার বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের এরূপ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এটাই যথাযথ সময়। দুর্নীতি কোনো একক ব্যক্তি বা রাজনীতিবিদের নৈতিকতার অভাবের (laxity of morals) ফলাফল নয়; সমস্যাটির একটি বস্তুগত ভিত্তি রয়েছে। রাজনীতি মূলত ব্যবসা এবং শিল্প (industrial) জগতের প্রতিচ্ছবি। আর এই জগত তার কার্যক্রম চালায় ‘যত দেবে তার চেয়ে বেশি নাও’, ‘ব্যয়কৃত অর্থের সর্বোচ্চ ভোগ করো’, ‘এক অপরাধীই অন্য অপরাধীর দোষ আড়াল করতে পারে’ – এর মতো মন্ত্রগুলোকে কেন্দ্র করে। শুধুমাত্র ভোটাধিকার দিয়েই নারী রাজনীতির এই কলুষতা দূর করতে পারবে—এমন ভাবনা আকাশকুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছুই না।

    আর্টওয়ার্ক: ফিয়ার
    সূত্র: জ্যাঁ কুইক

    নারীর স্বাধিকার পুরুষের সাথে তার অর্থনৈতিক সমতা নিশ্চিত করে। অর্থাৎ নারী তার ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী পেশা ও কর্মজীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে নিজের লক্ষ্য অর্জনের পথে নারীর বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় তার প্রতিপালন (upbringing)। বেড়ে ওঠার সময় শারীরিক সহিষ্ণুতা বৃদ্ধির শিক্ষা তোলা থাকে ছেলেদের জন্য। মেয়েরা এই শিক্ষা বঞ্চিত। ফলত কাজের ক্ষেত্রে পুরুষের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে নারীরা প্রায়শই হিমশিম খায়। পুরুষ অধ্যুষিত কর্মক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে গিয়ে নারীর সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। তীব্র শারীরিক ও মানসিক চাপ হয়ে ওঠে তার নিত্যসঙ্গী। খুব অল্পসংখ্যক নারীই তাদের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনে সক্ষম হন। শিক্ষক, ডাক্তার, আইনজীবী, স্থপতি কিংবা প্রকৌশলী—যত বর্ণাঢ্য পেশা হোক না কেন, একজন নারী কখনোই তার পুরুষ সহকর্মীর সমান মর্যাদা বা পারিশ্রমিক পান না। আর যে গুটিকয়েক নারীর কাছে সেই পরম আরাধ্য সাফল্য ধরা দেয়, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের কিছুই আর তাদের জীবনে অবশিষ্ট থাকে না। বিপুলসংখ্যক এসব কর্মজীবী নারীদের কাছে আমার প্রশ্ন—ঘরের বন্দি জীবন থেকে বেরিয়ে এসে কারখানা, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর কিংবা অফিসের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি আপনাদের ঠিক কতটুকু স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে? সারাদিন নিদারুণ পরিশ্রমের পর অধিকাংশ নারীর কাঁধে এসে পরে ঘর সামলানোর দায়িত্ব। দিনশেষে ঘর নারীর জন্য আর সুখের আলোয় থাকে না, পরিণত হয় শীতল, অগোছালো, আর বিষণ্ণ এক অঙ্গনে। মহান স্বাধীনতা, আহা! কাউন্টারের পেছনে কিংবা সেলাই মেশিন বা টাইপরাইটারে সামনে কাজ করতে করতে শ্রান্ত নারী বিয়ের প্রথম প্রস্তাবেই রাজি হয়ে গেলে তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকে না। বাবা মায়ের আগল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক তরুণী যতটা উন্মুখ, ঠিক ততটাই উন্মুখ কারখানার যাঁতাকলে পিষ্ট একজন যুবতী। জীবিকা নির্বাহের জন্য কিছু অর্থ ব্যতীত তথাকথিত স্বাধীনতা এমন কোনো প্রণোদনা সরবরাহ করে না যে একজন নারী এর জন্য সবকিছু ত্যাগ করবে। সর্বোপরি, অতি সমাদৃত এই স্বাধীনতা নারীর নিজের, প্রেমের এবং মাতৃত্বের সত্ত্বা বিলীন করে ফেলার এক ধীর প্রক্রিয়া।

    তথাপি একজন কায়িক নারী শ্রমিকের জীবন পেশাগতভাবে যেকোনো ‘সম্ভ্রান্ত’ শিক্ষিকা কিংবা নারী চিকিৎসক, আইনজীবী আর প্রকৌশলীর চাইতে অনেক বেশি মানবিক এবং স্বতঃস্ফূর্ত। বাইরে পরিশীলিত জীবন বজায় রাখলেও রিক্ততা আর শীতলতা এসব অভিজাত নারীর দৈনন্দিন সঙ্গী।

    স্বাধীনতার আধুনিক ধারণাগুলো অত্যন্ত সংকীর্ণ; প্রকৃতপক্ষে এগুলো নারীদের বেঁধে ফেলার ফাঁদ ছাড়া কিছুই না। অনেক পেশাজীবী নারীরা মনে করেন নিজের চেয়ে নিচু সামাজিক মর্যাদার কাউকে বিয়ে করা, প্রেম কিংবা মাতৃত্বের ‘বাঁধনে’ জড়ানো তাদের স্বাধীনতা এবং পেশাজীবনের কাল হয়ে দাঁড়াবে। সার্বক্ষণিক এই ভীতি আধুনিক স্বাধীন নারীদের একপ্রকার ব্রহ্মচর্য/ কুমারীত্ব পালনে বাধ্য করে। জীবনের অনেক গভীর অভিজ্ঞতা, হৃদয়ভাঙ্গন, আর অনিন্দ্য সুখের দর্শক হয়েই তার জীবন পার হয়ে যায়; সেগুলো উপভোগ করার সুযোগ আর তার হয়ে ওঠে না।

    নারীমুক্তির বর্তমান ধারক ও বাহকেরা স্বাধীনতার মর্মার্থ সম্পূর্ণরূপে অনুধাবনে ব্যর্থ। নারীর জন্য উপলব্ধ সীমাহীন ভালোবাসা আর তীব্র আনন্দের স্থান সমসাময়িক নারীমুক্তির ধারণায় অনুপস্থিত।

    স্বনির্ভর বা অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন নারীদের জীবন ঘটনাবহুল নয়; এই জীবন আবর্তিত হয় একটি ছোটো পরিধিকে কেন্দ্র করে। আর এটাই তাদের জীবনের ট্র্যাজেডি। সমকালীন নারীরা বিশ্বসংসার এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব বিষয়ে পূর্ববর্তী প্রজন্মের নারীদের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন—এবিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আর এই সচেতনতার দরুন এসময়ের নারীরা জীবনের নির্যাস খুঁজে পেতে আকুল। প্রাণশক্তি জাগিয়ে তোলা এবং জীবনের সাথে গভীরতর সংযোগ স্থাপনকারী এই নির্যাসের ধরা পাওয়ার মতো আধ্যাত্মিক গভীরতা তার নেই; সে একজন পেশাজীবী কলের পুতুল (professional automatons) মাত্র।

    এরূপ পরিস্থিতিই যে এসময়ের বাস্তবতা হবে—এমনটা অনুধাবন করা কঠিন কিছু না। বিশেষত ‘নারী পুরুষের অধস্তন’ –এর মতো মান্ধাতার ধারণা দ্বারা রূপায়িত আধুনিক বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন যেকোনো ব্যক্তির পক্ষে বিষয়টি বোঝা খুবই সহজ। পুরোনো হলেও সমাজ এরকম নারীবিদ্বেষী ধারণা সযত্নে ধারণ করে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, অনেক স্বাধীন, আধুনিক নারীও এসব বস্তাপচা ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না। বিদ্যমান ব্যবস্থা ভেঙে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা প্রতিটি আন্দোলনকে নেতৃত্ব দেয় র‍্যাডিকাল ধারণায় বিশ্বাসী/দীক্ষিত কিছু মানুষ। রাজপথের পরিবর্তনকামী এসব ব্যক্তিরা নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে এতটা র‍্যাডিকাল না। যেকোনো সাধারণ সংকীর্ণমনা মানুষের (average Philistine) মতোই তারা সম্ভ্রান্ত হওয়ার ভনিতা করে দিনাতিপাত করে। বিরোধী পক্ষের অনুমোদন তাদের পরম আরাধ্য। এমন অনেক সমাজতন্ত্রী আর নৈরাজ্যবাদীদের কথা আমরা জানি যারা ব্যক্তিগত সম্পদ আহরণকে চুরি মানলেও নিজেদের হিস্যার এক পয়সাও ছাড় দিতে প্রস্তুত নন।

    এই একই সংকীর্ণমনা মানুষগুলোকে খুঁজে পাওয়া যাবে নারীমুক্তির আন্দোলনে। ট্যাবলয়েড সাংবাদিক আর দুর্বলচিত্তের লেখকেরা স্বাধীনচেতা নারীর এমন এক চরিত্র রচনা করেছেন যা ছাপোষা ব্যক্তি আর তাদের সঙ্গীদের মনে ভীতির সঞ্চার করে। নারী অধিকার আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট নারীদের বিতর্কিত বিদ্রোহী হিসেবে উপস্থাপন করতো গণমাধ্যমগুলো; আন্দোলনরত প্রত্যেক নারীই যেনো আলোচিত/সমালোচিত লেখিকা জর্জ সান্ড (George Sand)। কোনো পরিস্থিতিতেই তিনি ভীত হতেন না। নারীপুরুষের মধ্যকার ‘আদর্শ’ সম্পর্কের ধারণাকেও খুব একটা তোয়াক্কা করতেন না তিনি। মোটকথা, নারীর স্বাধীনতা চিত্রায়িত হয় কাম আর পাপে পূর্ণ সমাজ বিচ্ছিন্ন বেপরোয়া জীবনের কামনা হিসেবে। স্বাভাবিকভাবেই এরকম উপস্থাপন আন্দোলনের সাথে যুক্ত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। গম্ভীর আর রসবোধহীন এই নেতারা এসব ভ্রান্ত দাবিগুলো উপেক্ষা না করে আলিঙ্গন করেন; তাদের সংগ্রাম যে উল্লিখিত চিত্রায়নের সম্পূর্ণ বিপরীত—সকল বিষয়টি বোঝাতে তারা উঠেপড়ে লাগেন।

    ‘পুরুষের হুকুমের দাস হয়ে থাকা নারী সত্তার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে’—এই যুক্তিকে কেন্দ্র করে নারী আন্দোলন বিকাশ লাভ করে। তবে বর্তমানের কথা ভিন্ন। নারীরা এখন অনেকটাই মুক্ত এবং স্বাধীন (অন্তত আগের তুলনায় বেশি স্বাধীন)। সমাজ থেকে কলুষতা দূর করায় নারীর সক্ষমতা প্রমাণ করা সমসাময়িক নারীমুক্তি আন্দোলনের প্রাথমিক লক্ষ্য। তবে এটা অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই যে, নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলন অনেক প্রতিবন্ধকতার দেয়াল ভেঙে ফেললেও নতুন নতুন আগল সৃষ্টি করেছে। স্বাধিকারের এই সংগ্রাম এমন কোনো শক্তিশালী নারীর প্রজন্ম তৈরি করতে পারেনি যারা প্রকৃত ও পূর্ণ স্বাধীনতা সামাল দিতে পারবে। সঙ্কীর্ণ ও গোঁড়া (Puritanical) দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা প্রভাবিত স্বাধীনতাকামী নারীদের অনুভূতির জগতে পুরুষের কোনো স্থান নেই। তাদের এই বিশ্বদর্শন পুরুষকে দেখে অপ্রয়োজনীয় এবং অসহনীয় সত্তা হিসেবে। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলো কেবল বাবা হিসেবে পুরুষের ভূমিকা। সেটাও সম্পূর্ণ জৈবিক কারণে। আশার কথা এই যে, অতি কঠোর বিশুদ্ধতাবাদীরাও মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষাকে কখনো অগ্রাহ্য করতে পারবেন না। নারী স্বাধীনতার সাথে পুরুষের স্বাধীনতা গভীরভাবে সম্পর্কিত। মুক্ত নতুন বিশ্বে ভূমিষ্ঠ শিশুর মায়ের ভালবাসা আর যত্নের যতখানি প্রয়োজন, ঠিক ততটাই দরকার বাবার উপস্থিতি। বিষয়টি মুক্তিকামী নারীরা অনেকসময় অগ্রাহ্য করেন। আধুনিক নারীপুরুষের জীবনের বিপর্যয়ের জন্য দায়ী মানব সম্পর্কের এই সংকীর্ণ ধারণা।

    আর্টওয়ার্ক: ওমেন ই এ আর্মচেয়ার
    শিল্পী: পাবলো পিকাসো
    সূত্র: আর্টসি

    প্রায় পনেরো বছর আগে নরওয়েজীয় লেখিকা লরা মার্হোম (Laura Marholm) Woman, a Character Study নামে একটি বই প্রকাশ করেন। তিনি নারী অধিকারের প্রচলিত ধারণার অগভীরতা ও সঙ্কীর্ণতা চিহ্নিত করা অগ্রদূতদের একজন। তাঁর মতে, স্বাধীনতার প্রথাগত ধারণার সীমাবদ্ধতা নারীর অন্তর্জগতে বিরূপ প্রভাব ফেলে। মার্হোমের লেখায় উঠে আসে অভিনেত্রী এলিওনোরা ডুসে (Eleonora Duse), গণিতবিদ সোনিয়া কোভালেভস্কি (Sonya Kovalevskaia), অকালে প্রাণ হারানো শিল্পী এবং কবি মারি বাশকির্টসেফের (Marie Bashkirtseff) মতো বেশ কয়েকজন বিখ্যাত ও প্রতিভাবান নারীর জীবন পর্যালোচনা। সাফল্যের জন্য তাদের সকলকেই বহু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিলো। অসাধারণ মেধাবী এবং সফল হলেও ব্যক্তিজীবনে তারা প্রত্যেকেই ছিলেন নিসঙ্গ। জীবনরস এবং ব্যক্তিগত পূর্ণতা তাদের হাতে ধরা দেয়নি। একাকীত্ব আর অস্থিরতা ছিলো তাদের নিত্যসঙ্গী। এই অসাধারণ চারিত্রিক পর্যালোচনাটি আমাদের সামনে একটি রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরে—নারীর মেধা ও মননের বিকাশের সাথে তাঁর সংবেদনশীল জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা ব্যস্তানুপাতিক। পুরুষেরা নারীকে একজন সঙ্গী, কমরেড ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হিসেবে কল্পনা করতে পারেনা; নারীর জৈবিক পরিচিতিই তাদের কাছে মুখ্য।

    নিজেকে নারীর চেয়ে ঊর্ধ্বতন মনে করা দাম্ভিক পুরুষের পক্ষে লরা মার্হোমের বর্ণিত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন নারীদের বরদাস্ত করা অসম্ভব। ঠিক একইভাবে, নারী ব্যক্তিসত্ত্বাকে উপেক্ষা করে কেবল তার বিচক্ষণতার প্রতি দৃষ্টিপাত করে—এমন পুরুষকে একজন নারীর পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন।

    সাধারণত প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও গভীর সংবেদনশীলতাকে প্রগাঢ় ব্যক্তিত্বের মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়। তথাপি আধুনিক নারীর বাস্তবতা ভিন্ন—বুদ্ধিমত্তা ও চারিত্রিক গভীরতা জীবনকে উদ্ভাসিত করার বদলে তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। এক শতকেরও বেশি সময় ধরে মানুষ প্রচলিত বিবাহব্যবস্থার সমালোচনা করে আসছে। আমৃত্যু একসাথে থাকার প্রতিজ্ঞার (till death doth part) ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এই ধর্মীয় বিবাহব্যবস্থা নারীর উপর পুরুষ কর্তৃত্বকে সমর্থন করে। নিজের পরিচিতি ও সামাজিক অবস্থান বিসর্জন দিয়ে স্বামীর আজ্ঞাবহ হয়ে নারী জীবন কাটাবে—এমনটাই আশা করা হয়। এটি বারংবার প্রমাণিত হয় যে, দাম্পত্যের চিরাচরিত সম্পর্কে নারীর ভূমিকা স্বামীর দাস এবং তাঁর সন্তানের ধারক হওয়াতেই সীমাবদ্ধ। এতো ত্রুটি আর অন্যায্যতা সত্ত্বেও বহু মুক্তমনা নারী অবিবাহিত থাকার চাইতে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে বেশি আগ্রহী; কেননা সামাজিক নিয়ম ও নৈতিকতার বেড়াজালে একজন অবিবাহিত নারীর জীবন দুঃসহ হয়ে ওঠে। এই বিদ্বেষপূর্ণ আচরণের বোঝা বহন করা সহজ নয়।

    আধুনিক নারীদের আচরণের এমন অসঙ্গতির একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে—স্বাধীনতার মর্মার্থ তারা কখনোই সত্যিকার অর্থে উপলব্ধি করতে পারেনি। অফিসের বস কিংবা স্বামীর মতো বাহ্যিক নিপীড়কের আগল ভেঙে ফেললেই মুক্তি অর্জিত হবে—এমনটাই তাদের ধারণা ছিলো। নিপীড়নের এই দেয়াল ভাঙতে গিয়ে তারা নিজেদের জীবন এবং মননে সামাজিক ও নৈতিক রীতিনীতির প্রভাবকে উপেক্ষা করে। বহিস্থ নিপীড়কের সাথে সমঝোতা হলেও নিজের ভেতর বেড়ে ওঠা সামাজিক স্বীকৃতির চাহিদাকে তারা ঘায়েল করতে ব্যর্থ হয়। ফলত তারা যেমন নারীমুক্তি আন্দোলনকারীদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করতে পারে, ঠিক তেমনি প্রৌঢ়া এবং বৃদ্ধ নারীদের সাথে কোনোপ্রকার বাকবিতণ্ডা ছাড়াই সময় কাটাতে পারে।

    এই অভ্যন্তরীণ নিপীড়কেরা একজন নারীর চারপাশের মানুষের কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি—মা, বাবা, ভাই বা আত্মীয়রা কী বলবে? পাড়া প্রতিবেশী বা সমাজ কী বলবে? নৈতিকতার ঝান্ডাধারী, মানবীয় সত্ত্বাকে অবরুদ্ধকারীদের মতামতই বা কেমন হবে? অন্তরস্থ এসব কণ্ঠস্বরকে উপেক্ষা করে দৃঢ়তার সাথে নিজের অবস্থান জানান দিতে না পারলে একজন নারী নিজেকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন বলতে পারেনা। জীবনসঙ্গী নির্বাচন, সন্তান জন্মদান থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে অনুমোদনের অপেক্ষা না করে ব্যক্তিগত অভিরুচি অনুসারে সিদ্ধান্তগ্রহণের ভেতরই প্রকৃত স্বাধীনতা নিহিত। নিজের ভেতর বেড়ে ওঠা ভালোবাসার তীব্র দাবীকে গ্রাহ্য করার সাহস কতজন নারী দেখাতে পারে?

    ফরাসি লেখন জঁ রিব্র্যাক (Jean Reibrach) তাঁর লেখা New Beauty গ্রন্থে একজন আদর্শ মুক্তিকামী নারীর বর্ণনা দেন। এই আদর্শ রূপটি একজন সদয় ও মেধাবী তরুণী চিকিৎসকের মধ্য দিয়ে মূর্ত হয়ে ওঠে। মানুষকে শিশুযত্ন এবং পুষ্টি বিষয়ে তিনি পরামর্শ দেন; দরিদ্র মায়েদের বিনামূল্যে ওষুধ দেন তিনি। প্রায়শই তিনি পরিচিত এক যুবকের সাথে উন্নত ও স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যতের বিষয়ে আলোচনা করেন। সামনের দিনগুলোতে পর্দা আর শতরঞ্জির পরিবর্তে পাথরের মেঝে আর দেয়ালের ব্যবহার কীভাবে জীবাণু আর ব্যাকটেরিয়াকে দূরে রাখবে—সে বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেন তিনি। তাঁর পোশাক অত্যন্ত সাদামাটা এবং পেশাদার; বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই তিনি কালো কাপড় পরিধান করেন। তরুণীর মুক্তমনা স্বভাব আর বুদ্ধিমত্তা সঙ্গী যুবকের মনে প্রথমে ধাক্কা দেয়। তবে ধীরে ধীরে চিকিৎসক তরুণীকে বুঝতে শেখেন তিনি। তারপর আচমকা একদিন যুবক বুঝতে পারেন তিনি সেই তরুণী চিকিৎসকের প্রেমে পরেছেন। তারা দুজনেই তরুণ। পোশাকে কাঠিন্য ধরে রাখলেও তরুণীর কালো পোশাকের কলার আর আস্তিনে জায়গা করে নেয় ধবধবে সাদা রঙ। সবাই হয়তো আশা করবেন যে যুবকটি প্রেম নিবেদন করছিলো। কিন্তু প্রেমের বশবর্তী হয়ে নাটকীয় কিছু করার মতো মানুষ সে নয়। নিখুঁত মাধুর্যের অধিকারী তরুণীর সামনে কবিতাপাঠের মাধ্যমে প্রেম নিবেদন সামঞ্জস্যহীন। হৃদয়ে জেগে ওঠা প্রেমকে যুবক অগ্রাহ্য করে এবং নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রাখে। তরুণীও আত্মসংযমী ও যৌক্তিক; নিজের মনের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে সে। পাঠক হিসেবে আমার মনে হয় যে, যদি তারা কখনো একে অন্যকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিতো, তবে যুবকটির জীবন কাটতো কঠিন শীতলতায়। পুরো সম্পর্কটাই হতো শীতল ও নিষ্প্রাণ। স্বাধীনতার নতুন ধারণার ভেতর আশাব্যঞ্জক কোনো কিছু যে আমি দেখতে বা কল্পনা করতে পারছি না—এটা স্বীকার করতে আমার কুণ্ঠা নেই। আধুনিক শীতল যথার্থতার (correctness) চাইতে পুরনো উন্মত্ত ভালোবাসা আমার বেশি প্রিয়; আমি ভালবাসি প্রেমের গান; আমার ভালো লাগে ডন হুয়ান (Don Juan) আর মাদাম ভেনাসের প্রেমের আখ্যান; আধুনিক ভালবাসার কাঠিন্যের চাইতে জ্যোৎস্নাস্নাত রাতে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া প্রেমিক প্রেমিকাকে পরিবারের অস্বীকার, তা প্রতিবেশীদের রটনা আমার কাছে শ্রেয়। নিঃস্বার্থ আদানপ্রদান না হলে তাকে ভালোবাসা বলা যায়না ; তা কেবল পারস্পরিক লেনদেনের হিসাব রাখার খাতা।

    শিল্পী: গাজবিয়া শিরি

    আজকের দিনের নারী স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা এর কৃত্রিম অটলতা ও সংকীর্ণতা। পেশাদারিত্ব আর কঠোর সামাজিক নিয়মনীতি মেনে চলতে গিয়ে নারীদের মন থেকে জীবনরস শুকিয়ে যায়, বিরাজ করে খাঁ খাঁ শূন্যতা। আমি লক্ষ্য করেছি যে, সন্তানদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যকে নিজের সত্তার কেন্দ্রবিন্দু মনে করা সাবেকি মায়েরা হাল ফ্যাশনের মুক্ত নারীদের চাইতে অনেক বেশি স্বাধীনতা উপভোগ করতেন। মুক্তির সাধকেরা আমাকে মোটেই পছন্দ করেন না। তাদের বিশ্বাসের সাথে একমত না হওয়ার দরুন তারা আমার শাস্তি কামনা করতেন। অগ্রগতিতে অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপকারী এসব সমালোচকেরা আমার যুক্তিকে অগ্রাহ্য করেন। অতীত নিখুঁত—এমনটা আমি কখনোই বলিনি। আমি কেবল বলতে চেয়েছি যে আমাদের দিদিমা ঠাকুমারা আমাদের চাইতে অনেক বেশি জীবনীশক্তির অধিকারী ছিলেন। তারা ছিলেন অনুরাগী, তীব্র রসবোধসম্পন্ন। সহজ সুন্দরের প্রতি তারা ছিলেন সহানুভূতিশীল। পেশাদারিত্ব আর কঠোরতা কলেজ আর অফিসগামী আধুনিক নারীদের মন থেকে স্ফূর্ততা শুষে নিয়েছে। তার মানে এই নয় যে আমি চাই নারীরা তাদের আগের জীবনে ফিরে যাক, নিজেদের জীবনকে রান্নাঘর আর বাগানের গণ্ডিতে বেঁধে ফেলুক।

    উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে উদ্যমী অগ্রযাত্রায় আমাদের মুক্তি নিহিত। আমাদের প্রয়োজন পুরনো ঐতিহ্য আর অভ্যাস থেকে বেরিয়ে এসে অবাধ বিকাশের প্রতি মনোনিবেশ করা। নারীর স্বাধিকার অর্জনের লক্ষ্য অর্জনে নারীমুক্তি আন্দোলনের এখন পর্যন্ত অর্জন অতি সামান্য। তবে এই অর্জন অব্যাহত থাকবে, এমনটাই আশা করি। ভোটাধিকার বা নাগরিক অধিকার অর্জন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে ব্যালট বক্স কিংবা কোর্টরুম থেকে সত্যিকারের স্বাধীনতা আদায় হয় না; মুক্তির অর্জন শুরু হয় নারীর নিজের সত্তা থেকে। নিপীড়ন থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম পদক্ষেপ স্বীয় প্রচেষ্টা। ইতিহাসে এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। নারীদের অনুধাবন করতে হবে যে, স্বাধীনতা কেউ কারো হাতে তুলে দেয় না; এর জন্য কঠোর সংগ্রাম করতে হয়। একজন যতটা শক্তি আর উদ্যমের সাথে লড়াই করবে, সে ঠিক ততটাই স্বাধীনতা পাবে। সুতরাং, নিজের অন্তর্দ্বন্দ্ব নিরসন আবশ্যকীয়। রীতিনীতি, প্রথা আর সংস্কৃতির বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা নারীর অবশ্যকর্তব্য। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমঅধিকারের দাবী তোলা যৌক্তিক এবং ন্যায়সঙ্গত। তবে ভালোবাসা পাওয়া এবং ভালবাসতে পারার অধিকার বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। ‘প্রেয়সী বা মায়ের ভূমিকা নারীকে পুরুষের অধস্তন করে’—এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে নারীরা তাদের আংশিক স্বাধীনতায় পূর্ণতা খুঁজে পাবে। স্বাতন্ত্র্য অর্জনের জন্য নারী—পুরুষের দ্বৈততার ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা অপরিহার্য।

    সংকীর্ণতা বিভক্ত করে, উদারতা ঐক্যবদ্ধ করে। আসুন আমরা একত্রিত হই। তুচ্ছ বিষয়ের ভিড়ে আমাদের বৃহৎ লক্ষ্যগুলো যেনো হারিয়ে না যায়। মানবসম্পর্কের সম্যক ধারণা লাভ করলে নারী পুরুষের ভেতর ‘কে কাকে নিয়ন্ত্রণ করলো’ আর ‘কে নিয়ন্ত্রিত হলো’—এই প্রশ্নগুলো আমাদের আর বিচলিত করবে না। একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাবার প্রচেষ্টার পরিবর্তে আমাদের উচিত সবাইকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসা। ভালবাসার ভেতরেই আমরা খুঁজে পাবো পরিপূর্ণতা। এই পূর্ণতাই আমাদের শূন্যতার অনুভূতি দূর করবে; নারীমুক্তির ট্রাজেডিকে পরিণত করবে অসীম সুখের উৎসে।

  • উত্তরাধুনিকতাবাদ নিয়ে সিআইএর মূল্যায়ন

    উত্তরাধুনিকতাবাদ নিয়ে সিআইএর মূল্যায়ন

    • অনুবাদ: আবদুল্লাহ বুবুন

    [বর্তমান সময়ে গোটা বিশ্বেই বুদ্ধিত্তিক ও একাডেমিক অঙ্গনে ফরাসি উত্তর–আধুনিক বা আরও স্পষ্ট করে বললে উত্তর–কাঠামোবাদি চিন্তার ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্যণীয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী প্রেক্ষাপটে গোটা বিশ্ব দুটি সুপার পাওয়ারে ভাগ হয়ে যখন বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়, তার প্রভাব পড়ে বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনেও। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী শক্তি, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতন্ত্র। এই দুই শক্তিকে কেন্দ্র করেই সম্রাজ্যের প্রয়োজনেই বিকাশ লাভ করতে থাকে নানা বুদ্ধিবৃ্ত্তিক ও ভাবাদর্শিক চিন্তাধারা। বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আমরা দেখতে পাই ফরাসি বামপন্থী দার্শনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে একটা নতুন বাঁকবদলের। এই নতুন দার্শনিক গোষ্ঠীদের এখন প্রায়শই উত্তর–কাঠামোবাদী, উত্তর–আধুনিকতাবাদী নানা তকমায় চিহ্নিত করা হয়। এই নতুন দার্শনিক গোষ্ঠীর মধ্যে আমরা একদিকে যেমন দেখতে পাই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী রাজনীতির প্রতি ভরসা হারিয়ে ফেলার ব্যাপারটি, অন্যদিকে জনপরিসরে রাজনৈতিক বিতর্ক ও বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতার প্রতি অনাগ্রহ। বিপ্লবী রাজনীতির কৌশল, কর্মপন্থার বদলে তাদের বিশ্লেষণের কেন্দ্রে চলে আসে রাষ্ট্র, ক্ষমতা, ভাষা ও সংস্কৃতি। এই দার্শনিক গোষ্ঠী এসে আধুনিকতাবাদের যাবতীয় মেটান্যারেটিভ বা মহাবয়ানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। মার্ক্সবাদকেও তারা দেখেন এক মহাবয়ান হিসেবে। ফলে স্বভাবতই মার্ক্সবাদের গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ তাদের ব্যবচ্ছেদের লক্ষ্য হয়ে উঠে। ১৯৮৫ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ একটি গবেষণাপত্র প্রস্তুত করে ফরাসি এই নতুন দার্শনিক, বুদ্ধিবৃত্তিক গোষ্ঠীদের নিয়ে। সিআইএর মূল্যায়নে এই নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক বাঁকবদল একদিকে যেমন ফ্রান্সে সমাজতন্ত্র ও সোভিয়েত প্রভাব খর্ব করতে সাহায্য করবে একই সাথে মার্কিন নীতির বিরুদ্ধে শক্তিশালী কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রতিবন্ধকতা হিসেবেও কাজ করবে। ২০১১ সালে সিআইএ এই প্রতিবেদনটির একটি সেন্সরড ভার্শন প্রকাশ করে তথ্য অধিকার আইনের আওতায়। মূল প্রতিবেদনটি পড়তে এই লিংকে ক্লিক করুন। ২০১৭ সালে ওপেন কালচার নামক একটি অনলাইন পোর্টাল সিআইএর এই প্রতিবেদনটির উপর একটি পর্যালোচনা প্রকাশ করে। বর্তমান নিবন্ধটি সেই পর্যালোচনারই অনুবাদ। – সম্পাদক]


    ছবি: সিআইএর প্রতিবেদনের একটি পাতা

    দর্শনের মতো একটি শাস্ত্রের সরকারি নীতি–নির্ধারণ তথা রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে তেমন কোন প্রভাব থাকতে পারে, তা আমরা সাধারণত মনে করি না৷ কেননা, সরকারের কার্যক্রমকে সদা প্রভাবিত করা নির্ধারকগুলোর (মধ্যবিত্তের টিকে থাকার উদ্বিগ্নতা বা উচ্চবিত্তের স্টক নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা কিংবা দারিদ্র‍্যের সদা উপস্থিতি) অবস্থান দর্শনের আলোচ্য বিষয় থেকে অনেক দূরে। তবে আমাদের এই অনুমান সবসময় সত্য নাও হতে পারে। বিভিন্ন সময়ে যখন চিন্তাশীল ও পড়ুয়া ব্যক্তিরা রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী কিংবা সিনেটর হয়েছেন, তখন ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা, লিও স্ট্রস, জার্গেন হাবারমাস কিংবা জন রলসের (যিনি প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন) মতো দার্শনিকদের ধ্যানধারণা রাষ্ট্রনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। ঐতিহাসিকভাবে খুব কম দার্শনিকই জার্মান চিন্তক কার্ল স্মিটের মতো প্রভাবশালী ছিলেন; যদিও তার প্রভাবের স্বরূপ ছিল সম্পূর্ণ ধ্বংসাত্মক৷ এছাড়া রয়েছে জন লক, জাঁ জ্যাক রুশো, থমাস হবস, অ্যারিস্টল এবং সক্রেটিস, যারা রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ে বহুমুখী প্রভাব রাখা দার্শনিকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

    তবে যখন আমরা উত্তর–আধুনিকতাবাদের সাথে জড়িত ফরাসি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের (যার কেন্দ্রে ছিলেন মিশেল ফুকো, রোলা বার্থ, জাক লাকাঁ, দেরিদাসহ আরও অনেকে) দিকে তাকাই, তখন রাষ্ট্রনীতিতে তাদের তেমন সরাসরি প্রভাব দেখা যায় না। অধিকাংশ সময়ই এইসব লেখকরা গুরুত্বহীন ও প্রভাবশূন্য বলে বিবেচিত হয়। দায়ী করা হয় তাদের ভাষাকে, যা বামঘেষা একটি অভিজাত বুদ্ধিবৃত্তিক বলয় ব্যতীত অন্য কেউ বুঝতে পারে না। এই বক্তব্য সম্ভবত কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য—যেখানে ক্ষমতাকে প্রায়শই তত্ত্বায়িত করা হলেও খুব কম সময়ই মূলধারার প্রকাশনায় ক্রিটিক করা হয়৷ তবে এই আলাপ ফ্রান্সের ক্ষেত্রে সত্য নয়। অন্তত সিআইএ তা–ই মনে করে। কমিউনিজম ও অ্যান্টি–আমেরিকানিজমের বিরুদ্ধে নিজেদের দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের অংশ হিসেবে ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে ফরাসি দর্শনের প্রভাবকে এই সংগঠনটি খুব ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে এবং তাদের এই দীর্ঘমেয়াদী অনুসন্ধান নথিবদ্ধ করতে ১৯৮৫ সালে তারা একটি গবেষণা প্রবন্ধ তৈরি করে৷

    সম্প্রতি তথ্য অধিকার আইনের আওতায় করা একটি আবেদনের প্রেক্ষিতে এই নথির একটি পরিশোধিত অনুলিপি “ফ্রান্স: ডিফেকশন অব লেফটিস্ট ইন্টেলেকচুয়াল” নামে প্রকাশিত হয়েছে। বিস্ময়করভাবে, এই নথি উত্তর–কাঠামোবাদী চিন্তকদের রাজনৈতিক অভিমুখকে ইতিবাচকভাবে দেখেছে। ইয়ানোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের প্রফেসর ও র‍্যাডিকেল হিস্ট্রি ও দি পলিটিক্স অব আর্ট–এর লেখক গ্যাব্রিয়েল রকহিল ফরাসি উত্তর–কাঠামোবাদ সম্পর্কিত সিআইএর মূল্যায়নকে এল এ রিভিউ অব বুকের জন্য সামারাইজ করেছেন এভাবে:

    “…গুপ্ত সাংস্কৃতিক যোদ্ধারা (সিআইএ) মূলত প্রশংসা করেছে দুটি পরিবর্তনকে৷ এক, উত্তর–কাঠামোবাদী বাঁকবদলের মাধ্যমে ফরাসি বুদ্ধিজীবী মহলের সমালোচনার মূখ্য লক্ষ্যবস্তু যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরে সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে চলে যায়। বৃহত্তর বামপন্থী বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতায় ধীরে ধীরে স্ট্যালিনবাদ ও মার্ক্সবাদ নিয়ে অনাগ্রহ দেখা যায়; র‍্যাডিক্যাল বুদ্ধিজীবীরা জনপরিসরের বিতর্ক থেকে ক্রমশ দূরে সরে আসে; এবং তাত্ত্বিক অবস্থানের জায়গা থেকে সমাজতন্ত্র ও সমাজতান্ত্রিক দল থেকে দূরে সরে আসতে থাকে। অপরদিকে ডানপন্থীদের মধ্যে মতাদর্শগত সুবিধাবাদী হিসেবে পরিচিত “নিউ ফিলসফারস” ও “নিউ রাইট” বুদ্ধিজীবীরা গণমাধ্যমে মার্ক্সবাদ বিরোধী একটি হাইপ্রোফাইল স্মিয়ার ক্যাম্পেইন শুরু করে।“

    সিআইএ এজেন্টরা তাদের প্রতিবেদনে লিখেছেন, “মার্ক্সবাদ ও সোভিয়েত বিরোধিতার এই উদ্দীপনা ফ্রান্সে কারও পক্ষে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মার্কিন নীতির কোনো বিরোধিতা গড়ে তোলাকে কঠিন করে তুলবে।” ফরাসি সংস্কৃতি ও সরকারের ওপর “নিউ লেফট বুদ্ধিজীবীদের” প্রভাব এতটাই প্রবল ছিল যে, তারা ধারণা করেছিল, “প্রেসিডেন্ট [ফ্রাঁসোয়া] মিতেরঁ সাম্প্রতিক সময়ে মস্কোর প্রতি যে তাৎপর্যপূর্ণ শীতলতা দেখিয়েছেন, তার পেছনে কিছুটা হলেও এই সর্বব্যাপী বৌদ্ধিক মনোভাব ভূমিকা রেখেছে।“

    ছবি: লিওতার, ফুকো ও দেরিদা

    রকহিল লিখেছেন, এই গবেষণায় ফ্রান্সের নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক মহলের প্রভাব সম্পর্কিত (সিআইএর অভিমত অনুযায়ী) যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আগের প্রজন্মের “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর সময়ের বামঘেঁষা বুদ্ধিজীবীদের” থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন“। ওই প্রজন্মের বুদ্ধিজীবীরা “মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করতো” এবং আমেরিকান গোয়েন্দা কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছিল। জঁ–পল সার্ত্রে এমনকি “প্যারিসে সিআইএ স্টেশন অফিসার এবং ডজনখানেক আন্ডারকভার এজেন্টের পরিচয় ফাঁস” করায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলে এবং এই কারণে তিনি সিআইএ এর “নিবিড় নজরদারি“-তে ছিলেন। সার্ত্রে সিআইএর কাছে একটি গুরুতর সমস্যারূপে বিবেচিত ছিলেন। তবে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে একই সংস্থা বিজয়োল্লাসে ঘোষণা করেছিল, “এখন আর কোনো সার্ত্রে নেই, নেই কোন গিদে।” তারা লিখেছিল, “কমিউনিস্ট পণ্ডিতদের সর্বশেষ গোষ্ঠী নিজেদের শিষ্যদের তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েছিল, কিন্তু তখন কারোরই আর মার্ক্সবাদের পক্ষে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার মানসিকতা ছিল না।” এ কারণে স্নায়ু যুদ্ধের শেষ পর্বে “সব রাজনৈতিক ধারার বুদ্ধিজীবীদের মাঝেই মতাদর্শ থেকে সরে আসার একটি বড় প্রবণতা” লক্ষ করা যায়।

    “স্ট্যালিনবাদী কাল্ট”–এর একেবারেই অসমর্থনযোগ্য একনায়কতান্ত্রিক দমন–পীড়ন এবং ওয়াশিংটন কনসেনসাস ও তার দ্বারা সৃষ্ট বহুজাতিক কর্পোরেটবাদের অবশ্যম্ভাবী হিসেবে হাজির হওয়ার বাস্তবতা এক ধরনের ক্লান্তিতেই যেন আচ্ছাদিত করেছিল চারদিক। কমিউনিজমের পতনের সময়ে মার্কিন দার্শনিকরা প্রলয় তথা কিয়ামতের ভাষা ব্যবহার করছিল—এন্ড অব হিস্ট্রি। একইসাথে, তারা উদযাপন করছিলেন ওই যুগান্তকারী ঘটনাকে যাকে ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা আখ্যায়িত করেছিল সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে “উদার গণতন্ত্রের” জয় হিসেবে। ফুকুয়ামার বই দ্য এন্ড অব হিস্ট্রি অ্যান্ড দ্য লাস্ট ম্যান শিরোনামের মাধ্যমেই এই বিস্ময়কর তত্ত্বকে স্পষ্ট করে তুলেছিল। অর্থ্যাৎ, আর কোনো বিপ্লব হবে না। হার্ভার্ডের চিন্তক স্যামুয়েল হান্টিংটন এই সময়কে তাই “সমাপ্তির যুগ” বলে ঘোষণা করেছিলেন ঠিক যেই সময়ে “শিল্পের সমাপ্তি,” “প্রকৃতির সমাপ্তি,” ইত্যাদি নানা অতিরঞ্জিত তর্কের বন্যা বয়ে যাচ্ছিল। আর সিআইএ–র মতে, বার্লিন প্রাচীর পতনের ঠিক আগের কয়েক বছরে ফ্রান্সের অতীতে শক্তিশালী দার্শনিক বামপন্থীরা “এক ধরণের ঔদাসীন্যে আক্রান্ত” হয়েছিল৷

    এই প্রতিবেদনে সিআইএ উত্তর–কাঠামোবাদী দার্শনিকদের জনমতকে সমাজতন্ত্র থেকে দূরে সরিয়ে নেয়া এবং “মার্ক্সবাদ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি জনসাধারণের মনোভাবকে কঠোরতর করে তোলার” জন্য কৃতিত্ব দেয়ার পাশাপাশি আরও লিখেছিল যে “উত্তর–কাঠামোবাদী দার্শনিকদের প্রভাব ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে এবং তারা শিগগিরই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি বড় কোন প্রভাব রাখতে পারবে বলে মনে হয় না।” তাদের এই বক্তব্য কি সঠিক ছিল? যদি আমরা বহু–কথিত “পরিচয়বাদী রাজনীতি”–র সমালোচকদের গুরুত্ব দিয়ে দেখি, তবে এই প্রশ্নের উত্তর হবে: একেবারেই না। আবার, যারা উত্তর–আধুনিক দর্শন এবং সাম্প্রতিক কালের কয়েকটি প্রভাবশালী বামপন্থী চিন্তাধারা ও আন্দোলনকে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বলে চিহ্নিত করেছেন, তারা যুক্তি দিতে পারেন যে, সিআইএ তাদের সিদ্ধান্তে অদূরদর্শী ছিল। হয়তো স্নায়ু যুদ্ধের কয়েক দশকের কূটকৌশলে গড়ে ওঠা দ্বৈততাবাদী (Manichean) দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে আবদ্ধ থাকায় তারা এমন এক রাজনীতির কথা কল্পনা–ই করতে পারেননি, যা একইসঙ্গে আমেরিকান ও সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করতে পারে।

    শিল্পী: রিচার্ড প্রিন্স

    তবুও মতাদর্শ থেকে সরে আসার অর্থ মোটেও রাজনীতি থেকে সরে আসা নয়। বলা যেতে পারে, গোয়েন্দাদের মাঝে এই অদ্ভুত গবেষণা প্রবন্ধটি প্রচারিত হওয়ার তিরিশ বছর পর ফুকোর “বায়োপাওয়ার” কিংবা দেরিদার পরিচয় (আইডেন্টিটি)-কে প্রবলেম্যাটাইজ করা ধারণাগুলো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক ও কার্যকর (যদিও আমরা সবসময় তাদের কাজ পড়ি না বা পুরোপুরি বুঝি না)। তবে সংস্থাটি উত্তরাধুনিক চিন্তার সর্বব্যাপী প্রভাব আগে থেকে অনুমান করতে না পারলেও তারা এই দার্শনিক ঐতিহ্যকে কখনোই অস্পষ্ট কিংবা তুচ্ছ জটিল বাক্যবিন্যাস হিসেবে বাতিল করে দেয়নি। রকহিল লিখেছেন, “যদি কেউ ধরে নেয় যে, বুদ্ধিজীবীরা ক্ষমতাহীন কিংবা আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান কোনো গুরুত্ব বহন করে না, তবে মনে রাখবেন, সমসাময়িক বিশ্বরাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ক্রীড়ানক আপনার ধারণার সঙ্গে একমত নয়। এই সদ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনটি বুদ্ধিজীবীদের ক্ষমতার একটি স্মারক হয়ে থাকবে।“

  • দেবত্বের গেরস্থালীকরণ: বাংলায় দুর্গা-শিবের বহুত্বের যাপন

    দেবত্বের গেরস্থালীকরণ: বাংলায় দুর্গা-শিবের বহুত্বের যাপন

    অবিভক্ত বাংলা অঞ্চলের ক্ষেত্রে অন্নপূর্ণা/গৌরী ও শিবের বহুমাত্রিক ও বহুস্তরবিশিষ্ট দৃশ্যগত উপস্থাপনার এমন নানাবিধ উদাহরণ দেখা যায়। ঔপনিবেশিক পরিসরে যখন বিভিন্ন সংস্কারবাদী তৎপরতা প্রবলভাবে তৎকালীন শাক্ত, বৈষ্ণব, শৈবসহ বিভিন্ন ঐতিহ্য ও সম্প্রদায়কে পবিত্রকরন, অপার্থিবকরণ এবং লিখিত বিভিন্ন সূত্র ধরে রূপান্তর করছিলো তখনও দুর্গা ও শিবের গেরস্থালীকৃত কাহিনি ও চিত্রায়ন জারি ছিল। এই প্রক্রিয়াকে সাধারণত পারিভাষিকভাবে দেবতার গেরস্থালীকরণ/ডোমেস্টিকেশন অফ গডও বলাও হয়ে থাকে। অন্যভাবে, দেবতার মানবায়নও বলা যেতে পারে দেবতাকে মানবীয় নানা দোষ ও গুণে বৈশিষ্ট্যময় বিবেচনা করে। লোকায়ত বলেতে যে পরিসরকে ভদ্রবিত্তগণ চিহ্নিত করেন সেই পরিসরে এই মানবায়ন ও গৃহস্থালীকরণের বিভিন্ন আখ্যান মঙ্গলকাব্যসহ পাঁচালী, ব্রতকথা, কাব্য এবং গীতরঙ্গে চিহ্নিত করা সম্ভব। পুরাণ বা শাস্ত্রীয় বিভিন্ন আদর্শ টেক্সট ঘেঁটে দেব– দেবী অথবা প্রায়–দেবদেবী (কিন্নর, অপ্সরা, নাগ, ইত্যাদি) এবং প্রাণী বা উদ্ভিদকুলের মানবায়নের পবিত্রায়িত ও আধুনিকীকৃত ব্যাখ্যা বের করাও ঊনবিংশ শতকের শহুরে বাবুশ্রেণির তৎপরতার অংশ ছিল।

    মহাদেব বা শিবের কালীঘাট পটচিত্র

    একইসঙ্গে, স্ববিরোধী মনে হলেও, দুর্গা বা কালী পুজার ভদ্রবিত্তীয় ও বনেদী উদযাপনে এসব শাস্ত্র ও বিধির অনুসরণ বহুক্ষেত্রেই করা হয় নাই। অথবা প্রবল নতুন বিত্তবান শ্রেণির অনুকরণে নতুন নতুন বিধি পুরানো টেক্সট ঘেঁটে আবিষ্কারও করা হয়েছে। অর্থ্যাৎ ঐতিহ্যের নির্বাচিত রূপান্তর–পুনর্গঠন–পুনর্নবায়ন ঘটেছে। এইসময়েই বিভিন্ন সংস্কৃত কিতাবের বা পাণ্ডলিপির বাংলা অনুবাদ করে প্রকাশ করার তৎপরতাও বৃদ্ধি পায়। আবার লোকশ্রুতি ও স্মৃতিতে থাকা, সতত পুনর্নবায়িত হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা পারফরমেটিভ ঐতিহ্যকে টেক্সটে লিপিবদ্ধ ও প্রকাশ করে সেই পারফরমেটিভ স্থিতিস্থাপকতাও রদ করার চেষ্টা করা হতে থাকে।

    শীর্ণদেহী শিব আর অন্নপূর্ণা

    বিভিন্ন আদর্শায়িত টেক্সট ( যেমন: পুজা পদ্ধতি, ধর্মাচারপ্রকরণ, শুদ্ধআচাররীতি, শাস্ত্রানুগ আচার পদ্ধতি জাতীয়) বইপত্র যেমন প্রকাশিত ও বাজারজাতকরণ হয় তেমনই অন্য স্তরে ও পরিসরে তার বিপরীত আচারও লক্ষ্যনীয় হয়। যৌক্তিকভাবেই, ইউরোপীয় ধর্মসংস্কার ও প্রাচ্যবাদী ধর্ম–সংজ্ঞায়ন আর ধর্মাচারের শুদ্ধিকরণের নামে বিভিন্ন আচার ও যাপিত জীবনে প্রচলিত বহুরূপ রীতিকে ক্রমাগত একটা রূপে ও আকারে নিয়ে আসার প্রক্রিয়া জারি থাকে।

    পাশাপাশি, দুর্গা ও শিব, উমা, পার্বতীকে মাতৃরূপে আরাধনা করা, পরিবারের সদস্য হিসেবে আকাঙ্খা করা, গণ্য করা এবং আচারে পারিবারিক, স্থানিক আর মানবী রূপের উদযাপন জারি থাকে। বিভিন্ন দৃশ্যমাধ্যম যেমন ক্যালেন্ডার, পোস্টার, বাঁধানো ছবিতে এমন বিভিন্ন রূপকল্প ও প্রতীমায়ন আমরা দেখতে পাই। এই দেবত্ব বা দেবিত্ব পার্থিব যাপন থেকে বহুদুরে অস্তিত্বশীল কোনো অলৌকিক শক্তির প্রকাশ নয়। বরং যাপিত জীবনের সংবেদন, রীতি, আবেগ, অনুভূতি, ভাবাবেশের সঙ্গে এই দেবত্ব/দেবীত্ব লীন হয়ে থাকে। এই দেবতার কাছে অভিযোগ করা যায়, তাকে বকাবকি করা যায়, তাকে নিয়ে রঙ্গ–তামাশা করা যায়, তাকে কন্যা, পুত্র, মা, বাবা, ভাই, বোন বা আত্মীয় হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তার কাছে যেমন চাওয়া যায়, তেমনই তার কাছে দুঃখ বা কষ্টে কান্নাকাটিও করা যায়। জীবনের যন্ত্রনা ও বেদনার জন্য তার কাছে অভিযোগ ও অনুযোগও করা যায়। একই সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাংশের দেবত্বের ইতিহাসের বহুমুখী ও পরিবর্তনশীল ঐতিহ্যগুলো বিশ্লেষণ করলেই এখানে মাতৃরূপে, শক্তিরূপে, দানব–বিনাশী রূপে, মঙ্গলময়ী রূপে, দৈনন্দিন বহুবিধ সমস্যা ও সঙ্কট থেকে মুক্তিদায়নী ও রক্ষাকারিনী হিসেবে দেবি বা নারীত্বর গুরুত্ব ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রবল আধিপত্য তৈরির চেষ্টার পরেও অস্তিত্বশীল রয়েছে। এসব নিয়ে এন্তার সিরিয়াস গবেষণা ও আলাপচারিতা রয়েছে। স্থানীয় বিভিন্ন দেবীর পাশাপাশি দুর্গা বা কালীর মতন দেবীগণ বিভিন্ন রূপে, প্রকাশে ও অভিব্যক্তিতে বিভিন্ন ঋতুতে, বিভিন্ন অনুষঙ্গে ও আচারে পুজিত হন। ঠিকযেমন দুর্গা পুজায় দুর্গা যেন বাপের বাড়ি আসেন সন্তানাদিসমেত আর পরিবারের সঙ্গে মিলিত হয়ে যাপন করে আবার ফিরে যান শ্বশুড়বাড়িতে। দেবীপুরাণ বা দেবীমাহাত্ম্য বা দেবীভাগবৎপুরাণ অথবা তন্ত্রসার বা কালিকাপুরাণে এমন গৃহস্থালীকরণের ও মানবায়নের উদাহরণ খুব কমই মিলবে।

    শিল্পী বিকাশ ভট্টাচার্য্যের আঁকা বিখ্যাত দুর্গা সিরিজের দুটো পেইন্টিং। ২০২০ সালে নিচের পরিযায়ী নারী শ্রমিকের রূপে আঁকা মাতৃরূপী দুর্গার পেইন্টিংয়ের আদলে প্রতীমা নির্মিতও হয়েছিল। দুর্গা সিরিজ নিয়ে সম্পূর্ণা চক্রবর্তীর নিচের লেখাটি পড়তে পারেন এই লিংকে

    একদিকে কর্পোরেট পুঁজি আর প্রদর্শনী হিসেবে প্রতীমার বাইরেও পুরা স্থানিক পরিসর হিসেবে মণ্ডবের রূপান্তর নগরগুলোতে ঘটছে। সেখানেও দুর্গাপ্রতীমার এক ধরনের মানবায়ন ঘটছে। আবার প্রত্যন্ত অঞ্চলে, বিভিন্ন কোণে পারিবারিক ও মানবায়িত দুর্গা উপস্থিত থাকছেন। প্রায়শই এই দুটি প্রকাশ একসাথে বিদ্যমান থাকে; একটি হলো আনুষ্ঠানিক এবং দৃশ্যত আরও আকর্ষণীয় পরিচয়–সৃষ্টিকারী সত্তা। অন্যটি হলো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের রীতি ও বৃত্তি, যা তাদের দেহ ও কর্মের মধ্যে মূর্ত। বাল্মীকির রামায়ন বা তুলশীদাশের রামচরিতমানস থেকে কৃত্তিবাস ওঝার রামায়নের বহুবিধ ভিন্ন বয়ান ও ঘটনা রয়েছে। অকালবোধনের কথা কৃত্তিবাসই আমাদের শোনান। কৃত্তিবাসের রামায়ন যখন পাঁচালি হিসিবে গীত বা নাট্যস্থ বা গীতরঙ্গের আখ্যানে পরিবেশিত হত তখন সেই পরিবেশনায় কথক ও কুশীলবদের পরিচিত যাপিত জীবনের সঙ্গে সেই রামায়নের আখ্যান মিলেমিশে যায়। ঐতিহ্য নতুন ভাবে পুনর্নবায়িত হতে থাকে। এই পুনর্নবায়ন অব্যহত ও অবিরাম প্রক্রিয়া। কিতাবে নাই বা শাস্ত্রে নাই দাবি করে কোনো রূপ বা আচারকে অশুদ্ধ বা দুষণ হিসেবে আখ্যায়িত করার অর্থ হলো সেই দাবিকরিয়েরাও ঐতিহ্যকে তাদের মত ও পথের মতন করেই গঠন করতে চাচ্ছেন। বহুত্ব ও স্থিতিস্থাপকতাকে অস্বীকার করার আর স্থানিক ও কালিক বহুত্বকে সমরূপ করার প্রক্রিয়াটি বুনিয়াদীভাবেই হিন্দুত্ববাদী একটি প্রকল্প।

    মধ্যযুগের অন্তিমকালের মন্দিরের দরজার খিলানের উপরে অলংকৃত পোড়ামাটির চিত্রফলকে চিত্রিত শিবঠাকুরের বিয়ে। আলোকচিত্রী: শ্যামল কুমার ঘোষ।

    বিভিন্ন সিনেমা, অ্যানিমেশন, কমিকস অথবা ক্যালেন্ডারের মতন পপুলার শিল্প উপস্থাপনে পেশীবহুল, পুরুষালী, সর্বশক্তিমান যে শিব বা মহেশ্বরের উপস্থাপন আমরা বিশেষ করে উত্তর ও পশ্চিমভারতে দেখি সেই শিব বা মহেশ্বরের বাংলার চেহারা বা রূপ কিন্তু বিচিত্র। এখানকার শিব স্থুলকায়, ভূড়িবান, থলথলে শরীরের। অথবা খাবার না খেয়ে শীর্ণদেহী। অথবা উমাপতি, মানে উমার প্রেমময় কিন্তু অলস স্বামী। বিবাগী, সংসারবিমুখ, গাঁজা খেয়ে শ্মশানে প্রেতপ্রেতিনীদের সঙ্গে যাপনকারী।

    শিবায়নের মতন কাব্যে তাকে অলস কৃষক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অন্নপূর্ণা মা বিভিন্ন ভাবে জমির ব্যবস্থা করলেও তিনি আবাদ করতে আগ্রহী নন। শ্মশানচারী ও নেশা করেন। সংসারে মনোযোগ নাই। অন্নপূর্না মায়ের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। আবার ভবা পাগলার গানে (কমেন্ট বক্সে এমন একটি গানের ইউটিউব লিঙ্ক দিলাম) কিংবা লোক বিভিন্ন আখ্যানেও শিবের এই রূপ উদযাপিত হয় ও আখ্যানেও দেখা যায়। মধ্যযুগের অন্তিমকালে এই অঞ্চলে নির্মিত বিভিন্ন মন্দিরে লাগানো পোড়ামাটির চিত্রফলকেও উমা ও শিবের, বা শিব–পার্বতীর এমন রূপের পরিবেশন বিরল না।

    ১৮৯০ সালে অঙ্কিত পেইন্টিংয়ে দুর্গার আগমনী।

    এই যাপিত আখ্যানগুলোতে দেবীর কেন্দ্রীয় পরিসরে প্রধান কুশীলব হিসিবে অবস্থান করার প্রসঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নানা রূপে কেন্দ্রেই বিরাজ করেন, পরিবারের, সংসারের, বিশ্বসংসারের, জাগতিক ও অপার্থিব দুনিয়াদারিতে। পুরুষের কর্তৃত্ব এখানে গৌন এবং সে পার্শ্বচর বা পার্শ্ব চরিত্র মাত্র। কখনো কখনো তার সঙ্গিনীর উপরে নির্ভরশীল। আদিমধ্যযুগ থেকে শুরু করে এখন অবধি নানা প্রক্রিয়ায় হিন্দু ধর্মের (বিভিন্ন ধারার) ক্রমিক ব্রাহ্মণ্যকরণের ফলে নারী দেবদেবীদেরকে স্ত্রী ও গার্হস্থ্য রূপে দেবীশক্তির কেন্দ্রীয় সত্তা ও সক্রিয়তাকে খর্ব করার চেষ্টা করা হয়েছে। সেই চেষ্টার প্রতিরোধও ঘটেছে। টেক্সটের কাউন্টার টেক্সট লিখিত হয়েছে। পুরুষকেন্দ্রীক আদর্শায়নের প্রতিরোধও হয়েছে। একইসঙ্গে বিশুদ্ধিকরণও করার চেষ্টাও হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর ও উত্তর–পশ্চিম অংশ ঐতিহাসিকভাবে এক আগ্রাসী, জোরপূর্বক এবং আধিপত্যবাদী ভূমিকা পালন করেছে, যার মাধ্যমে পুরুষ দেবতারা স্বাধীন এবং প্রায়শই সর্বশক্তিমান ঐশ্বরিক সত্তা হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছেন। এর ফলে নারীসত্তাগুলো ধীরে ধীরে পুরুষতান্ত্রিক ব্রাহ্মণ্যবাদী দেবতাদের অধীনে চলে গিয়েছেন এবং গার্হস্থ্য রূপে উপস্থাপিত হয়েছেন।

    দেবী অন্নপূর্ণা অথবা উমা শিবকে ভিক্ষা দিচ্ছেন। শিল্পীর নাম ও চিত্রটির সময়কাল খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি।

    যদিও উপমহাদেশের পূর্ব ও দক্ষিণ অংশে শাক্ত ধর্মগুলি এখনও তাদের স্বকীয় কিছু ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। উত্তর ও উত্তর–পশ্চিম অংশের নারী দেবদেবীদের উপস্থিতি নিম্নবর্ণের গোষ্ঠীর মধ্যে আরও প্রান্তিক স্থান পেয়েছে। উল্লেখ্য, এই উত্তর–কেন্দ্রিক হিন্দুত্ববাদী বিশ্বদর্শনে লক্ষ্মী বা অন্য কয়েকটি দেবীর উপস্থিতি টিকে আছে শুধুমাত্র তাঁদের অর্থনৈতিক প্রতীক হিসেবে হ্রাসপ্রাপ্ত ভূমিকার কারণে। বাজারে বা দোকানে বিভিন্ন 3D, রঙিন ও ক্ষুদ্র আকারের মূর্তি বা ক্যালেন্ডারের ছবিতে তাদের দেখা যেতে পারে, যেখানে তারা অন্যান্য দেবদেবীর সাথে ক্ষুদ্র মন্দিরে পূজিত হন। এই মূর্তিগুলি সেইসব বণিক, ব্যবসায়ী এবং দোকানদারদের জাতিগত ও আঞ্চলিক পরিচয়কেও তুলে ধরে, যারা বর্তমানের বহুসাংস্কৃতিক শহুরে পরিবেশে মিশে গিয়েছেন।

    মাতৃরূপা দুর্গা বা পার্বতী শিশু গণেশের যত্ন নিচ্ছেন। শিল্পীর পরিচয় ও অঙ্কণের সময়কাল খুঁজে পাওয়া যায়নি

    এমনকি রাধা–কৃষ্ণের দ্বৈত ও অদ্বৈত অস্তিত্বের পরিবর্তিত বিবরণ, উপস্থাপনা এবং কর্মগত প্রকাশেও ভাগবত গীতা ও মহাভারতের কৃষ্ণের প্রাধান্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এমনকি ঐতিহ্যবাহী বৈষ্ণব কেন্দ্র বৃন্দাবন ও মথুরাতেও লক্ষণীয়। ধর্মীয় ও আচার–অনুষ্ঠানের এই সমস্ত পুনর্গঠনগুলি বাংলার হিন্দুত্বের ধারণায়, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের শহুরে পরিবেশে, জোরপূর্বক এবং দৃশ্যমান প্রবেশ ঘটাচ্ছে। যেখানে বাংলা–ভাষী এবং অন্যান্য ভাষা–ভাষী অঞ্চলের জনসংখ্যার পরিবর্তন হিন্দুত্ববাদী প্রচারণার মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত একটি একক ও চিরন্তন হিন্দুত্বের মানদণ্ড ও স্বাভাবিকীকরণে নিজেদের ভূমিকা পালন করেছে এবং প্রাধান্য লাভ করেছে।

    গণেশমাতা। শিল্পী : অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

    যদি আমরা পশ্চিমবঙ্গের টিভি সিরিয়ালগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে দেখব যে এখানকার আঞ্চলিক ও শক্তিশালী নারী দেবীরাও উত্তর–কেন্দ্রিক মানদণ্ডের অনুষঙ্গ দিয়ে পুনর্কল্পিত ও উপস্থাপিত হচ্ছেন। কিছুদিন আগেও মহাভারত ও রামায়ণের মতো মহাকাব্যগুলির জটিল, বহুবিধ, এবং আঞ্চলিক ও ভাষাগতভাবে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনাগুলি টিভি চ্যানেলগুলির মাধ্যমে একটি একক, অত্যন্ত সরলীকৃত এবং সমসত্ত্ব স্থিরতা লাভ করেছে। সাম্প্রতিক দৃশ্যমান প্রযুক্তির বিস্ফোরণ এবং বিপুল অর্থ একসাথে কাজ করে ঐশ্বরিক সত্তাগুলোর সমস্ত প্রাণবন্ততা, জটিলতা এবং প্রাসঙ্গিকতাকে মুছে ফেলছে এবং হিন্দুত্ববাদী আইকনগুলিকে ভোগের সামগ্রী করে তোলার জন্য কার্যকরভাবে কাজ করছে। তারা গল্প বিক্রেতার প্রধান মাধ্যম।

    দুর্গা পুজায় বাঙালি নারীরাও একেকজন দুর্গা হিসেবে চিত্রিত হয়েছেন এই সমসাময়িক পেইন্টিংয়ে। বিকাশ ভট্টাচার্য্য অঙ্কিত দুর্গা সিরিজের পেইন্টিংগুলো পাঠকগণ অন্তর্জাল খুঁজে দেখতে পারেন। আমার এই লেখাটিতে বিকাশ ভট্টাচার্য্যের একটি পেইন্টিংয়ের ছবিই দিয়েছি আগে।

    আমার সংক্ষিপ্ত এবং সংক্ষেপিত আলাপ এই পর্যন্তই। আমি অবদমিত, বাদ পড়া এবং প্রায়শই মুছে ফেলা ঐশ্বরিক সত্তাগুলোর আমাদের পরিচিত ও পারিবারিক, জীবন ও দৈনন্দিনতার কাছের, মানবিক দেব–সত্তা হিসেবে উদযাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছি। কারো অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে থাকেলে ক্ষমা করবেন। আমি দুর্গাকে মাতৃরূপে বা কন্যারূপে ভক্তি করতে যেমন চাই তেমনই ভালোবাসার জন্য, অনুযোগ করার জন্য, অভিমান করার জন্য, খুশী হওয়ার জন্য আমার কাছে চাই। তিনি মাতৃরূপে সংস্থিতা যেমন তেমনই বহুরূপেও সংস্থিতা থাকুন। বহুত্বে থাকুন।

    ….

    অন্নদামঙ্গল থেকে কয়েক চরণ নিচে দিলাম:

    অতি বড় বৃদ্ধ পতি সিদ্ধিতে নিপূণ।

    কোন গুণ নাহি তাঁর কপালে আগুন।।

    কুকথায় পঞ্চমুখ কণ্ঠভরা বিষ।

    কেবল আমার সঙ্গে দ্বন্দ্ব অহর্নিশ।।

    ভূত নাচাইয়া পতি ফেরে ঘরে ঘরে।

    না মরে পাষাণ বাপ দিলা এমন বরে।

    …..

    দ্য হোলি ফ্যামিলি। শিল্পী: শ্রী অর্ক দাশ

    রামেশ্বর ভট্টাচার্য্য প্রণীত শিবায়ন কাব্যটিকে মঙ্গলকাব্য গোত্রীয় বিবেচনা করা হয়। ১৩১০ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত পাণ্ডুলিপিটি অনুসারে বেশ কয়েকটি পাণ্ডুলিপি তুলনাপ্রতিতুলনা করে এটি প্রকাশিত হয়। প্রথম পাণ্ডুলিপি ১৬৮১ সালের। এই গীতিকাব্য বা পারফরমেটিভ বর্গীয় কাব্য তৎকালীয় অবিভক্ত বাংলা অঞ্চলে জনপ্রিয় ছিল জনপরিসরে। এখানে আমি তিনটি পাতা দিলাম যেখানে শিব ও পার্বতীর মধ্যে শিবের আয়রোজগার নিয়ে ঝগড়া হচ্ছে। শিব পরিশেষে ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে সংসার চালানোর জন্য নারদের মধ্যস্থতায় ইন্দ্রের কাছ থেকে জমি পাট্টা নিয়ে আবাদ করা শুরু করেন।

     

    কয়েকটি পুজাবার্ষিকীর প্রচ্ছদে চিত্রিত স্বপরিবারে দুর্গা।

    ২০১৭ সালে বিখ্যাত হেয়ার স্টাইলিস্ট জাভেদ হাবিবের সেলুনের একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। এই বিজ্ঞাপনে দেখা যায় মা দুর্গা স্বপরিবারে জাভেদ হাবিবের সেলুনে এসেছেন। পরে এই বিজ্ঞাপন নিয়ে বিশেষ করে হিন্দুত্ববাদীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভয়ংকর ট্রল ও ডক্সিং শুরু করেন। মামলাও হয়। উত্তর প্রদেশে জাভেদের সেলুনে ভাঙচুরও চালানো হয়। পরে হাবিব বাধ্য হয়ে বিজ্ঞাপনটি তুলে নেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এই প্রসঙ্গটি নিয়ে আলাপ জানার জন্য আগ্রহী পাঠকরা স্ক্রলে প্রকাশিত দীপাঞ্জন ঘোষের আর দ্য কুইন্টে প্রকাশিত শুকতারা ঘোষের লেখাদুটো পড়তে পারেন। লেখাদুটোর লিঙ্ক দিলাম:

    https://scroll.in/magazine/850250/goddess-durga-has-starred-in-bengali-ads-for-years-so-why-is-jawed-habib-in-hot-water-now

    https://www.thequint.com/lifestyle/books/durga-puja-pujabarshiki-jawed-habib-controversy#read-more

     

    ঊনবিংশ শতকের ডাচ–বেঙ্গল পেইন্টিং শৈলিকে আঁকা হর–গৌরী লীলা। নিচে বাংলায় লেখা চরণগুলো হলো:

    কোচ গৃহে কেলি করি, প্রত্যাগত হর,
    সম্বিদায় টলমল বৃষের উপর । ।
    ভবের সে ভাব দেখি ভবানী রুধীত,
    ভ্রুকুটি ভঙ্গিতে করে সিংহেরে ইঙ্গিত ।।
    ঘোর নাদ করে সিংহ , ভয়ে বৃষ ধায় ,
    সেই লম্ফ ঝম্ফ এ হর ধরণী লুটায়।।
    কর তালি দেন গৌরী , সহাস্য বদন,
    শ্লেষা ভাষ সম্ভাসনে – ” কেমন এখন! 

    দুটি লোক গানের সূত্র

    মা আমাদের পাগলিনী বাবা আমাদের গাঁজাখোর

    আসছে জামাই দিগম্বর

  • আগামবেনের হোমো সাকের পাঠের নোক্তা

    আগামবেনের হোমো সাকের পাঠের নোক্তা

    • তৌহিদুল ইসলাম

    [ইতালিয়ান দার্শনিক জর্জিও আগামবেনের Homo Sacer: Sovereign Power and Bare Life বইটি ইতোমধ্যেই আমাদের পাঠকের কাছে পরিচিত। বইটিতে আগামবেন তার হোমো সাকের ধারণার একটি বিস্তর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা হাজির করেন। আগামবেন দেখান আধুনিক রাষ্ট্রে সার্বভৌম ক্ষমতা কীভাবে আমাদের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে। ফুকো যেখানে জৈবক্ষমতার ধারণা হাজির করে আমাদের দেখান আধুনিক রাষ্ট্র জৈবক্ষমতার নিয়ন্ত্রণের দ্বারা আমাদের কীভাবে আমাদের জীবন রক্ষা করে চলে, আগামবেন সেখানে সার্বভৌম ক্ষমতার একটা বিশেষ দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। আগামবেন দেখান আধুনিক রাষ্ট্রে সার্বভৌম ক্ষমতা তার নিজের প্রয়োজনেই তার ব্যতিক্রমী অবস্থার তৈরি করে, যেই ব্যতিক্রমী অবস্থার মধ্য দিয়ে কাউকে ঠেলে দেয়া হয় রাষ্ট্রীয় ও আইনি সুরক্ষার বাইরে। পরিণত করা হয় হোমো স্যাকারে। আগামবেনের মতে হোমো স্যাকার হলো সেই জীবন যাকে যে কেউই হত্যা করতে পারে, এবং এই হত্যাকাণ্ডের জন্য কোনো বিচার বা শাস্তির সম্মুখীন তাকে হতে হয় না। তৌহিদুল ইসলাম তার এই লেখায় আগামবেনের এই বইটির উপর কিছু নোক্তা হাজির করেন, যা আগামবেনের মূল ধারণার একটা সংক্ষিপ্ত টীকা আকারে দেখা যেতে পারে – সম্পাদক]

    দেয়ালচিত্রে আগামবেন

    ১.

    গ্রিক zoe এবং bios দুইটাই প্রাণ বা জীবন অর্থে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু দুইয়ের মধ্যে আকাশ পাতাল ফারাক। প্রথমটা ব্যবহৃত হতো জীবের জীবন অর্থে। অর্থাৎ, যেখানে জীবন তার খুৎনিবৃত্তির স্তর অতিক্রম করে নাই। খাওয়া, পড়া, বেঁচে থাকার মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে, থাকে বায়োস। যার অর্থ সামাজিক, রাজনৈতিক জীবন। বাংলার তন্ত্রে একটা কথা প্রচলিত আছে– “পাশবদ্ধ ভবেৎ জীব, পাশমুক্ত ভবেৎ শিব“। গ্রিক জো’কে আমরা বলতে পারি এই জীব। যে নানা পাশে বদ্ধ আছে বলে কল্পনা করা হয়। গ্রিক জো বা জীবের এই বায়োসে রূপান্তর তখনই সম্ভব যখন সে সমাজে প্রবেশ করে, রাজনৈতিকতায় অভিষিক্ত হয়। নিজের অধিকার, ভালো মন্দের নৈতিক ধারণা, আইন সম্পর্কে সচেতন না হয়ে জীবন ধারণ করতে পারে না। জো আর বায়োস জীবনের দুই প্রান্ত মনে হলেও এখানে একটা সরলরৈখিক রূপান্তরের ধারণা আছে। সেই রূপান্তর ঘটে জো বা জীবের। জীব থেকে সে নাগরিক হয়ে ওঠে।

    ২.

    এরিস্টটলের “Politics” থেকে জো এবং বায়োসের এই আলোচনায় আগামবেন মিশেল ফুকোর হিস্টরি অব সেক্সুয়ালিটিতে এ বিষয়ে একটা তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করেন, যেখানে ফুকো দেখান, আধুনিক সময়ে রাষ্ট্র কীভাবে তার যন্তরমন্তর আর হিসাবনিকাশের মাধ্যমে এই জো বা জীবের জীবন একটা কাঁচামাল হিসেবে হাজির হয় যার থেকে জন্ম আধুনিক বায়োপলিটিক্সের বা জৈবরাজনীতির। ফুকো বলেন, “For millennia man remained what he was for Aristotle: a living animal with the additional capacity for political existence; modern man is an animal whose politics calls his existence as a living being into question.”

    ৩.

    ফুকো এখানে চিহ্নিত করেন আধুনিক রাষ্ট্র তার নাগরিকদের যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে তার প্রক্রিয়াটিকে। যে প্রক্রিয়ার গোঁড়ায় আমরা দেখতে পাবো ইউরোপীয় জ্ঞানকাণ্ডের চালানো ভায়োলেন্স যা এই জীবের রক্তমাংসে নানাবিধ নামচিহ্নের টোকেন গেঁথে দিচ্ছে। তাকে নানা বর্গে ভাগ করে রেখে দেয়া হচ্ছে নানাবিধ খোপে, খাঁচায়। আর পুরো প্রক্রিয়াটাই হচ্ছে এমন একটা সর্বব্যাপী আয়োজনের ভিতর দিয়ে যে মানুষ সজ্ঞানেই নিজেকে সঁপে দিচ্ছে সেই জ্ঞানের বেদিতলে। ফুকো এই প্রক্রিয়াকে বর্ণনা করেন ইউরোপীয় রাষ্ট্র কাঠামোর টেরিটরিয়াল স্টেট থেকে পপুলেশন স্টেটে রূপান্তর হিসেবে। আগে যেখানে রাষ্ট্র কিছু কাল্পনিক রেখার মাধ্যমে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে এবং সার্বভৌমত্বকে চিহ্নিত করতে ব্যবহার করতো টেরিটরি ধারণা, সেই রাষ্ট্রের নতুন কেন্দ্র হয়ে হাজির হলো জনগণ নামের নতুন বর্গ যা রাষ্ট্রের ক্ষমতা চর্চার এবং ক্ষমতাকে পুনরুৎপাদন করার নতুন উপকরণ। এই ক্ষমতা ক্রমেই এমন স্তরে গিয়ে পৌঁছালো যা একই সঙ্গে চিকিৎসাশাস্ত্রের বিকাশের মাধ্যমে মানুষের জীবন বাঁচানোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলো, আবার একই সঙ্গে হলোকাস্টের মত নারকীয় ঘটনারও জন্ম দিলো।

    ৪.

    আগামবেন বলেন, এই জৈবক্ষমতার উদ্বোধনের মাধ্যমে মানুষের আচার–আচরণ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ক্যাপিটালিজমের বিকাশও সম্ভবপর হতো না।

    আগামবেন হানা আরেণ্ডের হোমো লেবারানের উল্লেখ করে দেখান যে ফুকোর আগেই আরেন্ডের চিন্তায় বায়োপাওয়ারের ডিসিপ্লিনারি প্রক্রিয়া এবং আধুনিক রাষ্ট্রের নাগরিকদের ওপর তার প্রভাবের নজির থাকলেও সেইটার সঙ্গে টোটালিটারিয়ান ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে আরেন্ড তেমন সচেতন ছিলেন না। আবার ফুকোও তার জৈবক্ষমতার বিশ্লেষণে তার সমসাময়িক সময়ের উদাহরণগুলি খুব বেশি টানেননি। এর মাধ্যমে আগামবেন দেখাতে চান যে জৈবক্ষমতা এবং বেয়ার লাইফের সম্পর্ক এতই আচ্ছাদিত যে পশ্চিমা চিন্তকরা খুব রেয়ারলি তার টিকি ধরে টান দিতে পেরেছেন।

    ৫.

    এই আচ্ছাদিত বিষয়টিকে নিরাবরণ করতে আগামবেন বলেন, হোমো সাকেরে তার কাজ হলো ক্ষমতার আইনি–প্রতিষ্ঠানগত এবং জৈবরাজনৈতিক মডেলের ছেদবিন্দুটির ব্যবচ্ছেদ। কারণ সার্বভৌম ক্ষমতা গঠিতই হয় বেয়ার লাইফকে রাজনৈতিক জগতে অন্তর্ভূক্ত করার ভিতর দিয়ে। অথবা, সার্বভৌম ক্ষমতার আদি কাজটিই হলো এই জৈবরাজনৈতিক দেহের নির্মাণ। আগামবেনের মতে, এই অর্থে সার্বভৌম ব্যতিক্রম আর জৈবরাজনীতি সমান বয়সী। arcana imperii.

    তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন পশ্চিমা রাজনীতি নিজেকে গঠনই করে বেয়ার লাইফকে বর্জনের (যা একই সঙ্গে অন্তর্ভূক্তিকরণও বটে, বর্জনের অন্তর্ভূক্তিকরণ!) ভিতর দিয়ে।

    ৬.

    এরপর আগামবেন একটা দুর্দান্ত কাজ করেন। জো এবং বায়োসের দ্বৈততা থেকে তিনি পশ্চিমা চিন্তার একটা কেন্দ্রীয় অধিবিদ্যক প্রবণতার সঙ্গে একে মিলিয়ে দেখেন। এরিস্টটল যেইভাবে জো থেকে বায়োসে রূপান্তরকে জীবের রাজনৈতিক হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া হিসেবে হাজির করেন, একইভাবে আগামবেন দেখান, পশ্চিমা অধিবিদ্যার খুব কেন্দ্রীয় প্রবণতা হলো কণ্ঠস্বর থেকে ভাষায় পৌঁছানো। যেখানে ভাষা হলো সেই এলাকা যা মানুষকে মানুষ করে তোলে। মানুষ একই সঙ্গে মানুষ হয়ে ওঠে ভাষা ও রাজনৈতিকতায়। আগামবেন বলেন: The question “In what way does the living being have language?” corresponds exactly to the question “In what way does bare life dwell in the polis?” তার মতে, পশ্চিমা অধিবিদ্যার সহি বড় আদি ও আসল সুরত হইলো রাজনীতি যার মারেফতে জীব ও ভাষার (logos) সম্পর্কে মুসাবিদা হয়। জীব বা বেয়ার লাইফের রাজনীতিকরণের মাধ্যমেই মানবের চূড়ান্ত অধিবিদ্যক গন্তব্য নিহিত। যেহেতু আধুনিক জমানায় ক্ষমতা নিজেকে জাহির করে বেয়ার লাইফকে রাজনৈতিক স্ফিয়ারে নিয়ে আসার মাধ্যমে, তাই এর মাধ্যমে আধুনিকতা পশ্চিমা অধিবিদ্যার গোপন পারপাসই সার্ভ করে। জার্মান জুরিস্ট কার্ল শ্মিটের বিপরীতে তিনি বলেন, পশ্চিমা রাজনীতির মৌলিক ক্যাটাগরি বন্ধু/শত্রু দ্বৈততা না, বরং বেয়ার লাইফ/ রাজনৈতিক অস্তিত্ব, জো/বায়োস, এক্সক্লুশন/ইনক্লুশনের স্ট্রাকচারে নিহিত। আগামবেন বলেন, রাজনীতি আছে কারণ মানুষ হইলো সেই জীবিত জন্তু যে ভাষার ভিতরে ঢুকে নিজেকে তার বেয়ার লাইফ থেকে আলাদা করে, তার বিপরীতে দাঁড় করায় এবং একই সাথে, নিজেকে নির্ণয় করে সেই বেয়ার লাইফের সাপেক্ষে একটা অন্তর্ভূক্তিমূলক এক্সক্লুশনের মাধ্যমে।

    ৭.

    এই যে বেয়ার লাইফ, যারে নিয়ে এত কাহিনি, সেই হইলো আগামবেনের এই বইয়ের নায়ক। তথা প্রটাগনিস্ট। এই বেয়ার লাইফই হলো হোমো সাকের (পবিত্র মানব), যাকে হত্যা করা জায়েজ কিন্তু কুরবানি দেয়া জায়েজ না। আধুনিক রাজনীতিতে এই প্রটাগনিস্টকে কীভাবে ব্যবহার করা হয় সেটাই, আগামবেন বলেন, এই বইয়ের মূল কাজ। রাষ্ট্রে যেমন সব মানুষের একটা আইনি অস্তিত্ব থাকে যার ভিত্তিতে সে কিছু অধিকার ভোগ করে কিন্তু হোমো সাকেরের একমাত্র বৈশিষ্ট্য হলো তাকে হত্যা করা জায়েজ।

    ৮.

    আগামবেনের মতে, আধুনিক রাষ্ট্রে এই জৈবরাজনীতির ট্রান্সফর্মেশনের একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো যে এখানে বেয়ার লাইফ বা হোমো সাকের আর কেবলমাত্র একটা ব্যতিক্রম হিসেবে থাকে না, বরং এটা নিজেই একটা নিয়ম হয়ে ওঠে। যেইটাকে আগামবেন বলেন, ইরিডিউসিবল ইনডিসটিঙ্কশন। অর্থাৎ, যে কারো যেকোনো সময়ে হোমো সাকের হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এটা কেবলমাত্র আর প্রান্তের একটা বিষয় না, বরং আধুনিক রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীয় বিষয়।

    ৯.

    আগামবেন আধুনিক গণতন্ত্রকে দেখেন এই বেয়ার লাইফকে তাঁর রাজনৈতিক বলয়ে ইন্টিগ্রেশনের দীর্ঘ ধারাবাহিক সংগ্রামী প্রক্রিয়া হিসেবে। যার মাধ্যমে বেয়ার লাইফের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু সেই গণতন্ত্রের পক্ষেও তার যে অন্তর্গত এপোরিয়া সেটাকে অতিক্রম করা সম্ভব হয় না। বরং, বেয়ার লাইফ একটা বধযোগ্য ক্যাটাগরি হিসেবে বর্তমান থাকে। আধুনিক গণতন্ত্রের টোটালিটারিয়ানিজমের সঙ্গে সহবতে এটা প্রমাণিত হয়েছে নাজিবাদ ও ফ্যাসিবাদের সময়ে, বিশেষ করে হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে, যেখানে মানুষকে তার সকল মানবিক মর্যাদা থেকে ছিন্ন করে একেবারে আক্ষরিক বেয়ার লাইফে পরিণত করা হয়েছিল।

    শিল্পী: তাদিউস সোবেস্তো (১৯৮৯)

    ১০.

    আগামবেনের মতে, গণতন্ত্র এবং টোটালিটারিয়ানিজমের মধ্যে একটা সলিডারিটি আছে, এই দুই ব্যবস্থার সকল ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পার্থক্যসমেতই। এই ব্যর্থতা আগামবেনের মতে পশ্চিমা রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাসের ব্যর্থতা যেখানে জো আর বায়োস, কণ্ঠ এবং লোগোসের মধ্যে রূপান্তরের কোন সম্পর্ক তৈরি করতে পারেনি, যা এই ক্ষতকে নিরাময় করতে পারে। বেয়ার লাইফের এক্সক্লুশনারি ইনক্লুশনকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা রাজনীতি থেকে বের হতে না পারলে এর কোন সমাধান নেই।

    ১১.

    কার্ল শ্মিটের– সার্বভৌম হলো সেই যে ব্যতিক্রম কী হবে সেটাকে ঠিক করে–এই কথা, আগামবেনের মতে নতুন না। তার মতে, সার্বভৌম কে কিংবা কীভাবে সে সার্বভৌম হয়ে ওঠে এটা নিয়ে চিন্তা করা যথেষ্ট না, বরং পুরো রাজনৈতিক পরিসরের বিষয়টিকেই আমলে নিতে হবে। যা সার্বভৌমত্বের জুরিডিকাল, ইন্সটিটিউশনাল ধারার চিন্তায় করা হয় না।

    ১২.

    ওয়াল্টার বেঞ্জামিন বুঝেছিলেন কীভাবে ব্যতিক্রম নিজেই নিয়ম হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতি আমলে নিতে আগামবেন রাষ্ট্রের গঠনের আদি উৎপত্তির যে কাঠামো সেটার দিকে নতুনভাবে নজর দিতে বলেন। নৈরাজ্যবাদী ও মার্ক্সবাদীদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারা এই কাঠামোটিকে গুরুত্ব না দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার যে গোপন সূত্র (acranum iperiii) তাকে অবজ্ঞা করে, যেন সিমুলাক্‌রা এবং আইডিওলজির বাইরে রাষ্ট্রের আর কোন সাবসট্যান্স নাই। বরং, তারা এমন এক শত্রুকে সনাক্ত করে যার কাঠামো নিজেরাই বুঝতে পারে না, এবং তাদের রাষ্ট্রতত্ত্ব এমন একটা ডুবোচর যেখানে বিপ্লবের জাহাজডুবি ঘটে। এই ডুবোচরকে আগামবেন বলেন, যা মার্ক্সিস্ট রাষ্ট্রতত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়— দ্য স্টেট অব এক্সসেপশন বা প্রলেতারিয়েতের একনায়কতন্ত্র, যাকে দেখা হয় রাষ্ট্রহীন সমাজে অভিযাত্রার একটা ট্রান্সিশনাল পর্ব হিসেবে।

    শেষে এসে আগামবেন বলেন বর্তমানে সমাজবিজ্ঞান কিংবা নৃবিজ্ঞানের যে সকল চিন্তার ক্যাটাগরি আছে সেগুলো নতুন ভাবে পর্যালোচনা ছাড়া, ক্ষমতার সঙ্গে বেয়ার লাইফের সম্পর্কের বিষয়টিকে স্পষ্ট করে বোঝা আমাদের জন্য সম্ভব হবে না।